Published : 27 Jun 2026, 12:13 PM
২০১৪ সালের জুলাই মাস। বেলো হরিজন্তের মাঠে জার্মানির কাছে ব্রাজিলের সেই ১-৭ গোলের ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের পর ফুটবলবিশ্ব যখন স্তব্ধ, তখন অনেকেরই মনে হয়েছিল- এখন এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো কী লিখছেন?
লাতিন আমেরিকার ফুটবলের নাড়ির স্পন্দন তার চেয়ে ভালো আর কে বুঝতেন! কিন্তু সেই হাহাকার নিয়ে তার কলম থেকে কোনো লেখা অন্তত ইংরেজি অনুবাদে আর পাওয়া যায়নি। তার ঠিক পরের বছরই, ২০১৫ সালের এপ্রিলে নিজের জন্মশহর মন্টভিডিওতে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান এই কিংবদন্তি উরুগুয়ান লেখক।
১৯৪০ সালে উরুগুয়ের রাজধানী মন্টভিডিওতে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্যালিয়ানোর। তিনি কেবল একজন লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাংবাদিক, ঐতিহাসিক এবং একজন রাজনৈতিক কর্মী। উরুগুয়েতে যখন সামরিক শাসন শুরু হয়, তখন তার লেখা নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। নির্বাসিত জীবনে তিনি আর্জেন্টিনা ও স্পেনে ছিলেন। আশির দশকে গণতন্ত্র ফিরলে তিনি আবার স্বদেশে ফিরে আসেন।
কিন্তু বিশ্বজুড়ে তার নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় ‘ফুটবল ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ বইটির জন্য। এই একটি বই ফুটবল সাহিত্যের জগতে তাকে অমর করে রেখেছে। গ্যালিয়ানো ছিলেন একজন স্বীকৃত বুদ্ধিজীবী, কিন্তু তার লেখায় তাত্ত্বিক জটিলতার চেয়ে ছিল মানুষের প্রতি অকৃত্রিম টান এবং ফুটবল মাঠের ধুলোমাখা আবেগ।
গ্যালিয়ানোর ফুটবলের প্রতি এই ভালোবাসার শুরুটা হয়েছিল ১৯৫০ সালের সেই বিখ্যাত বিশ্বকাপ ফাইনালের মধ্য দিয়ে। তখন তার বয়স মাত্র ৯ বছর। মারাকানা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক ব্রাজিলকে হারিয়ে উরুগুয়ে যখন বিশ্বজয় করল, সেই সময়কার স্মৃতি গ্যালিয়ানো আমৃত্যু বয়ে বেড়িয়েছেন।
তিনি লিখেছিলেন, বাকি সব উরুগুয়ানের মতো তিনিও সেদিন রেডিওতে কান পেতে ছিলেন। ধারাভাষ্যকার যখন ব্রাজিলের প্রথম গোলের খবর দিলেন, গ্যালিয়ানোর মনে হয়েছিল তার হৃৎপিণ্ডটা বুঝি মেঝেতে খসে পড়েছে। এরপর তিনি ঈশ্বরের কাছে অদ্ভুত সব মানত করতে শুরু করলেন- যদি উরুগুয়ে জেতে তবে তিনি অকল্পনীয় সব ত্যাগ স্বীকার করবেন।
উরুগুয়ে জিতেছিল, কিন্তু গ্যালিয়ানোর সেই মানত আর রাখা হয়নি। তবে তিনি বুঝেছিলেন, সেই জয় কোনো অলৌকিক ঘটনায় আসেনি, বরং এসেছিল ওবদুলিও ভারেলা নামক এক রক্ত-মাংসের মানুষের হাত ধরে। ভারেলা ছিলেন সেই উরুগুয়ে দলের প্রাণভ্রমরা, যিনি একা কাঁধে গোটা দলকে টেনেছিলেন। কিন্তু বিজয়ের পর যখন সবাই উন্মত্ত উল্লাসে মগ্ন, ভারেলা তখন ভিড় এড়িয়ে রেইনকোটের কলার তুলে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।
ফুটবল কর্তারা যখন নিজেদের সোনার মেডেলে ভূষিত করছিলেন, খেলোয়াড়রা পেয়েছিলেন নামমাত্র রুপার মেডেল আর কিছু টাকা। সেই টাকা দিয়ে ভারেলা একটি পুরনো ১৯৩১ মডেলের ফোর্ড গাড়ি কিনেছিলেন, যা এক সপ্তাহ পরেই চুরি হয়ে যায়। গ্যালিয়ানো এই সাধারণ মানুষের গল্পগুলোকেই ফুটবলের ‘প্রকৃত মহিমা’ বলে মনে করতেন।
বুদ্ধিজীবী বা শিল্পবোদ্ধারা যখন ফুটবল নিয়ে লেখেন, তখন মাঝে মাঝে চমকপ্রদ কিছু বেরিয়ে আসে, আবার কখনো তা হয়ে ওঠে বড্ড তাত্ত্বিক। গ্যালিয়ানো তার লেখায় এসবের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।
ইংল্যান্ডের শিল্প সমালোচক ডেভিড সিলভেস্টার বা কবি ইয়ান হ্যামিল্টনের মতো গ্যালিয়ানোও ফুটবলারদের শৈল্পিক চোখে দেখতেন। বুকারজয়ী ঔপন্যাসিক এএস বাইয়াট যখন গোল করার পর মাইকেল ব্যালাকের মুখাবয়বকে ‘বায়ুদেবতার মূর্তির’ সঙ্গে তুলনা করেন, কিংবা সংগীত সমালোচক হ্যান্স কেলার যখন ফুটবলের ট্যাকটিকস নিয়ে কঠোর বিশ্লেষণ দেন, সেখানে এক ধরনের যান্ত্রিকতা ফুটে ওঠে।
কিন্তু গ্যালিয়ানোর বর্ণনা ছিল একদম সরাসরি এবং প্রাণবন্ত। তিনি যখন জার্মানির কিংবদন্তি উভে সিলারকে নিয়ে লিখতেন, তখন মনে হতো চোখের সামনে এক জীবন্ত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তিনি লিখতেন, সিলার মাঠে ছিলেন সবচেয়ে খাটো আর স্থূলকায়, যেন হাতে এক মগ বিয়ার নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মানুষ। কিন্তু খেলার মাঠে লাফ দেওয়ার সময় তিনি হয়ে উঠতেন এক চটপটে মাছি, দৌড়ানোর সময় এক অশান্ত খরগোশ, আর হেড করার সময় এক ক্ষ্যাপা ষাঁড়।
গ্যালিয়ানো বিশেষভাবে উদযাপন করতেন কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের কৃতিত্বকে। ১৯১৯ সালে ব্রাজিলের আর্থার ফ্রাইডেনরিখের কথা তিনি পরম শ্রদ্ধায় উল্লেখ করতেন। এই ‘সবুজ চোখের মুলাটো’ বা কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারটিই নাকি ব্রাজিলের নিজস্ব ফুটবল ঘরানার জন্ম দিয়েছিলেন। গ্যালিয়ানোর মতে, ফ্রাইডেনরিখ সাহেবদের গম্ভীর স্টেডিয়ামে নিয়ে এসেছিলেন বস্তির সেই ছোকরাদের খেলার ছন্দ, যারা ন্যাকড়ার বল নিয়ে ড্রিবলিং শিখত।
সেই থেকেই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে জন্ম নিয়েছিল এমন এক শৈলী যা জয়-পরাজয়ের চেয়ে আনন্দকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। তিনি বলতেন, রিও ডি জেনিরোর পাহাড় কিংবা স্থপতি অস্কার নিয়েমেয়ারের নকশা করা দালানের মতো ব্রাজিলের ফুটবলেও কোনো ‘সমকোণ’ বা আড়ষ্টতা নেই; সবটাই বক্ররেখা আর ছন্দের খেলা।
তবে গ্যালিয়ানো কেবল ফুটবলের সৌন্দর্য নিয়েই লিখেননি, তিনি এর অন্ধকার দিকগুলো নিয়েও ছিলেন সমান সোচ্চার। তার বইয়ের নামেই তাই ছিল ‘সূর্য’ আর ‘ছায়া’র কথা। আজ থেকে ২০ বছর আগেই তিনি ফিফার আমলা সেপ ব্ল্যাটারের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি ঘৃণা করতেন সেই সব আমলাদের যারা কোনোদিন মাঠে বল লাথি মারেননি কিন্তু দামি লিমোজিন হাঁকিয়ে ফুটবলকে ব্যবসা বানিয়ে ফেলেছেন।
গ্যালিয়ানোর সমাজতান্ত্রিক মন সবসময় খেলোয়াড়দের অধিকারের কথা বলত। ম্যারাডোনার নেতৃত্বে খেলোয়াড়দের ট্রেড ইউনিয়ন তৈরির চেষ্টাকে তিনি স্বাগত জানিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, পেশাদার ফুটবলাররা আসলে একেকটি বিনোদন কারখানার শ্রমিক, যাদের ঘাম ঝরিয়ে মুনাফা লোটে মালিকপক্ষ।
গ্যালিয়ানোর ফুটবল দর্শনের নির্যাস লুকিয়ে আছে তার বইয়ের শেষ দিকে বলা একটি গল্পে। এক জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “একটি শিশুকে আপনি কীভাবে সুখের সংজ্ঞা বোঝাবেন?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি বোঝাব না, আমি শুধু তার সামনে একটা বল ছুড়ে দেব আর বলব, খেলো।”
গ্যালিয়ানো বিশ্বাস করতেন, আধুনিক পেশাদার ফুটবল মানুষের সেই সহজাত আনন্দকে গলা টিপে মারতে চায়, কিন্তু ফুটবল তার নিজের জোরেই টিকে থাকে। সবকিছুর পরেও ফুটবল যে এখনও মানুষকে রোমাঞ্চিত করে, তার কারণ হলো এর ‘অদম্য অনিশ্চয়তা’।
প্রযুক্তিবিদরা যতই একে নিখুঁত ছকে বাঁধতে চাক, ক্ষমতাধরেরা যতই একে নিয়ন্ত্রণ করতে চাক, ফুটবল শেষ পর্যন্ত থেকে যায় ‘অনিশ্চয়তার শিল্প’। ঠিক যখন কেউ আশা করে না, তখনই ঘটে যায় অসম্ভব কোনো কাণ্ড। গ্যালিয়ানোর ভাষায়, যখন কোনো বামন এক দানবকে শিক্ষা দেয়, কিংবা কোনো এক ধনুক-পাওয়ালা কৃষ্ণাঙ্গ ছেলে গ্রিক মূর্তির মতো সুঠাম অ্যাথলেটকে বোকা বানিয়ে দেয়, তখনই বোঝা যায় ফুটবল কেন অমর।
গ্যালিয়ানো নেই, কিন্তু তাঁর সেই উষ্ণ রক্তমাখা শব্দগুলো প্রতিটি ফুটবল মাঠের ঘাসে আজও মিশে আছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।