ক্ষতচিহ্নের গদ্য: পর্ব ২১
Published : 28 Mar 2026, 01:57 AM
কিশোরবেলার সেই দুষ্টুমি আর ডানপিটে স্বভাবটাই হয়তো তাকে যুদ্ধের ময়দানে অকুতোভয় করে তুলেছিল। বরিশালের সদর উপজেলার চর করানজি গ্রামের সেই চঞ্চল কিশোর এস এম মোফাজ্জল হোসেনের গল্পটা শুরু হয় এক অভিমানী জেদ থেকে।
বাড়িতে মাঝেমধ্যেই তার নামে বিচার আসতো। একদিন বাবা ভীষণ রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন। বাবা হয়তো ভাবেননি তার আদরের সন্তানটি সত্যিই ঘর ছাড়বে, কিন্তু আত্মসম্মানে আঘাত লাগা সেই কিশোর কাউকে কিছু না বলে পাড়ি জমালেন ঢাকায়। ঠাঁই নিলেন মগবাজারের ৩৯৪ নম্বর বাড়িতে, মেজো খালা ওয়াজিবুন নেসার আশ্রয়ে।
সময়টা তখন উত্তাল ১৯৬৯। ঢাকা তখন মিছিল-মিটিংয়ের নগরী। তরুণ মোফাজ্জল নিজেকে সঁপে দিলেন সেই আন্দোলনের স্রোতে। মাঝেমধ্যে যখন কারফিউ জারি হতো, তখন গা-ঢাকা দিতেন তারা। আউটার স্টেডিয়ামে আয়োজিত রাজনৈতিক মিটিংগুলোতে তার উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। সত্তর দশকের নির্বাচনেও তিনি মাঠে নামেন সক্রিয়ভাবে, কাজ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে।
এভাবেই সময় গড়িয়ে আসে ১৯৭১ সালের মার্চে। ৭ মার্চ রেইসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ শুনতে মগবাজার থেকে নাজমুল ও ফেরদৌসসহ রওনা হন মোফাজ্জল। সেই দুপুরের রেইসকোর্স ময়দান ছিল লোকে-লোকারণ্য; এমন বিশাল জনসভা এর আগে তিনি কখনও দেখেননি। সবার মনে তখন একটাই ব্যাকুল প্রশ্ন, কী বলবেন বঙ্গবন্ধু?
মঞ্চে এসে বঙ্গবন্ধু যখন ‘ভায়েরা আমার’ বলে ভাষণ শুরু করলেন, চারদিকে তখন পিনপতন নীরবতা। তিনি যখন নির্দেশ দিলেন, “তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে...”, মোফাজ্জলদের স্লোগানে তখন প্রকম্পিত হচ্ছিল আকাশ। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...।”
আজও সেই ভাষণের কথা মনে পড়লে মোফাজ্জলের শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়, রক্ত টলমল করে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর সেই দিকনির্দেশনা থেকেই মূলত তাদের মনের ভেতরে স্বাধীনতার বীজ বপন হয়ে গিয়েছিল।
সেই রক্তাক্ত দিনগুলোর স্মৃতি যখন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এস এম মোফাজ্জল হোসেন বলছিলেন, তখন তার চোখেমুখে একাত্তরের সেই তেজোদীপ্ত ছবি ভেসে উঠছিল। ঢাকায় তিনি সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন এবং একাত্তরে তিনি ছিলেন সেই স্কুলেরই এসএসসি পরীক্ষার্থী।
প্রশিক্ষণের দিনগুলোর কথা উঠতেই তিনি জানান, তখনো বরিশাল মুক্ত ছিল। ওখানকার নেতা ছিলেন নুর ইসলাম মঞ্জু, যিনি সত্তরের নির্বাচনে এমপিএ হয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন সার্জেন্ট ফজলুল হক ও সরদার জালাল আহমেদসহ আরও অনেকে। তাদের উদ্যোগেই মূলত প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
১১ এপ্রিল বরিশাল ভিলেজ পার্কে সুবেদার মেজর মান্নান সাহেবের অধীনে চল্লিশ জনের একটি দলে প্রশিক্ষণ শুরু করেন মোফাজ্জল। পরবর্তীতে এই মেজর মান্নানের কমান্ডেই তিনি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন।
মোফাজ্জল হোসেন যুদ্ধ করেছিলেন ৯ নম্বর সেক্টরে। মুক্তিযুদ্ধের সেই চরম দিনগুলোতে পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া একটি গুলি তার ডান পায়ের হাঁটুতে বিদ্ধ হয়। সেই আঘাতে তার হাঁটুর হাড়ের প্রায় ছয় ইঞ্চি ভেঙে উড়ে যায়। পরবর্তীতে সেখানে কৃত্রিম হাড় (আর্টিফিশিয়াল বোন) প্রতিস্থাপন করতে হয়, যার ফলে আজও তিনি তার ডান পা-টি ভাঁজ করতে পারেন না।
৩০ নভেম্বর ১৯৭১। সেই রক্তক্ষয়ী দিনটির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি ফিরে যান ২৯ নভেম্বরের ভোরে। কীর্তনখোলা নদীর ঘাটে তখন রাজাকারদের কয়েকটি নৌকা এসে ভিড়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন। আকস্মিক আক্রমণে বেশ কয়েকজন রাজাকার নিহত হয়, বাকিরা পালিয়ে যায়। পাকিস্তানি বাহিনী বা রাজাকারেরা পাল্টা আক্রমণ করতে পারে, এমন আশঙ্কায় কমান্ডার মেজর মান্নানের নেতৃত্বে ২০০ মুক্তিযোদ্ধার একটি দল চর আইসায় নদীর পাড়ে অ্যামবুশ করে বসে থাকে।
৩০ নভেম্বর রাত তিনটায় কমান্ডারের নির্দেশে অ্যামবুশ তুলে নেওয়া হয়। সেকশন কমান্ডার আবদুর রব, আলমগীর ও মোফাজ্জলকে বিশ্রামের জন্য ছুটি দেওয়া হয়। তারা নদীর পাড়ের একটি বাড়ির দিকে রওনা হন। কিন্তু তারা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে পেছন দিক দিয়ে চরকাউয়া ঘাট হয়ে পাকিস্তানি সেনারা এলাকায় ঢুকে পড়েছে।
বাড়ির ভেতর ঢুকতেই হঠাৎ পেছন থেকে পাকিস্তানিরা আক্রমণ শুরু করে। চারপাশ ঘিরে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে তারা। একটি বুলেট এসে বিঁধল মোফাজ্জলের ডান পায়ে। তিনি উঠানের এক কোণে ছিটকে পড়লেন। তার সঙ্গী আলমগীর ও রব কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
গুলির আঘাতে মোফাজ্জলের ডান পায়ের হাঁটুর ওপরের হাড় ভেঙে মাংসসহ উল্টে যায়। গলগলিয়ে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল উঠানের মাটি। রক্তক্ষরণে ধীরে ধীরে শরীর দুর্বল হয়ে আসছিল, চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তিনি জ্ঞান হারাননি। পাকিস্তানি সেনারা তার রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখে মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে যায়।
তারা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই সহযোদ্ধারা ছুটে আসেন। রক্তপাত বন্ধ করতে সহযোদ্ধা রব একটি শক্ত দড়ি দিয়ে তার পা বেঁধে দেন। সেই রশির বাঁধার দাগ আজও মোফাজ্জলের পায়ে জীবন্ত হয়ে আছে, যা দেখলে একাত্তরের সেই বিভীষিকা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
গ্রামের হাসন মিস্ত্রির বাড়িতে টিনে করে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয় মোফাজ্জলকে। সেখানে চলে প্রাথমিক চিকিৎসা। ৮ ডিসেম্বর বরিশাল শত্রুমুক্ত হয়। ১০ তারিখ তাকে বরিশাল সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেদিন তাকে সম্মান জানাতে হাসপাতালে নেওয়ার পথে সহযোদ্ধারা দুই পাশে দাঁড়িয়ে ফাঁকা গুলি ছুড়ে অভিবাদন জানান। সেই গৌরবের স্মরণে আজও তার চোখ আনন্দে ভিজে ওঠে; এমন সম্মান তিনি আর কখনও পাননি।
পরবর্তীতে বরিশাল থেকে তাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতাল (পুরাতন পিজি)-তে পাঠানো হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি উদ্যোগে তাকে নেওয়া হয় ডেনমার্কে। সেখানেই জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার পায়ে ছয় ইঞ্চি কৃত্রিম হাড় লাগিয়ে দেওয়া হয়।
আজ এত বছর পরেও সেই শারীরিক কষ্টের ভার বয়ে বেড়াচ্ছেন এই বীর যোদ্ধা। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয় তাকে। ডান পা-টি ভাঁজ করা যায় না, এমনকি পা আগের চেয়ে পৌনে এক ইঞ্চি ছোট হয়ে গেছে। প্রাত্যহিক জীবনের ছোটখাটো কাজেও তাকে অন্যের সাহায্য নিতে হয়। পা ভাঁজ করতে না পারায় সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানেও তিনি যোগ দিতে পারেন না।
তবে এই শারীরিক যন্ত্রণা মোফাজ্জল হোসেনকে মোটেও দমাতে পারেনি। তিনি অকপটে বলেন, “পা গেছে, কিন্তু স্বাধীনতা তো পেয়েছি। এতেই আমি তৃপ্ত। সবাই যখন সম্মিলিতভাবে কাজ করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়, তখন ভালো লাগে। ১৬ ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চে নিজের সব কষ্টের কথা ভুলে যাই।”
পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি গভীর আশা নিয়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “তোমরা দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করো। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের দায়িত্বটুকু শেষ করো। তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে।” একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার শেষ আকাঙ্ক্ষা খুব সামান্য, কিন্তু গভীর- তিনি চান একটি রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ।