Published : 19 May 2026, 01:01 PM
আপনার পকেটে বা ড্রয়ারের এক কোণে পড়ে থাকা ওই ছোট্ট রঙিন বইটি আসলে কী? একগুচ্ছ ছাপানো কাগজ, কিছু হলোগ্রাম আর একটা খুদে সিলিকন মাইক্রোচিপ? আপাতদৃষ্টিতে তা-ই মনে হতে পারে, কিন্তু এই পাসপোর্টের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের রাজনীতি, ক্ষমতা, দাপট আর এক মানবিক বৈষম্যের ইতিহাস।
আজ আমরা যে পাসপোর্টকে বিশ্বভ্রমণের চাবিকাঠি বলে মানি, তার শুরুটা কিন্তু কোনো আধুনিক গবেষণাগারে হয়নি; বরং এর জন্ম হয়েছিল মানুষের মনে জন্মানো ভয়, অবিশ্বাস আর অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকে। পাসপোর্ট একাধারে স্বাধীনতার প্রতীক, আবার একইসঙ্গে এটি পরাধীনতার অলঙ্ঘনীয় শিকল। ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে দেখা যায়, এই এক টুকরো কাগজ কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে দিয়েছে মানুষের পরিচয় আর বিশ্ব মানচিত্রের সীমানা।
পাসপোর্টের ইতিহাসের প্রথম অঙ্কটি রচিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, যখন সীমান্ত বা রাষ্ট্রের আধুনিক ধারণা জন্মই নেয়নি। খ্রিস্টপূর্ব ৪৪৫ অব্দের কথা। পারস্যের রাজা আর্তাশস্ত বা আর্টাক্সারক্সের দরবারে নেহেমিয়া ছিলেন এক বিশ্বস্ত কর্মকর্তা। জেরুজালেমের ধ্বংসপ্রাপ্ত দেয়ালগুলো পুনর্নির্মাণের জন্য তাকে সেখানে যেতে হবে। রাজা নেহেমিয়ার ওপর তুষ্ট হয়ে তাকে একটি চিঠি দিলেন।
সেই চিঠিতে লেখা ছিল এক সহজ কিন্তু অমোঘ রাজকীয় অনুরোধ- নেহেমিয়া যখন পথ চলবেন, তখন অন্যান্য রাজ্যের শাসকরা যেন তাকে বাধা না দেন এবং তাকে সসম্মানে পথ ছেড়ে দেন। ইতিহাসে এটিকেই পাসপোর্টের ‘প্রথম লিখিত দলিল’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
সেসময়ে এই ‘সেফ প্যাসেজ’ বা নিরাপদ চলাচলের নীতি ছিল কেবল এক শাসকের পক্ষ থেকে অন্য শাসকের কাছে এক ‘ভদ্রলোকের চুক্তি’। মোদ্দা কথা ছিল, আমার এই লোকটিকে তোমাদের রাজ্যে নির্বিঘ্নে ঘুরতে দিয়ো, তাকে শত্রু ভেবো না। তখন পাসপোর্ট মানে আজকের মতো ‘আইডেন্টিটি’ ছিল না, ছিল স্রেফ এক টুকরো রাজকীয় ভরসা।
প্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীন চীনের হান রাজবংশেও ছিল চলাচলের অদ্ভুত কড়াকড়ি। যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় দুশো বছর আগে চীন সাম্রাজ্য তার প্রজাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। সেখানে পাসপোর্ট হিসেবে ব্যবহৃত হতো কাঠে বা বাঁশের টুকরো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই প্রাচীন আমলেই পাসপোর্টে মানুষের বর্ণনা দেওয়া হতো নিখুঁতভাবে। সেখানে ব্যক্তির বয়স, উচ্চতা এমনকি গায়ের রঙের বর্ণনাও থাকত, যাতে কেউ পরিচয় লুকিয়ে অন্য রাজ্যে বা শহরে ঢুকতে না পারে।
সীমান্ত পার হওয়ার সময় এই কাঠের টুকরোটি বিভিন্ন চেকপয়েন্টে দেখাতে হতো। অর্থাৎ আজকের বায়োমেট্রিক পাসপোর্টের আদি রূপটি হাজার বছর আগেই চীনের সেই বাঁশের টুকরোয় লুকিয়ে ছিল।
মধ্যযুগীয় ইসলামি দুনিয়াতেও পাসপোর্টের এক ভিন্নধর্মী সংস্করণ দেখা যায়। ইসলামি খেলাফতের সময় নাগরিকদের ‘বারায়া’ নামক এক প্রকার রশিদ বা নথি দেওয়া হতো। তবে এটি সরাসরি ভ্রমণের অনুমতির চেয়েও ছিল কর বা ট্যাক্স পরিশোধের প্রমাণপত্র। যারা রাষ্ট্রকে নিয়মিত কর দিতেন, কেবল তারাই এই বারায়া পেতেন।
আর এই কাগজ ছাড়া এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াত করা ছিল অসম্ভব। কেউ যদি এই রশিদ ছাড়া ভ্রমণে বের হতেন, তাকে আইনভঙ্গকারী হিসেবে গণ্য করা হতো। মজার ব্যাপার হলো, আজকের আধুনিক পাসপোর্টের ধারণার সাথে এই ‘বারায়া’র এক নিবিড় যোগসূত্র আছে। কারণ এটিই ছিল প্রথম কোনো দলিল, যা রাষ্ট্র তার নিজের নাগরিককে দেশের অভ্যন্তরে বা বাইরে চলাচলের বৈধতা দেওয়ার জন্য ইস্যু করত।
পাসপোর্ট শব্দটা আসলে এল কোত্থেকে? এ নিয়ে ভাষাবিদ আর ইতিহাসবিদদের মধ্যে আজও বিতর্কের শেষ নেই। এক দলের মতে, শব্দটি এসেছে ইংরেজি ‘পাস’ (Pass) আর ‘পোর্ট’ (Port) বা সমুদ্রবন্দর থেকে। মধ্যযুগে যখন সমুদ্রপথে বাণিজ্যের প্রসার ঘটল, তখন বন্দরে প্রবেশের জন্য এক বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হতো।
অন্য এক দলের দাবি, শব্দটির শেকড় ফরাসি ভাষায়। ফরাসি রাজা একাদশ লুই যখন পঞ্চদশ শতাব্দীতে তার প্রজাদের জন্য এক বিশেষ সনদ ইস্যু করতেন, তখন তাকে বলা হতো ‘পাস পোর্তে’ (Pass-Porte)। এখানে ‘পোর্তে’ মানে হলো শহরের প্রধান ফটক বা গেট। অর্থাৎ প্রাচীরঘেরা শহরগুলোর গেট দিয়ে ঢোকা বা বের হওয়ার যে অনুমতিপত্র, সেটিই কালক্রমে আজকের ‘পাসপোর্ট’। তবে যেখান থেকেই আসুক না কেন, পাসপোর্টের মূল উদ্দেশ্য ছিল একই- সীমানার বাধা টপকানো।
ইউরোপের ইতিহাসে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম হেনরিকে বলা হয় আধুনিক পাসপোর্টের অন্যতম রূপকার। ১৪১৪ সালে এক সংসদীয় আইনের মাধ্যমে তিনি বিদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য ‘সেফ কন্ডাক্ট’ বা নিরাপদ যাতায়াতের সনদ চালু করেন।
তবে মজার বিষয় হলো, তখন কিন্তু পাসপোর্ট আজকের মতো নিজের দেশের নাগরিকদের দেওয়া হতো না, বরং এটি দেওয়া হতো বিদেশিদের। অর্থাৎ আপনি যদি নিজ দেশের নাগরিক হন, তবে আপনার প্রমাণের প্রয়োজন নেই; কিন্তু আপনি যদি ভিনদেশি হন, তবেই আপনার পাসপোর্ট লাগবে। আজকের যুগের ঠিক উল্টো চিত্র ছিল তখন।
এরপর এলো উনিশ শতক। শিল্প বিপ্লবের জোয়ারে পৃথিবী তখন টালমাটাল। রেললাইন বসছে, স্টিমার চলছে, মানুষ দলে দলে কাজের খোঁজে এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছুটছে। মানুষের এই বিশাল ঢেউ সামলানো তখন অসম্ভব হয়ে পড়ল। কোনো কোনো দেশ তো পাসপোর্ট ছাড়াই সীমান্ত খুলে দিল।
১৮৬১ সালে ফ্রান্স প্রথম ঘোষণা করল যে তাদের দেশে ঢুকতে আর কোনো পাসপোর্টের বালাই থাকবে না। দেখা গেল, বিশ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকায় এলিস আইল্যান্ড দিয়ে লাখ লাখ অভিবাসী ঢুকছে কোনো বিশেষ পরিচয়পত্র ছাড়াই। সামান্য এক শারীরিক পরীক্ষা আর নাম-ধাম বললেই মিলত নতুন দেশে পা রাখার সুযোগ। সেই সময়টা ছিল মুক্ত পৃথিবীর এক সোনালী অধ্যায়, যেখানে মানুষের সীমানা ছিল আকাশের মতো অবারিত।
কিন্তু এই স্বাধীনতা বেশিদিন টিকল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীকে আমূল বদলে দিল। রাষ্ট্রগুলো একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করল। জার্মান গুপ্তচরদের ভয়ে ব্রিটেনসহ ইউরোপের দেশগুলো আবারও সীমানায় কড়াকড়ি শুরু করল। যুদ্ধের ডামাডোলে ১৯২০ সালে লিগ অফ নেশনস এক সম্মেলনে বসে সিদ্ধান্ত নিল- এখন থেকে সারা বিশ্বের জন্য পাসপোর্টের একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকতে হবে।
এই ১৯২০ সালটিই হলো আধুনিক পাসপোর্টের প্রকৃত জন্মবছর। সেই সময় পাসপোর্টের পাতায় ছবি লাগানোর পদ্ধতিও চালু হয়। তবে প্রথম দিকে কিন্তু পাসপোর্ট সাইজ ছবি বলে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম ছিল না। মানুষ তার পছন্দমতো যেকোনো ছবি পাঠিয়ে দিত। এমনকি কোনো কোনো পরিবার তো পুরো পরিবারের গ্রুপ ফটো দিয়েও পাসপোর্ট বানিয়ে ফেলত! সেই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবির দিনগুলোতে মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি যে একদিন তাদের চোখের মণি বা আঙুলের ছাপও পাসপোর্টের অংশ হয়ে যাবে।
পাসপোর্টের ইতিহাস কেবল ভ্রমণের ইতিহাস নয়, এটি বঞ্চনা আর বৈষম্যেরও এক করুণ দলিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেও বিবাহিত নারীদের আলাদা কোনো পাসপোর্ট ছিল না। তাদের নাম লেখা থাকত স্বামীর পাসপোর্টের নিচে ছোট্ট একটা ফুটনোটে। অর্থাৎ স্বামী ছাড়া একা সীমান্ত পেরোনোর অধিকার ছিল না কোনো নারীর।
আবার পাসপোর্ট কারো জন্য হয়ে উঠল আভিজাত্যের বর্ম, আর কারো জন্য এক অভিশপ্ত বোঝা। একজন কানাডীয় বা সুইস নাগরিক তার পাসপোর্ট দিয়ে যত সহজে পৃথিবী ঘুরতে পারেন, একজন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের জন্য তা অকল্পনীয়।
লেখিকা এতোসা আব্রাহামিয়ান যথার্থই বলেছেন, নাগরিকত্ব বা পাসপোর্ট আসলে একটা ‘জন্মগত দুর্ঘটনা’। আপনি কোন ভৌগোলিক সীমানায় জন্মেছেন, তার ওপর ভিত্তি করে আপনার পাসপোর্ট ঠিক করে দেয় আপনি পৃথিবীর কতটুকু দেখতে পারবেন আর কোথায় আপনার সামনে দেয়াল তোলা হবে।
আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এসে পাসপোর্ট যেন এক দামি পণ্যে পরিণত হয়েছে। আমরা এখন ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ বা সোনার পাসপোর্টের যুগে বাস করি। মাল্টা, সাইপ্রাস বা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের অনেক দেশ আছে যারা রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে পাসপোর্ট বিক্রি করে। আপনার যদি কোটি কোটি টাকা থাকে, তবে আপনি বিনিয়োগের বিনিময়ে অনায়াসেই সেসব দেশের নাগরিকত্ব কিনে নিতে পারেন।
অর্থাৎ টাকা থাকলে আপনি ‘গ্লোবাল সিটিজেন’, আর না থাকলে আপনি হয়তো সেই উদ্বাস্তু লাখো লাখো মানুষের একজন হয়ে যাবেন, যাদের কোনো দেশ নেই, কোনো পরিচয় নেই। এই ‘রাষ্ট্রহীন’ বা স্ট্যাটলেস মানুষগুলোর কাছে পৃথিবী মানে এক রুদ্ধদ্বার কারাগার। তাদের কোনো পাসপোর্ট নেই, তাই তাদের কোনো গন্তব্যও নেই।
বর্তমানে আমাদের পাসপোর্টগুলো মাইক্রোচিপ, হলোগ্রাম আর বায়োমেট্রিক তথ্যে ঠাসা এক আধুনিক বিস্ময়। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়া যখন প্রথম পাসপোর্টে ইলেকট্রনিক চিপ যুক্ত করল, তখন থেকেই এটি এক ডিজিটাল ঢালে পরিণত হলো। আমরা এখন স্মার্টফোনের অ্যাপে দেখি কোন দেশের পাসপোর্ট কতটা শক্তিশালী।
কিন্তু প্রযুক্তির এই চাকচিক্যের আড়ালে পাসপোর্টের সেই আদি ও অকৃত্রিম চরিত্রটা কিন্তু বদলায়নি। এটি আজও সেই একরোখা সীমান্তরক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো ভবিষ্যতে পাসপোর্টের এই কাগুজে রূপ বিলীন হয়ে যাবে, তার জায়গায় আসবে কেবল ডিজিটাল ডেটা বা রেটিনা স্ক্যান। কিন্তু যতদিন পৃথিবীতে সীমান্ত থাকবে, ততদিন পাসপোর্টের প্রয়োজনীয়তাও থাকবে।
সূত্র: বিবিসি, আইএমআই ডেইলি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক।