Published : 17 Jul 2026, 03:02 PM
সাহিত্যিক সালমান রুশদি একবার ফুটবল নিয়ে অসাধারণ নিবন্ধ লিখেছিলেন। শিরোনাম ‘দ্য পিপল’স গেম’। লেখাটি ১৯৯৯ সালের ২৪ মে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’-এ প্রকাশিত হয়। এই নিবন্ধে রুশদি কেবল একজন ফুটবল দর্শক হিসেবে নয়, বরং একজন অনুরাগীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ফুটবলের দর্শন ও মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেছেন।
আধুনিক ক্রীড়া সাংবাদিকতা ও ধ্রুপদী গদ্যশৈলীর মিশেলে রুশদি এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি গোলাকৃতির বলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় কোটি মানুষের আবেগ ও ব্যক্তিগত আনুগত্যের ইতিহাস। রুশদির কাছে ফুটবল কোনো সাধারণ খেলা নয়, এটি ‘পিপল’স গেম’ বা সাধারণ মানুষের আত্মপ্রকাশের ভাষা।
১৯৯৪ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়, তখন মার্কিনিদের বড় দুশ্চিন্তা ছিল ইউরোপীয় ফুটবল হুলিগান অর্থাৎ উগ্র ও সহিংস ফুটবল সমর্থকদের নিয়ে। কিন্তু রুশদি রসিকতা করে বলেছিলেন, আমেরিকার শহরগুলো এমনিতেই এতটাই শক্ত যে হুলিগানদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। জনৈক আমেরিকান কমেডিয়ানের ভাষায় তিনি লিখেছিলেন, “আমি বলি কী, তোমরা তোমাদের হুলিগানদের নিয়ে আসো, আর আমরা আমাদেরগুলো নিয়ে আসবো।”
মূলত রুশদি বোঝাতে চেয়েছিলেন, ফুটবল কোনো আভিজাত্যের ঘেরাটোপে বন্দি খেলা নয়; এটি ব্রাজিলের বস্তির অলিগলিতে খালি টিনের কৌটা দিয়ে খেলা শিশুদের প্রাণের স্পন্দন। তার মতে, আমেরিকায় ফুটবল জনপ্রিয় না হওয়ার একটি বড় কারণ ছিল একে কলেজের খেলা হিসেবে দেখা। কিন্তু রুশদি বিশ্বাস করেন, “ফুটবল হলো কর্মজীবী মানুষের শিল্প।”
রুশদির নিজস্ব জীবন ও ফুটবলের প্রতি এই অনুরাগের শুরুটা হয়েছিল গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। ১৯৪৭ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে এক কাশ্মীরি মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া রুশদি তেরো বছর বয়সে তার বাবার সঙ্গে লন্ডনে পাড়ি জমান। বোম্বেতে বেড়ে ওঠার সময় তিনি ক্রিকেট এবং ফিল্ড হকির সঙ্গে পরিচিত থাকলেও পেশাদার ফুটবলের জাদু তখনো তাকে স্পর্শ করেনি। লন্ডনে গিয়েই তিনি প্রথম বুঝতে পারেন গ্যালারির গর্জন আর মাঠের লড়াইয়ের মাহাত্ম্য। তার এই অভিজ্ঞতার ফসল হিসেবে পরবর্তীতে আমরা পেয়েছি ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’-এর মতো উপন্যাস, যা ১৯৮১ সালে বুকার পুরস্কার জয় করে।
১৯৬১ সালের হাড়কাপানো জানুয়ারিতে রুশদি প্রথম আর্সেনাল ও রিয়াল মাদ্রিদের এক প্রীতি ম্যাচ দেখতে যান। রিয়ালের পুসকাস আর ডি স্টিফানোর জাদুকরী খেলা দেখে কিশোর রুশদি মুগ্ধ হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ইংল্যান্ডে এমন কোনো দল আছে যারা রিয়াল মাদ্রিদের মতো সুন্দর ফুটবল খেলে?” হোটেলের এক ক্লার্কের পরামর্শে তিনি উত্তর লন্ডনের ক্লাব ‘টটেনহ্যাম হটস্পার’ বা স্পার্সের খেলা দেখতে যান। সেই দিনটি তার জীবন বদলে দিয়েছিল। হোয়াইট হার্ট লেনের সেই মাঠ থেকে ফেরার পথে রুশদি আর স্রেফ একজন দর্শক ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন স্পার্সের একজন কট্টর ভক্ত।
একজন প্রকৃত ফুটবল ভক্তের মনস্তত্ত্ব নিয়ে রুশদির বিশ্লেষণ গভীর। স্পার্সের প্রতি তার দশকের পর দশক ধরে টিকে থাকা আনুগত্যকে তিনি ‘মৃত্যু অবধি একনিষ্ঠ প্রেম’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, “ভক্ত হওয়ার অর্থই হলো দশকের পর দশক ধরে মোহভঙ্গ সহ্য করা এবং তবুও আনুগত্যের বিষয়ে কোনো বিকল্প না রাখা।”
রুশদি মনে করিয়ে দেন, প্রিয় দলের ফলাফলই একজন ভক্তের পুরো সপ্তাহের মেজাজ ঠিক করে দেয়। প্রিয় দল জিতলে মন ভালো থাকে, আর হারলে নেমে আসে বিষণ্নতা। তিনি তার প্রিয় খেলোয়াড়দের নামগুলো কবিতার মতো মুখস্থ বলতে পারতেন, যেমন- বিল ব্রাউন, ড্যানি ব্ল্যাঞ্চফ্লাওয়ার কিংবা ডেভ ম্যাকে। খেলোয়াড়দের জীবনাবসান বা দলবদলও তাকে বিচলিত করত। বিশেষ করে স্পার্সের খেলোয়াড় জন হোয়াইট যখন গলফ মাঠে বজ্রপাতে মারা যান, রুশদি তাকে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখেছিলেন।
ফুটবল মাঠের আনুগত্যে যে বেদনা থাকে, তা প্রকাশ পেয়েছে গোলকিপার প্যাট জেনিংসের প্রসঙ্গে। স্পার্সের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই গোলকিপারকে যখন ক্লাব কর্তৃপক্ষ ‘বুড়ো’ মনে করে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্সেনালের কাছে বিক্রি করে দেয়, তখন রুশদি একে অপমান হিসেবে গণ্য করেছিলেন। সেই ক্ষোভ তার লেখায় স্পষ্ট, “এটা কোনো রসিকতা নয়, রসিকতার চেয়েও বেশি কিছু।” এই যে দলবদল আর ক্লাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা, এগুলোই ফুটবলকে সাধারণ মানুষের জীবনের নাটকীয় অংশ করে তোলে।
১৯৯৯ সালের সেই ওর্থিংটন কাপ ফাইনাল ছিল রুশদির জন্য এক বিশেষ মুহূর্ত। টটেনহ্যাম বনাম লিস্টার সিটির সেই ম্যাচটি নিয়ে তিনি নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন। লিস্টার সিটির রবি স্যাভেজের ‘ডাইভিং’ বা ফাউলের ভান করার কারণে যখন স্পার্সের জাস্টিন এডিনবারা লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়েন, তখন দশ জনের স্পার্স প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল।
রুশদি তখন গ্যালারিতে বসে দেখছিলেন কীভাবে ফুটবল মাঠের ঘৃণা আর ভালোবাসা একাকার হয়ে যায়। তিনি লিখেছিলেন ফরাসি তারকা ডেভিড জিনোলার কথা, যাকে ‘লাক্সারি প্লেয়ার’ বলা হতো। কিন্তু ম্যানেজার জর্জ গ্রাহাম, যিনি কিনা আগে চিরশত্রু আর্সেনালের ম্যানেজার ছিলেন এবং ঘুষ কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হয়ে বরখাস্ত হয়েছিলেন, তিনিই বদলে দিয়েছিলেন স্পার্সের খেলার ধরন।
রুশদির এই ফুটবল দর্শনে বারবার উঠে এসেছে তার সাহিত্যের ছোঁয়াও। ১৯৯৫ সালে ঘুষ কেলেঙ্কারিতে জর্জ গ্রাহামের জেল হওয়া কিংবা ক্লাব ছাড়ার ঘটনাগুলো রুশদির কাছে ফুটবলের অন্ধকার দিকের এক বাস্তব আখ্যান ছিল। কিন্তু দিনশেষে ফুটবল মানেই জয়। ম্যাচের একদম শেষ মিনিটে লিস্টার সিটির আমেরিকান গোলকিপার কেসি কেলারের এক ভুলে যখন অ্যালান নেলসন গোল করলেন, তখন গ্যালারির সেই উন্মাদনাকে রুশদি তুলনা করেছেন ‘ইউনিভিশন’ চ্যানেলের সেই বিখ্যাত চিৎকার ‘গোওওওওওওল!’-এর সঙ্গে।
বিজয়ের পর খেলোয়াড়দের আনন্দ দেখে রুশদি মন্তব্য করেন, “বিজয়ের সেই মুহূর্তে খেলোয়াড়দের আর ধনী বা প্যামপার্ড সুপারস্টার মনে হয় না, তারা যেন সেই মুহূর্তেই বুঝতে পারে জীবনের কত বড় একটি অর্জন তারা পেয়েছে।” রুশদি যখন স্টেডিয়াম থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন একজন সাধারণ ভক্ত তাকে চিনে ফেলে চিৎকার করে বলেছিলেন, “ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুক, সালমান!”
ফুটবল আসলে আমাদের জীবনেরই এক প্রতিফলন। এখানে হিরোরা কখনো ভিলেন হয়ে যায়, আবার কখনো আনকোরা কোনো খেলোয়াড় হয়ে ওঠে ত্রাণকর্তা। রুশদির বই ‘ভিক্টরি সিটি’-তে যে সৃজনশীলতা আমরা দেখি, তার মূল সুরটি হয়তো লুকিয়ে আছে ফুটবলের মতো এই সংগ্রামী ও রোমাঞ্চকর মানসিকতার মধ্যেই। তার অন্যান্য বিখ্যাত বই যেমন- ‘শেইম’, ‘দ্য মুরস লাস্ট সাই’ এবং ‘শালিমার দ্য ক্লাউন’ বিশ্বসাহিত্যে তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেও, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সেই তেরো বছরের কিশোরটির মতোই রয়ে গেছেন, যে আজও প্রতি সপ্তাহে স্পার্সের ফলাফলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।