১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

কিশোর থ্রিলার: ঝড়ের রাত

দরজা খুলেই পিছিয়ে আসে রিতেশ। দরজার ওপাশে একটা ছায়ামূর্তি!

রবিউল কমল রবিউল কমল

Published : 26 Aug 2025, 12:34 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:11 PM

রাত বাজে দুইটা। বাপুনের এখনো খবর নেই? দশটার দিকে ওরা হোটেলের এই রুমে ওঠে। তারপর ফ্রেশ হয়ে বাপুন বেরিয়ে গেল। গেল তো গেলই, আর ফেরার নাম নেই। 

টেনশনে রিতেশের মাথা ঘুরছে। মোবাইল করে যে খোঁজে নেবে, তারও সুযোগ সেই। মোবাইলটা রুমেই ফেলে গেছে। এদিকে কাল সকালেই আবার বিতর্ক প্রতিযোগিতা। তার প্রস্তুতি নিতে হবে। ওদের সঙ্গে স্যারসহ আরও তিনজন এসেছে। প্রত্যেক রুমে দুজন করে থাকতে পারবে। বাপুন ও রিতেশ কাছের বন্ধু, তাই ওরা একই রুমে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

কিন্তু, বাপুনটা যে কী করে! গেলি তো গেলি মোবাইলটা নিয়ে যা, অন্তত ফোন করে তো জানাতে পারতিস, কোনো সমস্যা হয়েছে কি না! নাহ, আর দেরি করা ঠিক হবে না। চার ঘণ্টা হয়ে গেছে। এবার বাইরে গিয়ে খোঁজ নেওয়া দরকার। কোনো বিপদ-টিপদ হলে আবার স্যারকে জানাতে হবে। 

রিতেশ খাট থেকে নামে। তারপর জামাটা গায়ে দিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলেই পিছিয়ে আসে রিতেশ! দরজার ওপাশে একটা ছায়ামূর্তি! দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ না অন্যকিছু তা বোঝা যাচ্ছে না। ভয়ে রিতেশের হার্টবিট বেড়ে গেছে। একে তো অপরিচিত জায়গা, তারপর আবার একা। বাপুন থাকলে এতটা ভয় পেত না ও। কী করবে বুঝতে পারছে না রিতেশ, একবার কী উঁকি মেরে দেখবে?

ও যখন এসব ভাবছিল, ঠিক তখন তড়িঘড়ি করে রুমে ঢোকে বাপুন। ভিজে একেবারে জবুথবু অবস্থা। মাথার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। শার্ট থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। প্যান্টটাও ভিজে গেছে। চশমার কাচ পানির ফোটায় ঘোলা হয়ে আছে। বাপুনকে ঠিক চেনা যাচ্ছে না। 

তোর এ অবস্থা কেন?

আর বলিস নে, বাইরে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি। তাই তো আসতে দেরি হলো।

তা ফোন করে জানাতে পারতিস। আমার তো টেনশন হয় না কি?

কাছে ফোন ছিল না।

তো কী হয়েছে? কোনো দোকান থেকে এক মিনিট কথা বলা যেত না। তোর কোনো সমস্যা হলে আঙ্কেল-আন্টি তো আমাকে বকবে।

এখন এসেছি, এসব আলোচনা বাদ দে।

ঠিক আছে বাদই দিলাম। আচ্ছা তুই রুমে ঢোকার সময় বাইরে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিস?

বাইরে অনেকেই আছে দেখলাম।

আরে ওই বাইরের কথা বলছি না, দরজার বাইরে।

দরজার বাইরে! না, কাউকে দেখলাম না তো!

বাপুনের কথায় অবাক হলো রিতেশ। ও আবার দরজার দিকে এগিয়ে যায়। সত্যিই তো, দরজার বাইরে কেউ নেই। সেই ছায়ামূর্তিও নেই। কিন্তু রিতেশ ভুল দেখেনি, ও স্পষ্ট দেখেছে দরজার সামনে কোনোকিছুর ছায়া এসে পড়েছে। মনে হচ্ছিল, সেখানে কিছু দাঁড়িয়ে ওকে ফলো করছে।

বাপুন ভেজা জামাটা খুলে চেয়ারের ওপর রাখে। চশমাটা খুলে টেবিলে রাখে। তারপর ব্যাগ থেকে টিশার্ট বের করে গায়ে দিলো। রিতেশ ওর ভেজা জামা চেয়ার থেকে সরিয়ে হ্যাঙারে টানিয়ে দিলো। কিন্তু ও অবাক হলো! বাপুনের সাদা জামার পেছনে লাল হয়ে আছে। ভালো করে হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে রিতেশ। ও বোঝার চেষ্টা করে কীসের দাগ হতে পারে। তারপর চিৎকার করে বলল, সর্বনাশ! এতো লালচে দাগ? রক্ত নয়তো? 

লালচে দাগ! কোথায়?

তোর জামায়?

লালচে দাগ! তাও আমার জামায়! কী বলছিস?

এই যে! বলেই বাপুনের দিকে জামাটা ছুড়ে মারল রিতেশ। বাপুন জামাটা নিয়ে কয়েকবার দেখল। এমন দাগ দেখে অবাক হলো বাপুনও। 

হ্যাঁ, রক্তের মতোই মনে হচ্ছে! কিন্তু কীভাবে লাগল?

কাউকে খুনটুন করেছিস না কি?

কি যা তা বলছিস? আমার দ্বারা মানুষ খুন করা সম্ভব না কি?

তাহলে অদ্ভুত লাল দাগ কীসের?

আমিও সেটাই ভাবছি।

তারপর কিছুসময় মাথা নিচু করে ভাবল বাপুন। উঠে দাঁড়িয়ে দুই তিনবার রুমের এমাথা ওমাথা পায়চারি করল। টি-শার্ট খুলে আবার ভেজা জামাটা পরলো। মোবাইলটা হাতে নিলো বাপুন। তারপর কিছু না বলেই রুম থেকে বের হয়ে যায়। চশমাটাও নিল না। রিতেশ ওর পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। বাইরে বৃষ্টি কমেছে। কিন্তু অনেক ঝড়। শন শন গতিতে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় গাছের পাতা ও ভাঙা ডাল পড়ে আছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।

বাপুন খুব জোরে হাঁটছে। রিতেশ ওর সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। কীরে আস্তে হাঁট, ভূতের মতো হাঁটছিস কেন?

কোনো উত্তর না দিয়ে হাঁটতে থাকে বাপুন। একটি বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে ঘরের মধ্যে ঢোকে। রিতেশ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। এত সময় বৃষ্টি ছিল না। এখন আবার ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। তার সঙ্গে ঝড়ের গতি যেন আরও বেড়েছে। বাঁশ গাছগুলো মাটিতে হেলে পড়ছে। রিতেশের সামনেই একটি শিস্টিফুলের ডাল ভেঙে পড়ে। অল্পের জন্য ওর গায়ের ওপর পড়ল না। রিতেশের খুব ভয় করছে। ও কয়েকবার বাপুনকে ডাকল। কিন্তু কোনো উত্তর এলো না।

কিছুক্ষণ পর বাপুন বেরিয়ে আসে। কিন্তু কোনো কথা বলল না। বাপুন হোটেলের দিকে হাঁটতে থাকে। ঝড়-বৃষ্টি যেন ওর গায়েই লাগছে না। ঝড়ের গতির চেয়েও জোরে হাঁটছে। 

একটু আস্তে যা রে ভাই, আমি তো তোর সঙ্গে তাল মেলাতে পারছি না। তুই কি সত্যি ভূত হয়ে গেলি না কি? রিতেশের কথা শুনে পিছনে ফিরে তাকায় বাপুন। তারপর এমন এক হাসি দিলো, তাতে মনে হলো ওর সবগুলো দাঁত খুলে বেরিয়ে আসবে।

তুই এমন ভয়ংকরভাবে হাসছিস কেন? আমার কিন্তু সত্যি সত্যি অনেক ভয় করছে।

তুই হোটেলে যা, আমি ওই দোকান থেকে এক প্যাকেট চিপস কিনে আসছি। বলে বাপুন মোড়ের দিকে চলে যাচ্ছিল। ঠিক আছে, দেরি করিস না আবার, বলল রিতেশ।

বাপুন তাতে মাথা নাড়িয়ে ওর কথায় সম্মতি জানাল। রিতেশ হাঁটতে হাঁটতে হোটেলে ফেরে। কিন্তু রুমে ঢুকেই অবাক! খাটের ওপর বাপুন বসে আছে! লাফিয়ে ওঠে রিতেশ। তারপর নিজের বুকে থুতু দিলো কয়েকবার।

কী ব্যাপার, তুই রুমে এলি কীভাবে। তুই না চিপস কিনতে গেলি?

তুই কী বোকা না কি? আমি স্যারের সঙ্গে ছিলাম। আর এই ঝড়ের রাতে কোনো দোকান খোলা থাকে?

তাহলে আমি…

তুই রিতেশ, আর আমি বাপুন! আমরা দুজন বন্ধু।

আমি কিছু বুঝতে পারছি না…

তোর কিছু বুঝতে হবে না, আমার মোবাইলটা দে, বাড়িতে এক মিনিট কথা বলি।

একটু আগেই তো তুই মোবাইল নিলি।

আমি রুমেই এলাম মাত্র, সেই তখন থেকে স্যারের সঙ্গে পরিকল্পনা করছিলাম, কীভাবে কালকের বিতর্কে জেতা যায়। এর মধ্যে মোবাইল নিলাম কখন? আর নেবোই বা কীভাবে, আমি রুমেই আসিনি।

দেখ মজা করিস নে, আমি এমনিতেই খুব ভয় পেয়েছি।

আমি কোনো মজা করছি না রিতেশ।

আচ্ছা তোর গায়ে সাদা শার্ট ছিল, তাতে অদ্ভুত লাল দাগ লাগে…

সেই সকাল থেকে লাল জামা গায়ে দিয়ে আছি। আমার কোনো সাদা শার্ট নেই।

তাহলে আমি কার সঙ্গে বাইরে গেলাম?

আমি শিউর তুই মজা করছি। মোবাইলটা দে, আব্বুর কাছে কল দিতে হবে।

রিতেশ খাটে বসে। ওর মাথা ঘুরছে। জগটা নিয়ে এক গ্লাস পানি খেলো। তারপর বাপুনকে সব খুলে বলল। বাপুন শুরুতে বিশ্বাস করছিল না। অবশ্য পরে গিয়ে স্যারকে সব ঘটনা বলল। স্যার বললেন, আমার মনে হয় রিতেশের কোথাও ভুল হচ্ছে। বাপুন তুমি তো আমাদের সঙ্গে ছিলে। রিতেশ বলল, স্যার, আমি সত্যি কথা বলছি। দেখুন না, আমার জামা বৃষ্টিতে হালকা ভিজে আছে। আর আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয়, তাহলে চলুন সেই ঘরটার ওখান থেকে ঘুরে আসি।

রিতেশের কথায় স্যার ও বাপুন রাজি হলো। ওরা হোটেল থেকে বের হয়ে রিতেশের পিছু পিছু যাচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর রিতেশ বলল, স্যার, ওই যে ওখানে ঘরটা। স্যার এগিয়ে গেলেন। তারপর টর্চ মারলেন। কিন্তু সেখানে কোনো ঘর নেই। একটি নতুন কবর দেখা যাচ্ছে। 

নতুন কবর দেখে স্যারও ভয় পেলেন! কিন্তু বুঝতে দিলেন না। তিনি একটুখানি পিছিয়ে এলেন। তখন স্যারের পা কিছুতে বাধল। তিনি নিচু হয়ে হাত দিয়ে তুললেন। হাতে টর্চ মারলেন। সঙ্গে সঙ্গে বাপুন বলল, স্যার এটা তো আমার মোবাইল! কিন্তু এখানে এলো কীভাবে?

ওরা আর সেখানে এক মুহূর্ত দেরি করল না। খুব দ্রুত হেঁটে হোটেলে ফিরল। বাপুন ও রিতেশের সঙ্গে স্যারও ওদের রুমে এলেন। টেবিলে সেই চশমাটা পড়ে আছে। রিতেশ বলল, স্যার, আমি মিথ্যা বলিনি। ওই যে টেবিলে চশমাটাও পড়ে আছে।

সেই রাতে স্যারের রুমেই থাকল বাপুন ও রিতেশ। কিন্তু রাতে আর ওদের ঘুম হলো না। কোনো রকমে রাতটুকু সেখানে কাটিয়ে সকালেই বিদায় নিলো। বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আর অংশ নেওয়া হলো না ওদের টিমের। হোটেলের রিসিপশনে চাবি দেওয়ার সময় ওরা জানতে পারে, ওটা হোটেলের ম্যানেজারের কবর। কয়েকদিন আগে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।