অনূদিত গল্প
Published : 25 Mar 2026, 10:51 AM
সিরীয় লেখক ও গবেষক জাহের ওমারিনের ‘অ্যা বেডটাইম স্টোরি ফর ঈদ’ গল্পটি ১৯৮২ সালের ‘হামা গণহত্যা’র প্রেক্ষাপটে রচিত। এটি লেখকের ‘টেলস অফ দ্য অরন্টেস রিভার’ নামক ছোটগল্প সংকলনের একটি অংশ।
১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদের নির্দেশে হামা শহরে এক সামরিক অভিযান চালানো হয়। প্রায় ২৭ দিন ধরে চলা এই গণহত্যায় ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার সাধারণ মানুষ নিহত হন। এই দমন-পীড়নের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল ‘তাদমোর’ ও ‘প্যালেস্টাইন ব্রাঞ্চ’ কারাগার, যেখানে বন্দিদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন। দীর্ঘকাল বন্দি থাকার পর ১৯৯০-এর দশকে যে কজন হাতেগোনা মানুষ মুক্তি পেয়েছিলেন, এই গল্পটি তাদেরই একজনের জীবনের আখ্যান।
জাহের ওমারিন একাধারে সিরীয় গবেষক, শিল্পী এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। সিরিয়ায় সাংবাদিকতা ও নাট্যকলা বিষয়ে পড়াশোনার পর তিনি বর্তমানে লন্ডনের গোল্ডস্মিথস কলেজ থেকে পিএইচডি করছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুরস্কৃত এই লেখকের লেখনিতে সিরিয়ার মানুষের মুক্তি ও সংগ্রামের চিত্র ফুটে ওঠে।
আজ কবরস্থানে যে সুদর্শন ভদ্রলোক তোমাকে ঈদের শুভেচ্ছা জানালেন, তাকে তোমার চেনার কথা নয়। কিন্তু একটা সময় তিনি পুরো হামা শহরে খুবই আলোচিত ব্যক্তি ছিলেন। বিশেষ করে, তাদের সুখী পরিবার আর ভাইদের মধ্যে মজবুত সম্পর্কের কথা এলাকায় মোটামুটি সবাই জানত, বিছানায় শুয়ে থাকা সন্তানের দিকে তাকিয়ে অসহায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন নারীটি।
কিছুক্ষণ থেমে আবার কথা শুরু করলেন, তারা তিন ভাই আর তাদের মা আল-কাইলানিয়ার ঠিক কাছে আল-তাওয়াফরাতে থাকতেন। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, তুমি কি জানো আমি কোন জায়গার কথা বলছি? আল-তাওয়াফরার কথা বলছি। মানে সেটা আমার মা-বাবার পুরনো মহল্লা ছিল।
মায়ের কথা শেষ হতেই কিশোর অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, আল-তাওয়াফরা তো আমি চিনি। কিন্তু, সেখানে আবার আল-কাইলানিয়া কোন জায়গা? সেটা কোথায়?
হুম, আল-কাইলানিয়া, কিছুক্ষণের জন্য স্মৃতির গভীরে তলিয়ে গেলেন নারীটি। অনেকটা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললেন, ও হ্যাঁ, তোমরা এলাকাটা ঠিক চিনবে না। এখন যেখানে আফামিয়া হোটেল, সেখান থেকে শুরু করে ব্রিজের ডানদিকের রাস্তা পর্যন্ত পুরো এলাকাটাই ছিল আল-কাইলানিয়া। আর তোমরা সবাই যেখানে ফুটবল খেলো, তার পাশের যে ঝোপঝাড়ের অংশটা, সেটাও কিন্তু আল-কাইলানিয়া পাড়ার অংশ ছিল।
মায়ের কথা শুনে শোয়া থেকে প্রায় একলাফে বিছানায় উঠে বসল ছেলেটি। কী! আগে সেখানে বাড়িঘর ছিল? আমি তো সব সময়ই সেখানে ফাঁকা ময়দান আর ঝোপঝাড় দেখেছি। গলায় জোর দিয়ে মা বললেন, অবশ্যই, সেখানে মানুষের বাড়িঘর ছিল, একটা জলচাকা ছিল, আর ছিল আল-কাইলানি পরিবারের মহল। কিন্তু এসব কিছুরই অস্তিত্ব এখন নেই, এখন এলাকাটা শুধু ধুধু মাঠ।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নারীটি নিজের মনেই বিড়বিড় করলেন, সেই ঘটনার পর আর কেউই কখনও সেই পাড়াতে বাড়িঘর বানানোর সাহস দেখায়নি। সেই সুযোগে সরকার এলাকাটা দখল নিল, এখন এটা খাসজমি।
মেঝে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকালেন নারীটি। তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ, এই ধুধু প্রান্তরের সঙ্গে সেই ভদ্রলোকের সম্পর্ক কী, আর কেনই-বা আমি এত কথা বলছি। তোমার নানির প্রিয় বান্ধবী উম-ওমারা (ওমারার মা) ঠিক ওখানেই থাকতেন। এই ভদ্রলোকের ব্যাপারে জানতে হলে, তোমাকে উম-ওমারার গল্পটা শুনতে হবে।
গল্পটা তাহলে বলি, হামা গণহত্যার সময় সরকারি বাহিনীর লোকেরা এসে উম-ওমারার তিন ছেলেকেই তুলে নিয়ে গেল। তার ছেলেরা আমাদের মহল্লার সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ ছিল। এত সুন্দর ছিল তারা! একজন হাই স্কুলে পড়ত, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল আর সবচেয়ে বড় ছেলেটা কেবল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছিল- তার নামই ওমর।
কথার মাঝখানেই মাকে থামিয়ে দিল কিশোরটি। ওমর মানে তো সেই ব্যক্তি, আজ আমরা কবরস্থানে যার কবরের সামনে আল-ফাতিহা পড়লাম? আমরা তো তার কবরের সামনেই আজ প্রার্থনা করেছি?
হঠাৎ বাধা পেয়ে অধৈর্য হয়ে উঠলেন নারীটি। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, হ্যাঁ বাবা, এটাই সে, এটাই ওমর। এখন গল্পটা মন দিয়ে শোন।
বিদ্রোহের সময় একদিন উম-ওমারার তিন ছেলেকেই তুলে নেওয়া হলো। এরপর বেশ কয়েক দিন পার হয়ে গেল। উম-ওমারা প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, মাতম করেন, আবার অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়েন। শোক কিছুটা কাটিয়ে ওঠার পর তিনি প্রায় প্রতিদিন প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছেলেদের গল্প করতেন। প্রতিবেশীদের কাছে জানতে চাইতেন, তার ছেলেরা বেঁচে আছে নাকি তাদের মেরে ফেলা হয়েছে।
তখন এমন একটা সময় চলছিল যে, কে বেঁচে আছে, কে কারাগারে আছে আর কে মারা গেছে- সেই দিনগুলোতে এসব প্রশ্ন কেউ কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসা করার সাহস করত না। এমনকি বাবা-মায়েরাও প্রশ্ন করত না তাদের সন্তানদের কী হয়েছে বা তারা কোথায় আছে।
এভাবেই বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। একদিন উম-ওমারা খবর পেলেন, তার ছোট দুই ছেলেকে কারাগারের ভেতরে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী এক ব্যক্তি কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে উম-ওমারাকে তার ছেলেদের শহীদ হওয়ার খবর দিয়েছিলেন। কিন্তু, উম-ওমারা তখনও তার বড় ছেলে ওমরের ব্যাপারে কোনো কিছুই জানতে পারছিলেন না।
আমার এখনও মনে আছে- তখন আমি নবম শ্রেণিতে পড়তাম, তিনি প্রায়ই তোমার নানির কাছে আসতেন আর বলতেন, আমার বিশ্বাস, আমার মন মিথ্যা বলবে না, হাজ্জা। আমি অনুভব করতে পারি- আমার অন্তরে কিছু একটা সব সময় আমাকে বলে যে ওমর এখনও বেঁচে আছে। ওমর বেঁচে আছে, এই আশা নিয়েই বেঁচে থাকতেন তার মা। আবার মাঝেমধ্যেই অধৈর্য হয়ে ওমরের খোঁজ পেতে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতেন তিনি।
যাই হোক, অবশেষে একদিন পরিচিত কয়েকজন তাকে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিল। সবার ধারণা ছিল, এই লোকটির সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ভালো যোগাযোগ আছে। অনেকেই তার কাছ থেকে নিখোঁজ সন্তানের খবরাখবর নিতেন। লোকটির সন্ধান পেয়ে এক মুহূর্তও দেরি করলেন না উম-ওমারা। তার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন।
উম-ওমারার বয়স তখন পঞ্চাশের কোঠায়। তবে শোক আর পরিশ্রমে তাকে অনেক বেশি বিপর্যস্ত আর বৃদ্ধ দেখাত। সেই চেহারা দেখেও উম-ওমারার প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখাল না লোকটি। শুরুতেই দুই লাখ সিরিয়ান পাউন্ড চেয়ে বসল। এই টাকা পেলে সে বলবে ওমর মৃত নাকি জীবিত। কেবল ওমর জীবিত না মৃত, সেটা জানতেই গুনতে হবে বিশাল অঙ্কের টাকা!
মায়ের হৃদয় বলে কথা! টাকার জোগান দিতে পুরাতন শহরের বাশৌরায় তার যে বাড়ি ছিল, উম-ওমারা সেটা বিক্রি করে দিলেন। সব টাকা হাতে নিয়ে লোকটি উল্টো আরও সময় চেয়ে বসল। এরপর ছেলের খবর দেবে বলে নিয়মিত টাকা চাইতে থাকল আর উম-ওমারাও তার শহরের বাড়ি, ঘরের আসবাবপত্র, গয়না বিক্রি করে টাকার জোগান দিতে থাকলেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও ওমরের খোঁজ মিলল না। অবশেষে একদিন জানা গেল লোকটি প্রতারক। নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু লোকের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে সত্য, কিন্তু এর বেশি তার আর কোনো সক্ষমতা নেই। উম-ওমারাকে পথে বসিয়ে লোকটি একদিন লাপাত্তা হয়ে গেল।
জীবন কেটে চলল জীবনের নিয়মে। বেশ কয়েক বছর পর বন্দিদের ছোট একটা দল কারাগার থেকে ছাড়া পেল। প্রথা অনুযায়ী হামায় কেউ কারাগার থেকে মুক্তি পেলে সবাই তাদের দেখতে যেত আর স্বাগত জানাত। অসংখ্য বাবা-মা কারাগারের গেটে ভিড় করত- যদি নিখোঁজ সন্তানদের সম্পর্কে কিছু জানা যায়! ছেলেগুলো কি তাদের সঙ্গে বন্দি ছিল? কোথায় তাদের রাখা হয়েছিল? তারা কি ঠিক আছে? তারা কি বেঁচে আছে? মারা গেলে মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল?
এই দফায় মুক্ত হওয়া দলের একজন উম-ওমারাকে জানাল, ওমরকে তার সঙ্গেই তাদমোর কারাগারে কিছুদিন বন্দি রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাদমোর গণহত্যার দুই দিন আগে তাকে তাদের কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। রক্ষীরা ওমরকে নগ্ন অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিল...
সদ্যমুক্ত লোকটি কারাগারে থাকার পুরো সময় ওমরের পরনের শার্টটি নিজের কাছে লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই শার্টটি উম-ওমারার হাতে দিয়ে সে বলেছিল, আমার মনে হয় আপনার ছেলেকে অবশ্যই হত্যা করা হয়েছে। কারণ জেলের উঠোনে শত শত তরুণকে গুলি করে হত্যা করার আগে তাদের নগ্ন করে নিয়ে যাওয়া হয়।
ওমরের মৃত্যুর খবর পেয়ে তার মা একটা ঘোরের জগতে চলে গেলেন। মৃত্যুসংবাদটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারলেন না, আবার অবিশ্বাসও করতে পারলেন না। সারাদিন ঝিম মেরে বসে থেকে পরের দিনই উম-ওমারা তিন দিনের শোক পালনের ব্যবস্থা করলেন। ছেলের শার্টটি সবার জন্য প্রদর্শন করা হলো। সেই ছেঁড়া, বিবর্ণ নীল শার্টটি বসার ঘরের সিলিংয়ের মাঝখান থেকে একটা পুরনো কাঠের হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো, একটানা কথা শেষ করে নারীটি একটু দম নিলেন। চোখের কোণে একবিন্দু অশ্রুও দেখা গেল। ছেলের দিক থেকে অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলেন।
কিছুটা থেমে আবার শুরু করলেন, আমি এখনও সে দৃশ্য ভুলিনি। তিন দিনের শোকের পর উম-ওমারা শার্টটি কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে কবর দিলেন এবং পাথরের সমাধি তৈরি করলেন। সেখানে ফুলের গাছ আর সমাধিফলক লাগালেন। তারপর থেকে তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার সেই কবরে যেতেন, সেখানে বসে কুরআন পড়তেন, তাতে ফুল দিতেন এবং সেখানে বেড়ে ওঠা গাছগুলোতে পানি দিতেন।
মায়ের হৃদয়! বৃদ্ধ বয়সে এই ধকল আর সামলে উঠতে পারলেন না উম-ওমারা। বছর না ঘুরতেই মারা গেলেন তিনি। আর ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! সে বছরই আরও কয়েকজন বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হলো- আর এবার তাদের মধ্যে কে ছিল জানো? ছেলের দিকে তাকিয়ে একটা রহস্য তৈরি করলেন নারীটি।
কে?
কে আবার, ওমর!
তুমি কী বলছ!
হ্যাঁ বাবা, ঠিকই বলছি। সত্যিই বলছি, ওমর জীবিতই বেরিয়ে এসেছিল! তাদমোরের গণহত্যায় কোনোভাবে সে বেঁচে যায়। পরে তাকে প্যালেস্টাইন ব্রাঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
আর তারপর কী হলো?
অবশেষে যখন সে মুক্তি পেল, তখন ছিল মধ্যরাত। কারণ কর্তৃপক্ষ কেবল রাতের অন্ধকারেই কাউকে জেল থেকে মুক্তি দিত। নিরাপত্তা এজেন্টরা ওমরকে তাদের শহরের বাড়ির দরজার বাইরে ফেলে রেখে চলে গেল। বেচারা সময়ের আগে অনেকটাই বুড়িয়ে গেছে। দুর্বল, জীর্ণশীর্ণ শরীর। সেই শরীর নিয়েই কয়েক ঘণ্টা সে বাড়ির দরজার সামনে বসে থাকল। রাতের অন্ধকারে দরজার কড়া নেড়ে বৃদ্ধ মাকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার সাহস সে করল না। ফজরের আজানের পর বাড়ির নতুন মালিক মসজিদে যাওয়ার জন্য সদর দরজা খুলে বের হলেন। একজন অপরিচিত লোককে সিঁড়িতে বসে থাকতে দেখে ভদ্রলোক তাকে ভিক্ষুক ভাবলেন। তিনি কোনো কথা না বলে ওমরের হাতে পাঁচটি সিরিয়ান পাউন্ড ধরিয়ে দিলেন।
এদিকে বাড়িতে অপরিচিত মানুষ দেখে ওমরের হৃদয় অজানা আতঙ্কে কেঁপে উঠল। ওমর ছোট্ট শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়ল। ওমরকে কাঁদতে দেখে অপ্রস্তুত বাড়ির মালিক সেখানেই দাঁড়িয়ে গেলেন। বেশ কিছুটা সময় পর ওমর দুর্বল কণ্ঠে লোকটিকে তার মায়ের কথা জিজ্ঞেস করল। উম-ওমারার কথা উঠতেই বাড়ির মালিকের বুঝতে বাকি রইল না এই আগন্তুক কে! ওমরের পরিচয় পেয়ে তিনি প্রতিবেশীদের ডেকে আনলেন। এলাকার সবাই সেই বাড়ির সামনে জড়ো হলো।
ওমরের আত্মীয়দের তখনই ফোন করা হলো। তার মামা-খালাসহ পরিবারের যারা যেখানে ছিলেন, সবাই তাকে নিতে সঙ্গে সঙ্গেই চলে আসলেন। মা মারা গেছেন, প্রাণের চেয়ে প্রিয় ছোট দুই ভাই শহিদ হয়েছে, মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই নেই- ওমরের মনে হলো সে নিজেই একজন মৃত মানুষ। সেসময় বিপর্যস্ত ওমরের পাশে এসে দাঁড়াল এলাকার মানুষ আর তার আত্মীয়রা। তখন হামার মানুষরাই ওমরের পরিবার হয়ে উঠল। প্রতিবেশী আর আত্মীয়রা মিলে তার থাকার ব্যবস্থা করল, একটা কাজও জুটিয়ে দিল।
আমার মা-খালারা আবার উম-ওমারাকে সত্যিই খুব ভালোবাসতেন। সেই বন্ধুত্বের সম্মানে আমার খালা উম ইব্রাহিম তার ছোট মেয়ে সামিহার সঙ্গে ওমরের বিয়েই দিয়ে দিলেন। ওমরের একটা সুন্দর ছোট্ট মেয়ে হলো, আবার তার একটা পরিবার হলো। মেয়ের নাম রাখা হলো রাজাহ, ওমরের মায়ের নামে।
ওহ, তোমাকে আরেকটা কথা বলাই হয়নি, এবার নারীটি বাচ্চাদের মতো ফিক করে হাসলেন। খুব মজা করে বললেন, উম-ওমারার আসল নাম কিন্তু রাজাহ। জন্মের পর ওমর দেখতে খুব সুন্দর পুতুলের মতো ছিল, সেটা দেখে সবাই তাকে মেয়ে ভাবত আর ‘ওমারা’ বলে ডাকত। এজন্যই তার মায়ের নাম উম ওমর না হয়ে হয়েছিল উম-ওমারা।
এবার কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারল না কিশোরটি। মাকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, এই গল্পের সঙ্গে আজ কবরস্থানের লোকটির আবার কী সম্পর্ক? মা কিছুটা রহস্য করে বললেন, উম-ওমারা যেমন প্রতি বৃহস্পতিবার ছেলের শার্টের কবরে গিয়ে দোয়া করতেন, ফুলগাছের পরিচর্যা করতেন, ওমরও কিন্তু তেমনই প্রতি বৃহস্পতিবার মায়ের কবরে গিয়ে দোয়া করে আর মোরগঝুঁটির গাছগুলোর পরিচর্যা করে। মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি...
বিড়বিড় করে বারের হিসাব করতে করতে কিশোরটি প্রায় লাফ দিয়ে উঠে বলল, আজ বৃহস্পতিবার। তার মানে যদি ওমর এখনও বেঁচে থাকে, তবে আজ সে অবশ্যই কবরস্থানে ছিল! গলার স্বর কিছুটা নিচু করে নারীটি বললেন, বেঁচে আছে মানে? আরে, আজ যে তোমাকে চুমু দিয়ে বলেছিল- তোমার মাকে আমার ভালোবাসা দিও, সেই তো ওমর!