ভ্রমণগদ্য
Published : 22 Dec 2025, 12:17 AM
চীনে ভ্রমণ নিয়ে জনপ্রিয় একটি প্রবাদ আছে- “হাজার মাইল পথ পাড়ি দেওয়া হাজারটি বই পড়ার চেয়েও ভালো।” সুতরাং হাজার মাইল তো ভ্রমণ হয়েই গেল। বাংলাদেশের সেই চিরচেনা বিমানবন্দর থেকে মায়ানমার আর কম্বোডিয়ার ওপর দিয়ে আকাশপথে পাড়ি দিয়ে চীনের গুয়াংজু বিমানবন্দর। তারপর গুয়াংজু থেকে চীনের বিস্তীর্ণ জনপদ, পাহাড়, মরুভূমি আর সুউচ্চ পর্বতমালা অতিক্রম করে উরুমচি শহর। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটারের এক বিশাল অভিযাত্রা।
এরপর একে একে উরুমচির দক্ষিণে ইন্টারন্যাশনাল গ্র্যান্ড বাজার, দক্ষিণ-পশ্চিমে এশিয়ান সিটি, উত্তরে হংগুয়াংসান বৌদ্ধ মূর্তি, জেং কুভিয়ান প্রাচীন শহর, উত্তর-পশ্চিমে বিমানবন্দর, ফ্রি ট্রেড জোন আর হুতুবির বিশাল কৃষি অঞ্চল- সবই তো দেখা হলো। এরপর বাকি থাকে কী? আজ আমাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে উরুমচির পূর্ব দিকে। রহস্যঘেরা সেই পূর্ব দিকে আজ আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?
আজ ছিল চীন ভ্রমণের দশম দিন। মধ্যাহ্নভোজের পর আমাদের গন্তব্য উরুমচির পূর্ব দিকের একটি হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন। এর আগে সকালে ক্লাসের ফাঁকে আমি আর আমার সহকর্মী কামরুল হাসান বেরিয়ে পড়েছিলাম উরুমচির একটি জাদুঘর পরিদর্শনে। পুরো শিনজিয়াং প্রদেশে প্রায় ২৩টি জাদুঘর আছে, আর উরুমচি শহরেই রয়েছে ১০ থেকে ১৩টি। হাতে সময় কম থাকায় ম্যাপ দেখে সবচেয়ে কাছের জাদুঘরটিকেই বেছে নিলাম। হোটেলের সামনে থেকে ট্যাক্সি নিয়ে ড্রাইভারকে মোবাইল ম্যাপে গন্তব্য দেখালে সে ক্ষিপ্র গতিতে আমাদের নিয়ে ছুটল সিটি সেন্টারের দিকে।

“চীনা সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও গভীর, আর প্রতিটি জাদুঘর যেন এক একটি বিশাল বিদ্যাপীঠ”, উক্তিটি চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের। তিনি আধুনিক যুগের ‘চাইনিজ ড্রিম’ স্লোগানের প্রবক্তা, যার মর্মকথা হলো চীনা জাতির পুনর্জাগরণ। অন্যদিকে দার্শনিক কনফুসিয়াস আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগেই বলে গেছেন, “যদি তুমি ভবিষ্যৎ জানতে চাও, তবে অতীত অধ্যয়ন করো।” তিনি ছিলেন চীনের নৈতিকতা, সঠিক সামাজিক সম্পর্ক, ন্যায়বিচার ও সততার ভিত্তির প্রবক্তা, যা আজও চীনা সমাজে সমাদৃত। এই দুই দিকপালের দর্শন থেকেই বোঝা যায় চীনে জাদুঘরের কদর কত বেশি।
জাতিগত শিক্ষা ও ইতিহাস চর্চার জন্য পুরো চীন জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত অনন্য জাদুঘর। আমরা যেখানে পৌঁছলাম, তার নাম ‘শিনজিয়াং ন্যাচারাল মিউজিয়াম, চীন’। এটি যেন এক ছাদের নিচে পুরো ১৬ লাখ বর্গকিলোমিটারের বিশাল প্রদেশের প্রতিচ্ছবি। শিনজিয়াংয়ের প্রতিটি কোণ থেকে সংগৃহীত প্রাকৃতিক সম্পদ- সরীসৃপ, পাখি, মাছ, স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে শুরু করে দুর্লভ পাথর, খনিজ, জীবাশ্ম বা ফসিল, স্কেলেটন ও আদিম লিপি- সবই তুলে আনা হয়েছে এখানে। প্রদর্শিত হয়েছে প্রায় বারোশ নমুনা।
চমকের পর চমক! আমেরিকা, ইউরোপ বা এশিয়ার উন্নত দেশগুলোর তুলনায় চীন কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। আক্ষেপ শুধু বাংলাদেশের জন্য, আমাদেরও যদি এমন একটি সমৃদ্ধ জাদুঘর থাকত, তবে আমরাও আমাদের দেশকে আরও ভালোভাবে চিনে নিতে পারতাম!

দুপুরের পর আমাদের বাস চলল শহরের পূর্ব দিকে। চওড়া অ্যাভিনিউ ধরে আয়েশি ভঙ্গিতে ছুটছে গাড়ি। বিমানবন্দরের কাছাকাছি আসতেই নীল আকাশে খেলনার মতো অসংখ্য বিমানের উড়াউড়ি চোখে পড়ল। বাস যখন ডান দিকে মোড় নিল, দিগন্তে ভেসে উঠল তুষারধবল তিয়ানশান পর্বত। ঠিক যেন পঞ্চগড় থেকে দেখা হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘার এক স্বচ্ছ আর মায়াবী রূপ। সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য অবলোকন করতে করতে আমরা পৌঁছলাম এক ছিমছাম ভবনের সামনে, ‘শিনজিয়াং ফ্রুট ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড’। এটি মূলত একটি বিশালাকার খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা।
কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক আমাদের স্বাগত জানিয়ে পুরো ফ্যাক্টরি ঘুরে দেখালেন। আখরোট, কাঠবাদাম, কিশমিশ, লাল খেজুর, টমেটো পেস্ট, টমেটো পাউডার, আপেলের জুস, ফ্রুট ক্রিপসি বা চিপস, স্ট্রবেরিসহ বিভিন্ন সংরক্ষিত ফল এবং সবজি ও ফলের পাউডার। কতশত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের সমারোহ! পরিদর্শন শেষে কর্তৃপক্ষ আমাদের সনিবন্ধ আপ্যায়ন করল এবং আমরাও সেখান থেকে কিছু বিশেষ খাবার কিনে নিলাম স্মৃতি হিসেবে।
এরপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো পার্শ্ববর্তী একটি কৃষি খামারে। সেখানে বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, বরবটি, স্কোয়াশ আর শসার আধুনিক চাষাবাদ। ওপরের নীল আকাশ আর দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ দেখে মনে হলো এ তো হুবহু আমার বাংলাদেশ! বেলে ধূসর মাটি, জমির আল, সবজির খেতের সুবাস আর পতঙ্গদের ডানার আওয়াজ, সবই যেন আমাদের দেশের চিরচেনা প্রকৃতির রূপ। প্রকৃতির এমন নিবিড় সান্নিধ্যে কি আর পরিপাটি থাকা যায়? আমাদের অনেকেই তখন জুতো খুলে খালি পায়ে আলপথ ধরে হাঁটতে শুরু করলেন।

সবজি বাগান দেখার পর আমরা গেলাম রাস্তার ওপারে ফলের বাগানে। সেটি সাধারণ কোনো বাগান নয়, আপেল আর স্ট্রবেরির এক মোহনীয় অরণ্য। জীবনে এই প্রথম চাক্ষুষ আপেল বাগানে প্রবেশের অভিজ্ঞতায় সবাই উন্মুখ হয়ে রইলাম। লালের পাশাপাশি টিয়া রঙের হলুদ আপেলও দুলছিল ডালে ডালে। ম্যানেজমেন্ট টিমের প্রধান এমি যখন ঘোষণা করলেন, “তোমরা ইচ্ছামতো ফল পেড়ে খেতে পারো”, তখন আর আমাদের রুখবে কে? সতেজ আর রসালো সেই আপেলের যে স্বাদ পেলাম, তা আমদানিকৃত আপেলে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। চীন পৃথিবীর মোট আপেল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক সরবরাহ করে থাকে।
হোটেলে ফিরে রাতের খাবার শেষে যখন নিজের রুমের দিকে পা বাড়াচ্ছি, ঠিক তখনই উইঘুর যুবক সালামের ডাক। সে কাছে এসে প্রস্তাব দিল থিয়েটারে নাটক দেখার। চীনের থিয়েটার দেখার সুযোগ অনেকদিন ধরেই খুঁজছিলাম, এটি যেন ছিল মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। দেরি না করে দ্রুত তৈরি হয়ে ট্যাক্সি নিয়ে আমরা রওনা হলাম উরুমচির থিয়েটার উপভোগ করতে।
হোটেল থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ‘শিনজিয়াং গ্র্যান্ড থিয়েটার’-এ পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত আটটা বেজে গেল। শো শুরু হবে রাত সাড়ে আটটায়। ট্যাক্সি থেকে নেমে আমরা সরাসরি বিশাল সোনালি গম্বুজের থিয়েটার ভবনের কাউন্টারে চলে এলাম। জানতে পারলাম, তিন ধরনের টিকেটের মধ্যে মধ্যম মানের টিকেটের মূল্য ২৮০ আরএমবি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার টাকা)। দাম শুনে কিছুটা চমকে গেলাম। ঢাকাতে আমরা সস্তায় থিয়েটার দেখে অভ্যস্ত, অথচ চীনে এত দাম! তবে মনে মনে বললাম, শিল্প কোনো সস্তা পাওয়ার বস্তু নয়! আজ পকেটে টাকাও ছিল পর্যাপ্ত, কারণ বেইজিং ভ্রমণের জন্য কেবলই ১ হাজার ১৫০ আরএমবি অ্যালাউন্স পেয়েছিলাম।
নাটকের নাম ছিল ‘থাউজেন্ডস অফ রিটার্নস টু দ্য ওয়েস্টার্ন রিজিয়নস’। স্থানীয় উইঘুর ভাষার এক মহাকাব্যিক নাটক। শুরুতেই ‘মোকাম’ সংগীতের করুণ অথচ ছন্দময় সুরের আবহ ছড়িয়ে পড়ল। তালে তালে বেজে উঠল ‘রেওয়াপ’, যা দেখতে অনেকটা আমাদের দোতারার মতো। মঞ্চে উন্মোচিত হলো প্রাচীন সিল্ক রোড। ৩৬০ ডিগ্রি এলইডি স্ক্রিন, হলোগ্রাফিক প্রজেকশন আর থ্রি-ডি ইমেজের কারুকাজে মঞ্চে এক অসাধারণ ইলিউশন ও পরাবাস্তবতা তৈরি করা হয়েছে। মুগ্ধতায় বুঁদ হয়ে রইলাম সেই দৃশ্যের দিকে।

মঞ্চে আবির্ভাব ঘটল প্রাচীন হান বংশের কূটনীতিক ঝাং কিয়ানের, যিনি প্রথম সিল্ক রোডের সূচনা করেছিলেন। স্মৃতিরোমন্থনের মাধ্যমে তিনি বিবৃত করলেন সেই সিল্ক রোডের গৌরবোজ্জ্বল কাহিনি। এরপর আসলেন ষোড়শ শতকের ইয়ারকান্ত খানাত অঞ্চলের এক বিদুষী রানি আমানিসা খান। কুশীলবরা তুলে ধরলেন আমানিসা কত কঠিন সাধনায় উইঘুর শাস্ত্রীয় সংগীত ‘বারো মোকাম’ সংগ্রহ ও সংকলন করেছিলেন। দৃশ্যান্তরে হঠাৎ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শুয়ানজাং মঞ্চে উপস্থিত হয়ে সিল্ক রোডের আধ্যাত্মিক সংলাপ আওড়াতে আওড়াতে ব্যাকড্রপের আড়ালে মিলিয়ে গেলেন।
নাটকের অন্যতম আকর্ষণ ছিল লোলান রাজকুমারী। এক রহস্যময় প্রত্নতাত্ত্বিক চরিত্র হিসেবে তিনি লোলান সাম্রাজ্যের হৃত গৌরব বর্ণনা করে শেষে বালির তলে হারিয়ে যাওয়ার করুণ কাহিনি তুলে ধরলেন। নাটকের শেষ দিকে দেখা গেল ভেনিসের পর্যটক মার্কো পোলোর উপস্থিতি, যিনি সিল্ক রোডের সমৃদ্ধি দেখে বিস্ময়ে ইউরোপবাসীকে তা বর্ণনা করেছিলেন। নাটকটি শেষ হয় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মিলনমেলা, ফসল কাটার আনন্দ এবং ঐতিহ্যবাহী বিয়ের উৎসবের মধ্য দিয়ে।
প্রায় দেড়শ থেকে দু-শো জন রুশ, কাজাখ ও চীনা অভিনেতার সাবলীল অভিনয় এবং মঞ্চে জ্যান্ত বাজপাখি, উট আর ঘোড়ার উপস্থিতি নাটকটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নব্বই মিনিটের সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশনা না দেখলে চীন ভ্রমণ অপূর্ণই থেকে যেত।
ফিরতি পথে ট্যাক্সিতে বসে বারবার একটা কথাই মনে হচ্ছিল, চীনারা কেন বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্বের আসন দখল করছে? নিজেদের সোনালি অতীত, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে তারা কতটা সযত্নে প্রজন্মের পর প্রজন্মে বহন করে চলেছে! পাশে বসে থাকা সালাম তখন মুচকি হেসে বলে উঠল, “আসল চমক তো এখনও বাকি। কাল সকালে একদম তৈরি থেকো, কাল আমাদের বেইজিং যাত্রা...।”
চলবে…