সাক্ষাৎকার
Published : 21 Feb 2026, 12:25 AM
বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াইয়ে যারা সম্মুখসারিতে থেকে ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন, প্রতিভা মুৎসুদ্দি তাদের অন্যতম। ১৯৩৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানের মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামে তার জন্ম। শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠা প্রতিভা মুৎসুদ্দির শৈশব কেটেছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং দেশভাগের উত্তাল সময়ে।
বাবা আইনজীবী কিরণ বিকাশ মুৎসুদ্দি এবং মা সত্যাশ্রয়ী গৃহিণী শৈলবালা মুৎসুদ্দির আদর্শে বড় হওয়া এই নারী কেবল একজন ভাষা সৈনিকই নন, তিনি নারী শিক্ষার এক কিংবদন্তি। দীর্ঘ তিন দশক ধরে ভারতেশ্বরী হোমসের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই মহীয়সী বর্তমানে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের পরিচালক।
প্রতিভা মুৎসুদ্দি কেবল একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। ৯০ বছর পার করা এই মহীয়সী আজও কর্মচঞ্চল। শ্রবণশক্তি কিছুটা হ্রাস পেলেও তার স্মৃতি প্রখর এবং চেতনার বাতিঘর অম্লান। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে নারী শিক্ষার প্রসার- প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন সাফল্যের স্বাক্ষর। একুশে পদক, অনন্যা শীর্ষ দশ পদকসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত এই মানুষটি আজও বিশ্বাস করেন, সত্যের পথ কঠিন হলেও জয় অনিবার্য। গুণী এই নারীর জীবন ও সংগ্রামের কথা উঠে এসেছে এই আলাপচারিতায়।
প্রীতীশ কুমার বল: আপনার জীবনের শুরুর দিনগুলোয় ফিরে যাই। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার লড়াইয়ে যুক্ত হওয়ার পেছনে প্রাথমিক অনুপ্রেরণা কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
প্রতিভা মুৎসুদ্দি: সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও শরীর শিউরে ওঠে। সময়টা ছিল ১৯৪৮ সালের মার্চ মাস। পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা সফরে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তনে দম্ভভরে ঘোষণা করলেন, “উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” সেই ঘোষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা তাৎক্ষণিক “না, না” বলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
আমি তখন চট্টগ্রামের মহামুনি অ্যাংলো-পালি ইনস্টিটিউশনে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। আমাদের স্কুলে তখন সহ-শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল। জিন্নাহর সেই অন্যায্য ঘোষণার খবর যখন আমাদের কানে পৌঁছাল, আমরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। কিশোরী মনে তীব্র ক্ষোভ দানা বেঁধেছিল। তখনই জানতে পারি, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সংগঠিত হচ্ছে। ঠিক সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রনেতা দেবপ্রিয় বড়ুয়া আমাদের মহামুনি স্কুলে এসে আমাদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। মূলত সেই অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীনই আমি মানসিকভাবে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ি।
প্রীতীশ কুমার বল: ১৯৪৮ সালে তো কেবল সূত্রপাত। আপনি সক্রিয়ভাবে রাজপথের আন্দোলনে কবে থেকে পুরোদমে শামিল হলেন?
প্রতিভা মুৎসুদ্দি: ১৯৫১ সালে যখন আমি চট্টগ্রাম কলেজে আই.এ ক্লাসে ভর্তি হলাম, তখন আমার রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা আরও বেড়ে যায়। সেই সময় থেকেই আমি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। একইসঙ্গে ভাষা আন্দোলনেও আমার অংশগ্রহণ আরও জোরালো হয়। আমি অনুভব করতে শুরু করি যে, পাকিস্তান সরকার ঔপনিবেশিক মানসিকতা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে সব দিক থেকে বঞ্চিত করার একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক- সব ক্ষেত্রেই এই বঞ্চনা ছিল দৃশ্যমান। ফলে কলেজ জীবন থেকেই আমি আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচিতে নিজেকে উৎসর্গ করি। বিশেষ করে ছাত্রীদের সংগঠিত করার কাজটিতে আমি বেশি মনোযোগ দিতাম।

প্রীতীশ কুমার বল: ১৯৫২ সালের সেই অগ্নিঝরা ২১ ফেব্রুয়ারিতে আপনার বয়স কত ছিল? সেই উত্তাল সময়ের স্মৃতি কি আজও অমলিন?
প্রতিভা মুৎসুদ্দি: ১৯৫২ সালে আমার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর ২ মাস। বয়সে ছোট হলেও দায়িত্ববোধের জায়গাটা ছিল অনেক বড়। আমরা তখন চট্টগ্রামে থেকেও ঢাকার খবরাখবর জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতাম। আমরা জানতাম রাজনৈতিক নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন, কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না। ২১ ফেব্রুয়ারি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হলো, সেই খবর দ্রুতবেগে চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা জানতে পারি আবুল বরকত, আবদুস সালাম, রফিক উদ্দিন আহমদ এবং শফিউর রহমান শহীদ হয়েছেন। সেই রক্তঝরা সংবাদের পর আর ঘরে বসে থাকা সম্ভব ছিল না।
প্রীতীশ কুমার বল: চট্টগ্রামের সেই উত্তাল দিনগুলোতে আপনার নারী সহযোদ্ধারা কারা ছিলেন? আপনারা কীভাবে জনমত গঠন করেছিলেন?
প্রতিভা মুৎসুদ্দি: ১৯৫২ সালে আমি চট্টগ্রাম কলেজে আই.এ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। আমার সঙ্গে সুলেখা সাহা, নমিতা, লায়লা, সুপ্রভা, সুনীতি ও ফরিদাসহ আরও ১০-১২ জন সাহসী মেয়ে সরাসরি রাজপথে নেমেছিল। ঢাকায় ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের খবর শুনে আমরা মর্মাহত হয়েছিলাম। নিজেরা একটি ট্রাক ভাড়া করে সারা চট্টগ্রাম শহর প্রদক্ষিণ করি। শহরের প্রতিটি বালিকা বিদ্যালয়ে গিয়ে স্লোগান দিয়ে ছাত্রীদের বের করে আনতাম। তাদের মিছিলের সঙ্গে যুক্ত করে প্রতিবাদ সমাবেশ করতাম। পুরো চট্টগ্রাম শহর যেন তখন আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠেছিল। সাধারণ মানুষও আমাদের এই মিছিলে সংহতি প্রকাশ করত।
প্রীতীশ কুমার বল: ঢাকার বাইরে ভাষা আন্দোলনের ঢেউ কেমন ছিল? বিশেষ করে চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপট কি একটু আলাদা?
প্রতিভা মুৎসুদ্দি: চট্টগ্রামের আন্দোলন ছিল সংহত ও আবেগি। ২১ ফেব্রুয়ারির সেই মর্মান্তিক ঘটনার কথা শুনে কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী লিখেছিলেন তার কালজয়ী কবিতা- “কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।” ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানের প্রতিবাদ সভায় তার বন্ধু হারুনুর রশীদ যখন এই কবিতাটি পাঠ করলেন, তখন হাজার হাজার মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েছিল এবং ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। আমরা মেয়েরাও সেই সভায় সামনের সারিতে উপস্থিত ছিলাম। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতারাও তখন দলমত নির্বিশেষে এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছিলেন। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামই ছিল ভাষা আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী দুর্গ।
প্রীতীশ কুমার বল: অনেক সময় ইতিহাসের পাতায় সবার নাম ওঠে না। আপনার চেনা এমন কোনো সহযোদ্ধা আছেন যারা আজও স্বীকৃতি পাননি?
প্রতিভা মুৎসুদ্দি: এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, অনেক প্রকৃত ভাষা সংগ্রামী আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। আমার চোখের সামনে যারা লাঠিচার্জ সহ্য করেছেন, মিছিল করেছেন, তাদের মধ্যে দেবপ্রিয় বড়ুয়া, সুলেখা সাহা, নমিতা, লায়লা, সুপ্রভা, সুনীতি ও ফরিদার কথা বারবার মনে পড়ে। তারা নিঃস্বার্থভাবে বাংলার জন্য লড়েছেন, কিন্তু তাদের নাম ইতিহাসের মূলধারায় সেভাবে আসেনি। প্রচারবিমুখ এই মানুষগুলো কেবল দেশের টানেই আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন।
প্রীতীশ কুমার বল: ১৯৫২-এর পর ১৯৫৫ সালে আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পুনরায় জেল খেটেছিলেন। সেই ঘটনাটি বিস্তারিত বলবেন কি?
প্রতিভা মুৎসুদ্দি: ১৯৫৪ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হই। তখন আমি থাকতাম ওমেন্স স্টুডেন্টস রেসিডেন্সে (বর্তমান রোকেয়া হলের একটি অংশ)। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান সরকার ৯২-এ ধারা জারি করে ২১ ফেব্রুয়ারির মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ করে দেয়। আমরা যারা সাবসিডিয়ারি পরীক্ষার্থী ছিলাম, তাদের ওপর কড়া নির্দেশ ছিল মিছিলে না যাওয়ার। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে যখন খবর এল যে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তার চলছে, তখন আমরা ঘরে বসে থাকতে পারলাম না।
আমরা হলের সব ছাত্রী একযোগে বের হয়ে এলাম। রাস্তার দুই পাশে সশস্ত্র সেনাবাহিনী রাইফেল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা তাদের ব্যুহ ভেদ করে আমতলার সভায় পৌঁছলাম। কিছুক্ষণ পরই পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস শুরু করে। সেদিন শত শত ছাত্রছাত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আমি এবং আরও সাতজন ছাত্রী সেই মিছিলে আটক হই। মিটফোর্ড হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকেও ২২ জন ছাত্রীকে ধরা হয়েছিল। প্রায় দুই সপ্তাহ আমাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই তীব্র আন্দোলনের চাপেই ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

প্রীতীশ কুমার বল: এরপর তো আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতৃত্বেও এসেছিলেন?
প্রতিভা মুৎসুদ্দি: হ্যাঁ, আন্দোলনের সেই সক্রিয়তার কারণেই আমি সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিলাম। ১৯৫৫-৫৬ শিক্ষাবর্ষে আমি ডাকসুতে মহিলা মিলনায়তন সম্পাদিকা নির্বাচিত হই। তারপর ১৯৫৬-৫৭ শিক্ষাবর্ষে রোকেয়া হলের (তৎকালীন উইমেন্স হল) প্রথম সহ-সভানেত্রী (ভিপি) নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করি। ছাত্ররাজনীতির সেই সময়টা ছিল মূলত দেশপ্রেম আর আদর্শের লড়াই।
প্রীতীশ কুমার বল: কর্মজীবনে আপনি ভারতেশ্বরী হোমসের সঙ্গে দীর্ঘ সময় যুক্ত ছিলেন। একজন ভাষাসৈনিক থেকে পুরোদস্তুর শিক্ষাবিদ হয়ে ওঠার এই যাত্রাটি কেমন ছিল?
প্রতিভা মুৎসুদ্দি: আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষার আলো ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়। ১৯৬০ সালে কক্সবাজার বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি। পরে জয়দেবপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েও ছিলাম। ১৯৬৩ সালে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার আমন্ত্রণে আমি ভারতেশ্বরী হোমসে অর্থনীতি বিভাগে যোগ দেই। তার অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী দর্শন আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
১৯৬৫ সালে আমি অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেই এবং ১৯৯৮ সালে অবসর পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম। আমার লক্ষ্য ছিল শুধু পাঠ্যবই পড়ানো নয়, মেয়েদের স্বাবলম্বী এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আজ যখন দেখি আমার ছাত্রীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সফলতার সঙ্গে কাজ করছে, তখন নিজেকে সার্থক মনে হয়।