অনূদিত রুশ গল্প
Published : 12 Sep 2025, 09:26 AM
ভিতালি ভ্যালেন্তিনোভিচ বিয়ানকি (১৮৯৪–১৯৫৯) খ্যাতনামা রুশ শিশুসাহিত্যিক। তিনি প্রকৃতি ও জীবজগতকে সহজ, জীবন্ত এবং কল্পনামিশ্রিত ভাষায় শিশু-কিশোরদের কাছে তুলে ধরেছেন। সেন্ট পিটার্সবার্গে জন্ম নেওয়া বিয়ানকি শৈশব থেকেই পাখি, প্রাণী ও বনজগতের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতেন, যা পরে তার লেখালেখির মূল অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। তিনি অসংখ্য গল্প, উপকথা ও প্রবন্ধে প্রাণীজগৎকে মানবিক আবেগ ও কৌতূহলের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, যাতে পাঠকেরা বিনোদনের পাশাপাশি প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান ও ভালোবাসা অর্জন করতে পারে। সোভিয়েত যুগে শিশুসাহিত্যকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বিয়ানকির অবদান অনন্য। তার রচনাগুলো আজও শিশু-কিশোরদের কাছে সমানভাবে প্রিয়।
একদিন এক ছোট্ট পিঁপড়ে ছালগাছের মাথায় উঠল। গাছের ডালে শুকনো পাতার ওপর বসে বলল, আহা! একটু বিশ্রাম নিই। তারপর নেমে যাব।
পিঁপড়েদের নিয়মনীতি খুবই কড়া। সূর্য ডুবে গেলে সবাইকে বাসায় ফিরে যেতে হয়। কেউ দেরি করলে তাকে রাতটা বাইরে কাটাতে হয়। পিঁপড়েটা ভাবল, সময় অনেক বাকি আছে। নামতে আর এত সময় লাগবে না। আরেকটু বসি। হাওয়া খাই।
ঠিক তখনই একটা ঝোড়ো হাওয়া শুকনো পাতাটাকে ডাল থেকে ছিঁড়ে নিয়ে গেল। পিঁপড়ে শক্ত করে ধরে রইল। বাতাস তাকে নিয়ে গিয়ে মাঠের ওপর ফেলল। পড়তেই সে পায়ে খুব ব্যথা পেল। পিঁপড়ে দুঃখ করে বলল, এখন আমি বাড়ি যেতে পারব না। যদি পায়ে ব্যথা না পেতাম, তাহলে এক দৌড়ে চলে যেতাম!
ঠিক তখন সে দেখল, একটা কেঁচোপোকা হাঁটছে। পিঁপড়ে বলল, ভাই, আমায় বাড়ি নিয়ে যাবে? আমি পায়ে ব্যথা পেয়েছি। হাঁটতে পারছি না। কেঁচোপোকা বলল, আচ্ছা, চড়ে বসো।
পিঁপড়ে তার পিঠে উঠল। কেঁচোপোকা দুলে দুলে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাঁটতে লাগল। একবার মাথা নিচে, আরেকবার পা ওপরে। পিঁপড়ে বারবার উল্টে যাচ্ছিল। শেষে বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে বলল, থামো, না হলে আমি কামড় দেব! কেঁচোপোকা থেমে গেল। পিঁপড়ে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল।
মাঠে তাকিয়ে সে দেখল একটা মাকড়সা হেঁটে যাচ্ছে। পিঁপড়ে বলল, মাকড়সা ভাই, আমাকে একটু নিয়ে যাবে? আমার পায়ে বড্ড ব্যথা। মাকড়সা বলল, আচ্ছা, ওঠো।
পিঁপড়ে তার পিঠে চড়ল। কিন্তু তার লম্বা পাগুলো এদিক-ওদিক নড়ছিল শুধু। আগাতে পারছিল না তেমন। পিঁপড়ে খুবই বিরক্ত হলো। একটু পর মাকড়সা থেমে বলল, ওই দেখো, একটা গুবরেপোকা আসছে। ও আমার চেয়ে দ্রুত দৌড়ায়।
পিঁপড়ে গুবরেপোকার পিঠে উঠল। গুবরেপোকা ছুটতে লাগল। যেন সে উড়ছে। কিন্তু আলুখেতের কাছে এসে সে থেমে গেল। বলল, এত উঁচু-নিচু পথে আমি যেতে পারব না। তুমি অন্য কাউকে খুঁজে নাও।
হঠাৎ একটি ছোট্ট পোকা এসে বলল, এসো, তোমাকে আমি নিয়ে যাব। পিঁপড়ে অবাক হয়ে বলল, তুমি এত ছোট, আমাকে নিয়ে কীভাবে যাবে? ছোট্ট পোকাটা বলল, তুমি বসো, আমি দেখাচ্ছি।
সে চমৎকার লাফ দিয়ে দিয়ে একের পর এক আলুর সারি পেরিয়ে গেল। কিন্তু বেড়া টপকাতে পারল না। তখন তারা ঘাসফড়িংকে ডাকল। ঘাসফড়িং বলল, চড়ে বসো। সে লাফ দিয়ে উঁচু বেড়া পার হয়ে গেল। তারপর বলল, এবার নেমে যাও, আমি এর বেশি যাব না।
পিঁপড়ে দেখল সামনে একটা নদী। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, এ নদী আমি কীভাবে পার হব? ঘাসফড়িং বলল, অপেক্ষা করো, জলতেলাপোকা আসবে।
শিগগিরই একটা জলতেলাপোকা ভেসে এলো। পিঁপড়ে তার পিঠে উঠল। সে বরফের মতো মসৃণ ভঙ্গিতে পানির ওপর দিয়ে ছুটল। শক্ত পা দিয়ে দ্রুত নদী পাড়ে চলে এলো। নদী পার হতেই বলল, এবার নামো। আমি কেবল পানিতে হাঁটতে পারি।
সূর্য তখন প্রায় ডুবে যাচ্ছিল। পিঁপড়ে ভয় পেল। হায় হায়, আমার তো অনেক দেরি হয়ে গেল!
এমন সময় একটা বড় মে-পোকা এলো। পিঁপড়ে তার মাথায় উঠে বসল। মে-পোকা তার শক্ত পিঠ খুলল। নরম ও স্বচ্ছ ডানা বের করে উড়তে লাগল। ভোঁ ভোঁ শব্দ করে সে আকাশে উঠে গেল। পিঁপড়ে দেখল, সূর্য তখন মাটি স্পর্শ করছে।
মে-পোকা গাছের কাছে এসে নেমে গেল। পিঁপড়ে এবার ভয় পেল। আমি কীভাবে নামব? আমার পায়ে ব্যথা। গলাও ভেঙে যেতে পারে! মে-পোকা বলল, আমি তোমাকে নামাবো না। তোমরা পিঁপড়েরা খুব কামড় দাও। নিজে নামো।
পিঁপড়ে দেখল কাছে শুঁয়োপোকা পাতায় সুতো কাটছে। পিঁপড়ে বলল, দয়া করে আমাকে নামিয়ে দাও। না হলে রাতটা বাইরে কাটাতে হবে। শুঁয়োপোকা বলল, আমি ব্যস্ত, বিরক্ত করো না।
পিঁপড়ে রেগে তাকে কামড় দিল। শুঁয়োপোকা অবাক হয়ে বলল, আহা! সে কুঁচকে লাফ দিয়ে পড়ল। কিন্তু পিঁপড়ে সুতোয় আঁকড়ে ধরে রইল। সুতো টেনে টেনে ধীরে ধীরে মাটিতে নেমে গেল।
এদিকে সব পিঁপড়ে নিজেদের ঘরে ঢুকে গেল। আর সূর্য ডুবে গেল। ছোট্ট পিঁপড়েটাও নিরাপদে নিজের ঘরে ঢুকল। সে বেঁচে গেল!