অনূদিত গল্প
Published : 10 Jan 2026, 04:36 PM
পার্ল এস. বাক (১৮৯২ – ১৯৭৩) মার্কিন লেখক ও ঔপন্যাসিক। তিনি শৈশব ও যৌবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন চীনে। বাক ১৯৩২ সালে পুলিৎজার পুরস্কার এবং ১৯৩৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান, যা তাকে প্রথম আমেরিকান নারী নোবেলজয়ী লেখকের মর্যাদা এনে দেয়। বাকের সবচেয়ে পরিচিত উপন্যাসগুলো হলো ‘গুড আর্থ’, ‘সন্স’, ‘হাউস ডিভাইডেড’, ‘ড্রাগন সিড’, ‘লেটার ফ্রম পেকিং’ ও ‘ইম্পেরিয়াল ওম্যান’ ইত্যাদি।
‘দ্য বিগ ওয়েভ’ শিরোনামে এটি মূলত একটি নভেলা, যা প্রথমে ছোটগল্প আকারে লেখা হয়েছিল। ফ্লিপবিল্ডার ডটকমের মূল ইংরেজি পিডিএফ থেকে এটি বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। গল্পের মূল সুর হলো মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক। প্রকৃতি এখানে একইসঙ্গে পালক ও সংহারক। সমুদ্র মাছ দেয়, আবার জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নেয়। আগ্নেয়গিরি মাটি উর্বর করে, আবার লাভাস্রোতে সব ধ্বংস করে।
এই প্রতিনিয়ত বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে মানুষ কীভাবে বাঁচে? কীভাবে স্বজন হারানোর শোক কাটিয়ে আবার নতুন করে ঘর বাঁধে? এই দার্শনিক প্রশ্নগুলোই গল্পের মেরুদণ্ড। গল্পের মূল দর্শন হলো- বিপদের সান্নিধ্যেই জীবন তার পূর্ণতা খুঁজে পায়।
জাপানের এক নিভৃত উপকূলে, যেখানে আকাশ আর সমুদ্র একাকার হয়ে যায়, সেখানেই কিনোর বাস। কিনো এক কৃষকের ছেলে। তাদের বাড়িটি পাহাড়ের বেশ উঁচুতে, যেন মেঘের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নেমে গেছে একের পর এক সিঁড়ির মতো ধাপ, সেখানেই কিনোর পূর্বপুরুষেরা যুগের পর যুগ ধরে ধানের চাষ করে আসছে। এই সোপানাকৃতি খেতগুলো যেন পাহাড়ের গায়ে আঁকা এক সবুজ নকশা, বাতাসের দোলায় ঢেউয়ের মতো দুলতে থাকে।
কিনোর ঘর থেকে নিচের দিকে তাকালে চোখে পড়ে অসীম নীল জলরাশি। সমুদ্র সেখানে শান্ত, সৌম্য। কিন্তু কিনো জানে, এই প্রশান্ত রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াল শক্তি।
পাহাড়ের নিচে, সমুদ্রের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ছোট এক জেলেপল্লি। সেখানেই বাস করে কিনোর প্রাণের বন্ধু জিয়া। জিয়ার ঘরটি একেবারে সমুদ্রের কিনারে। জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা জল এসে জিয়ার বাড়ির আঙিনায় আছড়ে পড়ে।
কিনোদের জীবন মাটির গন্ধে ভরা, আর জিয়ার জীবন নোনা জলের স্বাদে মেশানো। কিনো যখন পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে তাকায়, তার বুকটা ধক করে ওঠে। সে ভাবে, জিয়া কীভাবে অত নিচে, ওই বিশাল জলরাশির এত কাছে নিশ্চিন্তে ঘুমায়? সমুদ্র তো কেবল বন্ধু নয়, সে তো এক সুপ্ত দানবও বটে!
আবার জিয়া যখন পাহাড়ের দিকে তাকায়, তার চোখে পড়ে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত আগ্নেয়গিরিটি। ওটার মুখ দিয়ে সবসময়ই কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া বের হয়। জিয়ার কাছে মনে হয়, পাহাড়ের মানুষগুলো যেন আগুনের ওপর বসে আছে।
কিনো প্রায়ই তার বাবাকে জিজ্ঞেস করে, “বাবা, আমরা কি নিরাপদ? ওই আগ্নেয়গিরি যদি জেগে ওঠে?”
কিনোর বাবা একজন জ্ঞানী মানুষ। তিনি শান্ত গলায় বলেন, “কিনো, এই পৃথিবীতে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে কোনো স্থান নেই। সমুদ্রের ভয় আছে, আগুনের ভয় আছে, ঝড়ের ভয় আছে। কিন্তু তাই বলে কি আমরা বাঁচব না? মৃত্যুর ভয় আছে বলেই তো জীবন এত সুন্দর। আমরা বিপদকে সঙ্গে নিয়েই বাঁচতে শিখি, আর সেটাই আমাদের জাপানি মানুষের শক্তি।”
দিনগুলো নিজের নিয়মেই কেটে যাচ্ছে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে কিনো তার বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করতে যায়, আর জিয়া তার বাবার নৌকায় চড়ে পাড়ি দেয় গভীর সমুদ্রে।
কিন্তু একদিন প্রকৃতি তার রূপ বদলাতে শুরু করল। বাতাস থমকে গেল, আকাশ এক অদ্ভুত তামাটে বর্ণ ধারণ করল। পাহাড়ের চূড়ার আগ্নেয়গিরিটি যেন হঠাৎ করেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল, তার মুখ দিয়ে আগুনের ফুলকি আর ঘন কালো ধোঁয়া বের হতে লাগল। বাতাস ভারী হয়ে উঠল ছাইয়ের গন্ধে।
সেদিন বিকেলে কিনো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গেল। কিন্তু জিয়ার চোখে আজ সেই চিরচেনা চপলতা নেই। সে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে।
“কিনো,” জিয়া ফিসফিস করে বলল, “সমুদ্র আজ বড় অদ্ভুত আচরণ করছে। দেখো, জল কেমন পিছিয়ে যাচ্ছে। যেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তি সমুদ্রকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পেছনের দিকে।”
কিনো দেখল, সত্যিই তাই। সমুদ্রতট অস্বাভাবিকভাবে জেগে উঠেছে, বহুদূর পর্যন্ত কাদা আর প্রবাল পাথর দেখা যাচ্ছে। জিয়ার বাবা, যিনি একজন অভিজ্ঞ জেলে, আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “জিয়া, আজ আর সমুদ্রে যেও না। প্রলয়ের মেঘ ঘনিয়ে আসছে। প্রকৃতির এই নীরবতা ঝড়ের চেয়েও ভয়ঙ্কর।”
পাহাড়ের ওপরে আছে ‘ওল্ড জেন্টলম্যান’ বা সেই বৃদ্ধ ধনী ব্যক্তির বিশাল দুর্গপ্রাসাদ। তিনি ওই অঞ্চলের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী এবং জ্ঞানী ব্যক্তি। বিপদের আঁচ পেয়ে তিনি আগেই দুর্গের মিনার থেকে সতর্কঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন। ঢং... ঢং... ঢং... সেই ঘণ্টার ধ্বনি বাতাসের বুক চিরে ছড়িয়ে পড়ল উপত্যকা থেকে সমুদ্রতট পর্যন্ত।
কিনোর বাবা চিৎকার করে জিয়াদের ডাকলেন, “উপরে এসো! পাহাড়ের উপরে চলে এসো! বিপদ আসছে!”
জিয়া তার বাবার দিকে তাকাল। কিন্তু জিয়ার বাবা মাথা নাড়লেন। জেলের ধর্ম সমুদ্র ছেড়ে পালানো নয়, বরং নৌকাগুলোকে রক্ষা করা। তিনি জিয়াকে ধমক দিয়ে বললেন, “তুমি যাও জিয়া! কিনোর কাছে যাও! আমরা নৌকাগুলো বাঁধার ব্যবস্থা করি।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও জিয়া দৌড় দিল। তার পায়ের নিচে বালি সরে যাচ্ছে, হৃৎস্পন্দন যেন গলার কাছে উঠে এসেছে। সে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। কিনো হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তাকে ধরার জন্য।
জিয়া যখন কিনোর হাত ধরে পাহাড়ের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাল, ঠিক তখনই ঘটল সেই ঘটনা, যা মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। দিগন্তরেখায় দেখা দিল এক অতিকায় ছায়া। প্রথমে মনে হলো বুঝি কালো মেঘ, কিন্তু না, ওটা মেঘ ছিল না। ওটা ছিল জল। সমুদ্রের বুক চিরে উঠে আসা এক দানবীয় প্রাচীর।
সেই ঢেউয়ের মাথায় আছে এক অদ্ভুত বেগুনি আভা। অস্তগামী সূর্যের আলোয় সেই জলোচ্ছ্বাসকে মনে হচ্ছে এক জ্বলন্ত পাহাড়। কিনো আর জিয়া স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তাদের চোখের সামনে সেই বিশাল ঢেউ গর্জাতে গর্জাতে ধেয়ে এলো তীরের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে সেই ঢেউ আছড়ে পড়ল জেলেপল্লির ওপর।
কোনো শব্দ করার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। জিয়ার বাড়ি, তার বাবা-মা, গ্রামের অন্য জেলেরা, সবাইকে সেই রাক্ষুসে জলরাশি এক নিমেষে গ্রাস করে নিল। পাহাড়ের নিচে যেখানে কিছুক্ষণ আগেও প্রাণচঞ্চল একটা গ্রাম ছিল, সেখানে এখন শুধু অথৈ জল আর ধ্বংসস্তূপ।
জিয়া চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে জ্ঞান হারিয়ে কিনোর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল। সমুদ্র তার প্রিয়তম সবকিছু কেড়ে নিয়েছে, রেখে গেছে কেবল এক বুকভরা শূন্যতা।
পরের দিনগুলো হলো বড়ই বিষাদের। জিয়া তার জ্ঞান ফিরে পেল বটে, কিন্তু তার আত্মা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। সে কথা বলে না, কাঁদে না, শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। কিনোর ছোট বোন সেতসু তাকে হাসানোর চেষ্টা করে, কিন্তু জিয়ার পাথরের মতো মুখে কোনো ভাবান্তর হয় না।
কিনো তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, জিয়া কি আর কোনোদিন হাসবে না? ও কি আমাদের ভুলে গেছে?”
কিনোর বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কিনো, শোকের আঘাত যখন খুব গভীর হয়, তখন মানুষ কাঁদার শক্তিও হারিয়ে ফেলে। ওকে সময় দাও। সময় ও প্রকৃতির মতো বড় চিকিৎসক আর কেউ নেই। ওকে ঘুমাতে দাও, শরীরের ক্লান্তি দূর হলে মনের ক্লান্তিও একসময় দূর হবে।”
পাহাড়ের উপরের সেই ধনী বৃদ্ধ, ‘ওল্ড জেন্টলম্যান’, খবর পেলেন যে একটি এতিম ছেলে কিনোদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তিনি দয়া পরবশ হয়ে কিনোর বাবাকে ডেকে পাঠালেন। প্রস্তাব দিলেন, জিয়াকে তিনি দত্তক নিতে চান। তার বিশাল দুর্গে জিয়া রাজপুত্রের মতো থাকবে, তার কোনো অভাব হবে না। সে পড়াশোনা শিখবে, বড় মানুষ হবে, কিন্তু তাকে তার অতীত ভুলে যেতে হবে।
কিনোর বাবা এই প্রস্তাব নিয়ে জিয়ার কাছে গেলেন। জিয়া তখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। সব শুনে জিয়া মাথা নাড়ল। তার চোখভরা জল, কিন্তু কণ্ঠে দৃঢ়তা। সে বলল, “না, আমি দুর্গে যাব না। আমি কৃষক নই, আমি জেলের ছেলে। আমার রক্তে নোনা জল। আমি কিনোদের সঙ্গেই থাকব। এখানেই আমি আমার বাবার ভালোবাসা খুঁজে পাই।”
ওল্ড জেন্টলম্যানের বিলাসিতা জিয়াকে টলাতে পারল না। সে বুঝল, দুঃখ ভুলে যাওয়া মানে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। সে তার শেকড় ছিঁড়তে চাইল না।
বছর ঘুরে বছর এলো। সময়ের প্রলেপে জিয়ার ক্ষত শুকিয়ে গেলো, কিন্তু দাগগুলো রয়ে গেল স্মৃতি হয়ে। জিয়া এখন এক বলিষ্ঠ যুবক। কিনোর মতোই সে পরিশ্রমী, কিন্তু তার দৃষ্টি সবসময়ই নিবদ্ধ থাকে সমুদ্রের দিকে। কিনোর বোন সেতসু এখন যুবতী, চপলা এবং প্রাণবন্ত। জিয়ার গম্ভীর জীবনে সেতসু যেন বসন্তের বাতাস। তাদের দুজনের মধ্যে গড়ে উঠল এক গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক।
একদিন জিয়া কিনোকে বলল, “আমি আবার নিচে ফিরে যাব, কিনো।” কিনো অবাক হয়ে বলল, “নিচে? সেই মৃত্যুপুরীতে? যেখানে সমুদ্র সব কেড়ে নিয়েছিল?” জিয়া হাসল। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। “হ্যাঁ, বন্ধু। আমি ওখানেই বাড়ি বানাব। তবে এবার আমার বাড়ির জানালা থাকবে সমুদ্রের দিকে। আমি সমুদ্রকে আর ভয় পাই না। আমি তার মুখোমুখি হতে চাই।”
জিয়া সমুদ্রের তরে ফিরে গেল। সেতসুকে বিয়ে করে নতুন সংসার পাতল সেই পুরোনো ধ্বংসস্তূপের ওপর। সে নতুন করে ঘর তুলল, তবে এবার সে ঘরের জানালা রাখল সমুদ্রমুখী। সে চায় না সমুদ্র চোরের মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুক। সে চায় বিপদের চোখের দিকে তাকিয়ে বাঁচতে।
বিয়ের দিন কিনোর বাবা তাদের আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমরা প্রমাণ করলে যে জীবন মৃত্যুর চেয়েও শক্তিশালী। ঢেউ আসে, সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু মানুষ আবার উঠে দাঁড়ায়। এটাই আমাদের জাপানি সত্তা। আমরা ধ্বংসের মাঝেও সৃষ্টির স্বপ্ন দেখি।”
জিয়া তার নতুন ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে দিগন্তের দিকে তাকাল। সমুদ্র আজও গর্জন করছে, ঢেউ আছড়ে পড়ছে। কিন্তু জিয়া জানে, এই ঢেউ কেবল মৃত্যুর বার্তা আনে না, এই ঢেউ জীবনের স্পন্দনও। সে তার বাবার মতো, তার পূর্বপুরুষদের মতো, বুক চিতিয়ে দাঁড়াল। জীবন নামের এই মহাতরঙ্গে ভেসে থাকার নামই তো বেঁচে থাকা।