ধারাবাহিক উপন্যাস
Published : 02 Sep 2025, 12:42 AM
বেন ওকরি সমকালীন আফ্রিকান সাহিত্যের অন্যতম কণ্ঠস্বর। জন্ম ১৫ মার্চ ১৯৫৯, মিননা, নাইজেরিয়াতে। ১৯৯১ সালে তিনি বুকার পুরস্কার পান। তার লেখা সবসময় বাস্তব ও কল্পনার সীমানা অতিক্রম করে মানবিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সত্যের দিকে আমাদের চোখ ফেরায়। ‘এভরি লিফ অ্যা হ্যালেলুইয়া’ (২০২১) উপন্যাসটিও এর ব্যতিক্রম নয়।
যদিও বইটির কাঠামো শিশু-কিশোর উপযোগী কাহিনির আঙ্গিকে নির্মিত, তবু এর অন্তর্নিহিত দর্শন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক ও পরিবেশগত সংকট সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করে। বিশ্বায়নের যুগে দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে প্রকৃতি আজ ক্রমশ বিপন্ন হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে প্রকৃতিবান্ধব জীবনদর্শন উপস্থাপন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
উপন্যাসটিতে মাঙ্গোশি নামের এক কিশোরীর চোখ দিয়ে পাঠক প্রবেশ করে এমন এক বনে, যেখানে পাতা, শিকড়, ডালপালা ও মাটির প্রতিটি কণাই কথা বলে। এই প্রাকৃতিক আলাপন প্রতীকী অর্থে আমাদের মানবিক অস্তিত্বের গভীরে থাকা অন্তর্নিহিত সঙ্গীতের সন্ধান দেয়।
উপন্যাসের ভূমিকায় বেন ওকরি লিখেছেন, “শৈশবে আমি ভেবেছিলাম, বনভূমির সৌন্দর্য চিরকাল অটুট থাকবে। এখন আর সে বিষয়ে এতটা নিশ্চিত নই। কিছু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আছেন, যারা নিজেদের শৈশব ভুলে গেছেন, যারা প্রকৃতির চেয়ে অর্থকে বেশি মূল্য দেন। তারাই বন ধ্বংস করে চলেছেন।”
“আমি ছোটবেলাতেই জেনেছিলাম, গাছ অর্থের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। গাছ আমাদের আনন্দ দেয়। ভাবতে পারো, গাছহীন এক পৃথিবী কেমন হবে? এই কারণেই আমি এই গল্প লিখেছি। যদি গাছেরা নিজেরাই লিখতে পারত, তবে তারাই তোমাদের গল্প শোনাতো।”
“আমরা কেবল সেই গল্প শুনতে পারি, যখন আমরা গাছের বন্ধু হয়ে উঠি। আমরা যদি তাদের যত্ন নিই, তারাও আমাদের যত্ন নেবে। আমি চাই তুমি গাছকে ভালোবাসো। গাছেরা যেমন দেখা যায়, আসলে তেমন নয়। তারা জাদুকরী, আর আমাদের জীবনকেও তারা জাদুতে স্পর্শ করে।”
এ উপন্যাসে ওকরি তার কাব্যধর্মী গদ্যের মাধ্যমে প্রকৃতিকে শুধু পরিবেশগত প্রেক্ষাপটে নয়, আধ্যাত্মিক মাত্রায় উপস্থাপন করেছেন। বইয়ের নামেই ধ্বনিত হয় সেই ধারণা, ‘এভরি লিফ অ্যা হ্যালেলুইয়া’ বা ‘প্রতিটি পাতা একেকটি ঈশ্বরের স্তবগান’, যা জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও উদযাপনের রূপক। অনুবাদ করতে গিয়ে সহজে বোঝাতে ‘মঙ্গোশি ও কথা বলা গাছেরা’ নামটা বেছে নেওয়া হয়েছে।
ছোট্ট মেয়ে মঙ্গোশি। একদিন বনে বিশেষ কাজে গিয়েছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই বনের পথ ভুলে গেলো। বাড়ি ফেরার চেষ্টা করতে করতে সে একদম অচেনা বনের গাছপালার ভেতর চলে এলো। প্রথমে গাছগুলো দেখে তার ভয় লাগলো। গাছগুলো যেন ফিসফিস করে কিছু বলছে!
সে বুঝতে পারছে না শব্দটা কোথা থেকে আসছে। কখনো মনে হচ্ছে কাছেই কোনো নদী বয়ে যাচ্ছে। আবার কখনো মনে হচ্ছে পোকামাকড়ের গুঞ্জন। কিন্তু কোনো পোকা তো এমন শব্দ করে না!
কখনো শব্দ ভেসে আসছে উঁচু ডালের ফাঁক থেকে, কখনো নিচের ডালপালা থেকে। আবার কখনো মনে হচ্ছে শব্দটা গাছের শিকড়ের ভেতর থেকে আসছে। সে মাটিতে কান পেতে শোনার চেষ্টা করলো। সত্যিই মনে হলো শিকড়গুলো যেন ফিসফিস করছে।
হ্যাঁ, শিকড়গুলোও যেন কথা বলছে। কোনো রহস্যময় ভাষায়। এসব শব্দ শুনে অবাক হয়ে যায় সে। কিন্তু তখনই মনে পড়ে, দিন তো ফুরিয়ে আসছে! সূর্যের আলো ক্রমে নিভে যাচ্ছে। তাকে ফিরতেই হবে ঘরে। নইলে মা-বাবা অস্থির হয়ে পড়বেন চিন্তায়।
মাঙ্গোশিকে আসলে জঙ্গলে পাঠানো হয়েছিলো একটি বিশেষ ফুল আনতে। সেই ফুলটা শুধু জঙ্গলের সবচেয়ে পুরোনো গাছের ডালে ফোটে। ফুলটি তার অসুস্থ মায়ের রোগ সারাতে কাজে লাগবে। যাওয়ার শুরুটা খুব সহজ ছিলো। মাঙ্গোশি ফুলটাও খুঁজে পেল। কিন্তু ফেরার পথে হঠাৎ সব পথ যেন বাড়তে শুরু করলো। একটার পর একটা নতুন পথ দেখা দিতে লাগলো, আর সবগুলোই ভীষণ জটিল।
মাঙ্গোশি বুঝতে পারছে না কোন পথটা ধরবে। চারপাশে অদ্ভুত এক কুয়াশা নেমে এলো। তার চেনা পথটাকে আড়াল করে দিলো। মনে হলো যেন জঙ্গলটা নিজেই তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। সে যতবারই কোনো পথ ধরতে যাবে, ততবারই আরও গভীর জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে পড়তে লাগলো। আর সেখানে দেখা মিললো এমন সব গাছের, যেগুলো সে আগে কোনোদিন দেখেইনি!
একেকটা গাছ মহীরুহ, খুব উঁচু আর বিশাল। মনে হচ্ছে, শত শত বছরের পুরোনো। হঠাৎই মাঙ্গোশির মনে হলো, গাছগুলোর মধ্যে যেন এক ধরনের দুঃখ লুকিয়ে আছে। আর সেই দুঃখের অনুভূতি আসতেই সে গাছেদের মৃদু ফিসফিসানি শুনতে পেল। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা কুয়াশা এবার তার গায়েও এসে পড়ছে। পথ দেখা যাচ্ছে না আর।
অন্ধকারের মধ্যে হাত বাড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে গিয়ে ঠেকল এক গাছের গুঁড়িতে। মাঙ্গোশি আর হাঁটল না। ক্লান্ত হয়ে গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে বসল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমে ঢলে পড়ল। অল্পক্ষণ ঘুমোতেই সে যে ফিসফিসানি শুনছিল, সেগুলো এবার কথায় পরিণত হলো। গলা গভীর। বুড়ো কণ্ঠ। শক্ত বলিষ্ঠ স্বর। আবার কোমল সুমধুর সুরও। সবাই একসঙ্গে কথা বলছে, অবাক হয়ে যে অবশেষে কেউ তাদের কথা শুনতে পাচ্ছে।
তোমরা সবাই একসঙ্গে কথা বলছ। মাঙ্গোশি বললো, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
সঙ্গে সঙ্গে সব কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল। মনে হলো, তারা হয়তো কখনো মানুষের কণ্ঠস্বর শোনেনি, তাও আবার কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলছে!
তাহলে তোমাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ, তিনি আগে বলুন, মাঙ্গোশি বললো। তারপর আমি সবার কথা শুনতে চাই।
গাছগুলো নিশ্চুপ হয়ে রইল। কেন চুপ করে আছো? একটু আগেই তো সবাই মিলে কথা বলছিলে, বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি। তবুও তারা নিশ্চুপ রইল। এই নীরবতা মাঙ্গোশির কাছে আরও অদ্ভুত লাগল, সবাই একসঙ্গে কথা বলার চেয়েও বেশি অদ্ভুত। কিছুক্ষণ পর সে বুঝতে পারল, তাদের নীরবতার পেছনে একটা কারণ আছে। তারা চায়, মাঙ্গোশি যেন খেয়াল করে তারা কী করছে। মুহূর্তের মধ্যেই মাঙ্গোশি লক্ষ্য করল, আর দেখেই সে হালকা ভয়ে কেঁপে উঠল। গাছগুলো নড়ছে!
তারা ধীরে ধীরে মাঙ্গোশিকে ঘিরে ফেলেছে। ছোট ছোট গাছগুলো সামনে দাঁড়িয়েছে, আর বিশাল উঁচু গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে তাদের পেছনে। বড় বড় ওবেচে আর মেহেগনি গাছগুলো ছোটদের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। মাথাগুলো এমনভাবে নেমে এসেছে, যেন চোখ-মুখ বানিয়ে মাঙ্গোশির দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হলো যেন পুরো জঙ্গল একত্রিত হয়েছে তাকে ঘিরে, ঘন একটি গোল হয়ে, ঠিক যেমন কোনো গোষ্ঠীর সভায় বয়োজ্যেষ্ঠরা বসে থাকে।
মাঙ্গোশি বুঝতে পারল, চারপাশে কত রকমের স্বভাবের গাছ আছে। গম্ভীর বুড়ো ইরোকো গাছ, যারা কোনোদিন হাসে না। স্থির হলুদ কাঠগাছ, যাদের মধ্যে আছে প্রবচনের মতো জ্ঞানী ভাব। হাসিখুশি তরুণ রাধাচূড়া গাছ, যাদের স্বভাবেই আছে মজা করার কৌশল। ক্রমশ বেড়ে ওঠা জাকারান্ডা গাছ, যাদের ডালপালা সবসময় কিচিরমিচির করে। আর খুব প্রাচীন বাওবাব গাছ, যারা কম নড়ে, কিন্তু ভরপুর জ্ঞান ছড়ায়।
কেউ ছিল গল্প করতে ভালোবাসে, কেউ আবার মন দিয়ে শুনতে জানে। এরা সবাই মিলে ভিড় করে দাঁড়াল মাঙ্গোশির চারপাশে। বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল তার উপস্থিতির দিকে। তবু তারা অনেকক্ষণ কিছুই বললো না।
অবশেষে তাদের মধ্যে একজন কথা বলে উঠলো। কী কথা, সে জানা যাবে পরের পর্বে।