Published : 28 Jun 2026, 02:29 PM
ফুটবলকে বলা হয় বিশ্বের ‘সার্বজনীন ভাষা’। তবে মাঠের ৯০ মিনিটের এই লড়াইকে একেক দেশ একেক অদ্ভুত এবং মজার নামে ডাকে। ফিনিশদের ‘ভাল্লুকের মলদ্বার’ থেকে শুরু করে ব্রাজিলের ‘পপকর্ন বিক্রেতা’, বিশ্বজুড়ে ফুটবলের এমন কিছু অদ্ভুত পরিভাষা বা ডিকশনারি নিয়ে সাংবাদিক টম উইলিয়ামস লিখেছেন একটি আস্ত বই, নাম ‘ডু ইউ স্পিক ফুটবল?’।
আসুন জেনে নেওয়া যাক ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং মজার কিছু শব্দ, যা মাঠের খেলাকে আরও রঙিন করে তুলেছে:
১. পোস্টম্যান ফুটবলার (নেদারল্যান্ডস)
যে খেলোয়াড় নিজে এক ইঞ্চিও সামনে না এগিয়ে পুরো ম্যাচ জুড়ে শুধু ছোট ছোট ব্যাকপাস বা সাইডপাস দিয়ে পার করে দেয় তাকেই বলে ‘পোস্টম্যান ফুটবলার’। ডাচ ফুটবল মানেই একটা নিখুঁত ব্যাকরণ। তাদের চোখে, ‘পোস্টম্যান ফুটবলার’ মাঠে অলসভাবে হেঁটে বেড়ায়। পিয়ন বা পোস্টম্যানের মতো কেবল চিঠি (বল) এদিক-ওদিক হাতবদল করে, কিন্তু দলের খেলায় কোনো গতি আনে না।
২. ফেকাল প্লাগ (ফিনল্যান্ড)
রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার (ডিফেন্সিভ মিড), যিনি রক্ষণভাগের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের সব আক্রমণ আটকে দেন তাকেই বলা হয় ‘ফেকাল প্লাগ’। ফিনিশ ভাষায় শব্দটিকে বলে ‘পিহকাতাপ্পি’। শীতকালে ভাল্লুক যখন দীর্ঘ ঘুমে বা হাইবারনেশনে যায়, তখন তার অন্ত্রে এক ধরনের শক্ত মল জমে মলদ্বার আটকে দেয়। ফিনল্যান্ডের মানুষ মনে করে, একজন ভালো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারও ঠিক তেমনি প্রতিপক্ষের জন্য ‘মলদ্বার’-এর মতো আটকে থাকেন, সেখান দিয়ে বল গলানোর কোনো উপায় থাকে না! শুনতে কিছুটা অদ্ভুত ও নোংরা শোনালেও, ফিনিশদের বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এ শব্দের উৎপত্তি।
৩. চিজ ওয়াচার (নেদারল্যান্ডস)
এর অর্থ হলো অলস এবং চুপচাপ বসে থাকা দর্শক, যারা গ্যালারিতে এসে হাততালিও দেয় না, আওয়াজও করে না। ডাচ ক্লাব ‘এজেড আল্কমার’-এর কোচ কো আদ্রিয়ান্স প্রথম ‘চিজ ওয়াচার’ বা পনির দর্শক এ শব্দটি ব্যবহার করেন। আল্কমার শহরটি পনির উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। নিজের ক্লাবের দর্শকদের চুপচাপ বসে থাকা দেখে তিনি কটাক্ষ করে বলেছিলেন, “এরা মাঠে খেলা দেখতে আসে না, পনির পাহারা দিতে আসে!” এটি অনেকটা ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সেই বিখ্যাত ‘চিংড়ি স্যান্ডউইচ ব্রিগেড’-এর মতো।

৪. হোয়্যার দ্য আউল স্লিপস (ব্রাজিল)
গোলের একেবারে উপরের কোণ অর্থাৎ টপ কর্নার বা টপ বিনসকে বলা হয় ‘হোয়্যার দ্য আউল স্লিপস’ বা যেখানে প্যাঁচা ঘুমায়। ব্রাজিলিয়ানরা ফুটবল নিয়ে প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ ও কাব্যিক। গোলের একেবারে কোনায় যখন বল জড়ায়, যেখানে সাধারণ গোলকিপারদের হাত পৌঁছায় না, ব্রাজিলিয়ানরা মনে করে ওটা এতটাই শান্ত ও দুর্গম জায়গা যে ওখানে প্যাঁচারা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে! স্প্যানিশরা আবার একে বলে ‘মাকড়সার বাসা’, আর চেক প্রজাতন্ত্রে বলা হয় ‘ফাঁসির মঞ্চ’।
৫. পপকর্ন ম্যান (ব্রাজিল)
যে খেলোয়াড় বড় ম্যাচে বা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পুরোপুরি ফ্লপ মারেন, অদৃশ্য হয়ে যান তাকেই বলে ‘পপকর্ন ম্যান’। কোনো বড় ম্যাচে যখন দলের সবচেয়ে বড় তারকাই গা বাঁচিয়ে খেলেন, তখন ব্রাজিলিয়ানরা তাকে গ্যালারির পপকর্ন বিক্রেতার সঙ্গে তুলনা করে। যেন তার কাজ মাঠে খেলা নয়, বরং পপকর্ন বিক্রেতার মতো অ্যাপ্রন পরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে মানুষের সেবা করা দেখছেন!
৬. লিডস সিজন (দক্ষিণ কোরিয়া)
মানুষের জীবনের সোনালি সময় বা ক্যারিয়ারের পিক টাইম, যার পর থেকেই মূলত ডাউনফল বা পতন শুরু হয় তাকে বলা হয় ‘লিডস সিজন’। ইংলিশ ক্লাব লিডস ইউনাইটেডের পতনের গল্প থেকে এ শব্দের উৎপত্তি ভাবলে ভুল করবেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় এই শব্দটির জন্ম ইংলিশ ফরোয়ার্ড অ্যালান স্মিথকে দেখে। লিডসের হয়ে দুর্দান্ত খেলা স্মিথকে যখন ২০০৪ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিনে নেয়, তারপর থেকে তার ক্যারিয়ার আর কখনোই আগের ফর্মে ফেরেনি। কোরিয়ানরা তাই কারও জীবনের সেরা অতীত সময়কে বোঝাতে ‘লিডস সিজন’ ব্যবহার করে।

৭. ডান্ডি ইউনাইটেড (নাইজেরিয়া)
এর অর্থ হলো বোকা বা ইডিয়ট। নাইজেরিয়ার ইওরুবা ভাষায় কাউকে বোকা বলে গালি দিতে ‘ডান্ডি ইউনাইটেড’ বলা হয়। স্কটল্যান্ডের এই ক্লাবটি ১৯৭২ সালে নাইজেরিয়া সফরে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের প্রস্তুতি ছিল খুবই যাচ্ছেতাই। প্রচণ্ড গরমে তাদের খেলোয়াড়রা অসুস্থ হয়ে পড়ে, চোট পায় এবং পিচ নিয়ে তারা সারাক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করতে থাকে। তাদের এই অপেশাদার এবং বোকাটে আচরণের পর থেকেই নাইজেরিয়ানদের মুখে মুখে ক্লাবটির নাম গালি হিসেবে পাকাপোক্ত হয়ে যায়।
৮. টু স্টেপ অন অ্যা স্নেক (কেনিয়া)
শট মারতে গিয়ে বল মিস করা বা ফাঁকা বাতাসে লাথি মারাকে ‘এয়ার শট’ বলা হলেও কেনিয়ায় একে বলে ‘টু স্টেপ অন অ্যা স্নেক’, অর্থাৎ সাপের ওপর পা দেওয়া। সোয়াহিলি ভাষায় একে বলা হয় ‘কুকানিয়াগা নিওকা’।
কেনিয়ায় প্রায় ১২৬ প্রজাতির সাপ আছে এবং সেখানে ঝোপঝাড়ে হাঁটতে গিয়ে সাপের ওপর পা দেওয়া এক নিত্যদিনের আতঙ্ক। মাঠে বল মিস করে লাথি মারলে যে ভড়কে যাওয়ার অনুভূতি হয়, তা যেন সাপের ওপর পা দেওয়ার মতোই আঁতকে ওঠার মতো! কেনিয়ার ফুটবলে আরেকটি সাপের নাম জড়িয়ে আছে, ‘পাফ অ্যাডার শট’। অর্থাৎ মাটি ঘেঁষে যাওয়া তীব্র গতির শট, যা বিষাক্ত পাফ অ্যাডার সাপের মতো ছুটে যায়।
সূত্র: বিবিসি