ভ্রমণগদ্য
Published : 31 Jan 2026, 12:54 PM
অবশেষে চীন ভ্রমণের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হলো। পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম মহাবিস্ময় ‘দ্য গ্রেট ওয়াল অব চায়না’ বা চীনের মহাপ্রাচীর দর্শন! ভাবতেই হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছিল, রক্তে বইছিল অদ্ভূত শিহরণ। মহাপ্রাচীরের সেই রোমাঞ্চকর হাতছানি অবশ্য শুরু হয়েছিল গত রাতেই, যখন ল্যাভেন্ডার আমাদের হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে গেল।
ল্যাভেন্ডার- চনমনে, স্মার্ট এবং প্রচণ্ড অতিথিবৎসল চীনা তরুণী। গত পর্বে তার কথা কিছুটা এসেছিল। মাত্র এক বছর হলো সে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে এখন বেইজিংয়ের অন্যতম অভিজাত ভিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে ফ্রন্ট ডেস্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিয়েছে। এই হোটেলেই আমরা উঠেছি।
হোটেল লবিতে পরিচয়ের সূত্র ধরে সে আমাদের নিয়ে গিয়েছিল বেইজিংয়ের অন্যতম ফ্যাশন এবং কালচারাল হাব ‘তাইকু লি সানলিতুন’-এ। ঝলমলে বেইজিংয়ের এক ব্যস্ততম নাইট হটস্পট এটি। চারদিকে আকাশচুম্বী ভবন আর আধুনিক স্থাপত্যের নকশায় রঙিন আলোর মেলা। একপাশে প্রশস্ত অ্যাভিনিউ চত্বর, যেখানে চীনা তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। মনে পড়ল কোনো এক বইয়ে পড়েছিলাম, মেট্রোপলিটন মানেই এমন এক প্রাণবন্ত শহর যেখানে রাত কখনো ঘুমায় না।
বেইজিংয়ের রাজপথ দেখে মনে হলো এখানে রাতও দিনের মতো নিরাপদ ও উজ্জ্বল। যেখানে একজন নাগরিক, বিশেষ করে নারীরা রাতভর নির্ভয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে পারেন। চীনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে বারবার আমাদের তিলোত্তমা শহর ঢাকার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল, আর অবধারিতভাবেই মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। তখনই ল্যাভেন্ডার তার স্বভাবসুলভ হাসিতে আমাদের বিষণ্ণতা কাটিয়ে বলল, “চলো, কফি খাই।”
আমরা ‘স্টারবাকস’-এর একটি দৃষ্টিনন্দন আউটলেটে ঢুকলাম। কিন্তু অবাক হলাম যখন দেখলাম সে আমাদের কাউন্টারের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দিচ্ছে না। আমরা জোর করে পকেট থেকে টাকা বের করার চেষ্টা করতেই সে মিষ্টি হেসে ঘাড় ঘুরিয়ে শাসনের সুরে বলল, “নো, আই!” বাঙালি ঘরের মেয়েরা যেমন স্নেহের বশে শাসন করে, ল্যাভেন্ডারও ঠিক তেমনি করে আমাদের হাত ইশারায় থামিয়ে দিল। শেষমেশ টোকেন বুঝে নিয়ে আমাদের দিকে ফিরে বলল, “আজ আমার আতিথেয়তা গ্রহণ করো, কাল তোমাদের কফি খাব।” আমরা হারের মধ্যে এক ধরণের মধুর আনন্দ খুঁজে পেলাম।
পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর, রোববার। চীনের স্নিগ্ধ সকালে আমাদের লাক্সারি বাসটি ‘জিংচেং এক্সপ্রেসওয়ে’ ধরে উত্তরের দিকে ছুটতে শুরু করল। বেইজিং সিটি সেন্টার থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মহাপ্রাচীরের বিখ্যাত ‘বাদালিং পয়েন্ট’। তিয়েনআনমেন স্কয়ারকে বেইজিংয়ের কেন্দ্রবিন্দু ধরা হয়, যেখান থেকে দূরত্বের হিসেব কষা হয়। জিংচেং এক্সপ্রেসওয়েটি চীনের আধুনিক সড়ক নির্মাণের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
আমাদের বাসে ছিলেন সহকর্মী সোমা আপু, যিনি বাসের অডিও সিস্টেমের সঙ্গে নিজের মোবাইল কানেক্ট করে একের পর এক জনপ্রিয় সব বাংলা গান শুনিয়ে পুরো যাত্রাটিকে আনন্দময় করে তুলেছিলেন। বাইরে চীনের পাহাড়ী উপত্যকার সৌন্দর্য আর বাসের ভেতরে গানের সুর, আমরা কখন যে মহাপ্রাচীরের পাদদেশে পৌঁছে গেলাম, টেরই পেলাম না। বেইজিংয়ের মতো জনবহুল শহরেও ট্রাফিক জ্যাম আমাদের খুব একটা ভোগাতে পারেনি। অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের কারণে গাড়ির গতি কখনো কখনো কিছুটা কমলেও চাকা একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে না।
বাদালিং পয়েন্টে পৌঁছানোর পর আমাদের সামনে উন্মোচিত হলো এক বিষ্ময়কর দৃশ্য। ২১ হাজার ১৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাপ্রাচীরের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সংরক্ষিত অংশ হলো এই বাদালিং। এখানকার প্রাচীরগুলো গড়ে ৩ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত এবং ৭ দশমিক ৮ মিটার উঁচু। এটি কেবল দেয়াল নয়, দুর্ভেদ্য সামরিক দুর্গ।
ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, মহাপ্রাচীরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে, যখন চীনের বিভিন্ন ছোট ছোট রাজ্যগুলো নিজেদের রক্ষার জন্য আলাদা আলাদা দেয়াল তৈরি করতে শুরু করে। তবে চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং এই বিচ্ছিন্ন দেয়ালগুলোকে একত্রিত করে একটি সুদীর্ঘ প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করার পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে হান এবং বিশেষ করে মিং রাজবংশের (১৩৬৮-১৬৪৪ খ্রিস্টাব্দ) সময় এই প্রাচীরের ব্যাপক সংস্কার এবং সম্প্রসারণ ঘটে। আজকের আমরা যে বাদালিং অংশটি দেখি, তা মূলত মিং রাজবংশের শ্রেষ্ঠ কীর্তি।
মহাপ্রাচীরে ওঠার দুটি পথ রয়েছে। একটি ক্যাবল কারে করে সরাসরি চূড়ায় যাওয়া, আর অন্যটি পায়ে হেঁটে ‘পাস সিটি’ দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা। আমাদের দলের একদল ক্যাবল কারে গেল, আর আমরা এমি, ওয়েন জি, চাও জিয়ানজি এবং চ্যাং হুই নামের চার চীনা তরুণী গাইড ও সহকর্মীর নেতৃত্বে পায়ে হাঁটা পথ বেছে নিলাম। সেপ্টেম্বর মাসের শরৎকালীন আবহাওয়া আর ছুটির দিন হওয়ার কারণে সেখানে পর্যটকদের ঢল নেমেছিল। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে আমাদের মনে হচ্ছিল আমরা যেন কোনো এক মহা-তীর্থযাত্রার সহযাত্রী।

প্রাচীরে পা রেখে একটা বড় ভুল ধারণা ভেঙে গেল। আমরা এতদিন ভাবতাম মহাপ্রাচীর মানেই শুধু একটা ইটের দেয়াল। কিন্তু কাছ থেকে দেখে বুঝলাম এটি আদতে একটি প্রশস্ত সামরিক মহাসড়ক, যার দুই পাশে দেয়াল। উত্তরের দিকে আছে কাটা কাটা পাথরের ‘ব্যাটেলমেন্ট’ বা সুদৃঢ় প্রাকার, যার আড়াল থেকে প্রহরীরা তির বা কামানের সাহায্যে শত্রুর উপর নজর রাখতে পারতেন।
আর ভেতরের দিকে দেয়ালগুলো তুলনামূলক নিচু, যাতে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সহজ হয়। এই পথ দিয়ে তৎকালীন সময়ে ঘোড়া এবং সামরিক রসদবাহী গাড়ি সহজেই চলাচল করতে পারত। পাথরের পর পাথর গেঁথে চীনারা যে কী এক অসাধ্য সাধন করেছিল, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। লোকগাথা আছে যে, এই প্রাচীর নির্মাণে ব্যবহৃত গাঁথুনিকে শক্ত করতে চালের গুঁড়ো বা আঠালো ভাতের মাড় ব্যবহার করা হয়েছিল, যা শত শত বছর ধরে একে অটুট রেখেছে।

পরপর তিনটি ওয়াচ টাওয়ার বা চূড়া টপকে আমরা যখন চতুর্থ চূড়ায় পৌঁছলাম, তখন সূর্যের তেজ চরমে। শরীর ঘামছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। তবুও চূড়ায় ওঠার আনন্দ সব কষ্ট ভুলিয়ে দিল। সেখান থেকে চারদিকে যতদূর চোখ যায়, কেবল পাহাড়ের ঢেউ আর তার ওপর দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া মহাপ্রাচীর। নীল আকাশে কয়েকটা বিমান খেলনার মতো উড়ছিল, আর নিচে আমরা এক অমর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।
এই মহাপ্রাচীর কেবল পাথর আর ইটের সমষ্টি নয়, এর প্রতিটি কোণায় মিশে আছে কয়েক লাখ শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনি আর রক্তের ইতিহাস। চীনের এই অদম্য স্পৃহাই আজ তাদের বিশ্বশক্তির শিখরে পৌঁছে দেওয়ার মূল চালিকাশক্তি বলে আমার মনে হলো।
দুপুরের দিকে আমরা বাদালিং থেকে নেমে এলাম। নিচে পর্যটন কেন্দ্র থেকে আমরা বেশ কিছু সুভ্যিনির আর ঐতিহ্যবাহী চীনা সামগ্রী কিনলাম। কেনাকাটা শেষে আমাদের গাইড এমিরা আমাদের নিয়ে গেল বেইজিংয়ের এক নামকরা ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁয়। সেখানে আমরা যখন মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই নাটকীয় এক ঘটনা ঘটল। হঠাৎ বাদ্যযন্ত্রের সুর আর বেলুন ফোটার শব্দে সবাই চমকে উঠলাম।
দেখলাম একজন কাজাক সুন্দরী তার ঐতিহ্যবাহী দীর্ঘ লেহেঙ্গা আর রঙিন টুপি পরে নাচতে নাচতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। তার পেছনে এমিরা বড় একটি বার্থডে কেক হাতে সহকর্মী আরিফুল ইসলামের নাম ধরে গান গাইছিল। আরিফের জন্মদিন যে আজ! তা আমাদের কারোই খেয়াল ছিল না। এমিদের এই চমৎকার সারপ্রাইজ আমাদের সবাইকে আনন্দে ভাসিয়ে দিল। কাজাক তরুণীর সেই মনমাতানো নৃত্য আর আমাদের করতালি, সব মিলিয়ে দুপুরের সেই খাবারটি হয়ে উঠল স্মরণীয় উৎসব।
মধ্যাহ্নভোজ শেষ করে আমাদের বাস ছুটে চলল বেইজিংয়ের প্রাণকেন্দ্র তিয়েনআনমেন স্কয়ারের দিকে। তিয়েনআনমেন মানেই আধুনিক চীনের রাজনৈতিক উত্থানের ইতিহাস। ৪ লাখ ৪০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই স্কয়ারটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম পাবলিক স্কয়ার। আমরা স্কয়ারের দক্ষিণে ‘জোনিয়াংমেন গেট’ বা গেট অব দ্য জেনিথ সান-এর সামনে নামলাম।
এই গেটটি একসময় বেইজিংয়ের প্রাচীন প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে আমাদের কপালটা মন্দ। তিয়েনআনমেনে প্রবেশের জন্য অনলাইনে যে অগ্রিম বুকিং লাগে, আমাদের গাইডরা তা আগে থেকে করে রাখেনি। ফলে মূল স্কয়ারের ভেতরে ঢোকা আর হলো না। তবে তাতে দমে না গিয়ে আমরা কিয়ানমেন স্ট্রিটের দিকে পা বাড়ালাম।

কিয়ানমেন স্ট্রিট হলো বেইজিংয়ের সবচেয়ে প্রাচীন বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানকার প্রতিটি বাড়ি মিং এবং কিং রাজবংশের স্থাপত্যশৈলীর প্রতিফলন। রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলছে পুরনো দিনের ঐতিহ্যবাহী ট্রাম, যা পর্যটকদের ৫০০ বছরের পুরনো বেইজিংয়ের আবহ দেয়। রাস্তার দুই ধারে সাজানো সুভ্যিনির শপ, এন্টিক দোকান আর সুগন্ধি চীনা খাবারের স্টল।
চারদিকে চীনা ঐতিহ্যের ছড়াছড়ি। দলের বাকিরা যখন কেনাকাটায় ব্যস্ত এবং হোটেলে ফেরার জন্য উশখুশ করছিল, তখন আমি আর মুকুল স্যার সেখানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ ল্যাভেন্ডার আমাদের জানিয়েছে সে আবার আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসছে।
বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামল, ল্যাভেন্ডারের ফোন এলো। সে আমাদের কিয়ানমেন স্ট্রিটের কাছেই ‘ওয়ান পেজ’ লাইব্রেরিতে আসতে বলল। ওয়ান পেজ লাইব্রেরিতে ঢুকে আমাদের চোখ সত্যিই চড়কগাছ হয়ে গেল। চার তলার এই সুবিশাল লাইব্রেরিতে কয়েক লাখ বইয়ের সমাহার। নিচতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত প্রতিটি দেয়াল বইয়ে ঠাসা। এর ইন্টেরিয়র ডিজাইন এতটাই আধুনিক এবং নান্দনিক যে যে কেউ এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারবে। এখানে শুধু বই নেই, আছে চমৎকার রিডিং কর্নার এবং তৃতীয় তলায় অভিজাত কফি শপ।

আমরা বইয়ের মিউজিয়ামের মতো এই লাইব্রেরিতে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম- চীনারা কী লেখে, কী পড়ে? তাদের গল্পের বইগুলোর প্রচ্ছদ আর ইলাস্ট্রেশন আমাদের মুগ্ধ করল। সেখানে চীনা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ও বিশ্বের অন্যান্য ভাষার বইও রয়েছে। চীনের মানুষ যে কেবল বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিতেই এগোয়নি, বরং তারা জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাতেও যে আকাশছোঁয়া সাফল্য অর্জন করেছে, ওয়ান পেজ লাইব্রেরি তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
ল্যাভেন্ডারের হাত ধরে দেখা এই লাইব্রেরিটি আমাদের এই সফরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হয়ে থাকল। এক দিনের পরিচয়ে বিদেশের মাটিতে কারো জন্য এত মায়া আর সহযোগিতা অনুভব করা যায়, তা ল্যাভেন্ডারকে না দেখলে বিশ্বাস হতো না। চীনের মহাপ্রাচীর যেমন দীর্ঘ, ল্যাভেন্ডারদের মতো সাধারণ চীনাদের হৃদয়ের প্রশস্ততাও বোধহয় ঠিক তেমনই বিশাল।