ভ্রমণগদ্য
Published : 04 Oct 2025, 12:06 AM
মাঝপথে হঠাৎ বসে পড়ল জুয়েল। হালকা-পাতলা শরীর নিয়েও হাঁপাচ্ছে। বড় বড় নিঃশ্বাস টেনে শুধু বলল, “আর কতটুকু?”
আর দশটি পাহাড়ের মতোই এ পাহাড়। গায়ের সবুজ কেটে লালমাটির পথ করা। সে পথ বেয়েই চূড়ায় উঠতে হয়। পাহাড়ের গায়ে কয়েকটি মাচাঘর। বাঁশের তৈরি ঘরগুলোতে আদিবাসীদের বাস। আশপাশে জংলি ফুলের বাগান। টকটকে অনেক লাল ফুল ফুটে আছে। প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য অন্যরকম লাগে।
পাহাড়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে একটি ছড়া। দূর পাহাড় থেকে নেমে এসেছে এটি। তার কলকল ধ্বনি নীরবতা ভাঙছে। পাহাড়ের মানুষ এ জলেই পিয়াস মিটায়।
জুয়েলকে নিয়ে একসময় চূড়ায় উঠি। চারপাশের দৃশ্য মন ছুঁয়ে যায়। ক্লান্তি ভুলে অবাক হয়ে চেয়ে থাকি চারপাশে। ছোট-বড় শত শত পাহাড়। কোনোটি আমাদের, কোনোটি ভারতের। দূরে সবুজে ঢাকা উঁচু একটি পাহাড় নজর কাড়ে। তার চূড়ায় ঠায় দাঁড়িয়ে ছোট্ট একটি মাচাঘর। মাচাঘরের ওপাশে আরেকটি পাহাড়। সবুজ পাহাড়ের রাজ্যে অজানা পাখির ডাক। হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বয়। আমাদের কাছে অন্যরকম লাগে। মন যেন হারিয়ে যায় অন্য কোনো ভুবনে।
বছরখানেক আগে বন্ধু জুয়েল আর অরণ্যকে নিয়ে গিয়েছিলাম নেত্রকোণা, দুর্গাপুর-বিরিশিরি দেখতে। ঢাকা থেকে নেত্রকোণা আর সেখান থেকে বাসে চেপে সন্ধ্যার মধ্যেই পৌঁছে যাই দুর্গাপুর। রাতে থাকার জায়গা হয় জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে।

সূর্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। আমাদের সঙ্গী স্থানীয় নাট্যকর্মী গোপাল। সে ছিল পূর্বপরিচিতি। তার মোটরসাইকেলে চড়ে ঘুরে দেখি সাত শহীদের মাজার, টঙ্ক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ, রাজবাড়ি, রানীক্ষ্যং মিশন ইত্যাদি।
দুপুরের খাবার খেতে খেতেই গোপাল জানাল গোপালপুরের কথা। তার মুখে পাহাড়ের সৌন্দর্যের বর্ণনা শুনেই আগ্রহী হই। দুর্গাপুর থেকে গোপালপুর ১৫ কিলোমিটার। শহর থেকে আত্রাইখালী ব্রিজ পার হলে নোল্লাপাড়া চায়না মোড়। মোড় থেকে ডান দিকের পথটি এঁকেবেঁকে চলে গেছে গোপালপুরের দিকে।
খানিক যেতেই আশপাশের দৃশ্যাবলি বদলে যেতে থাকে। ফসলের সবুজ মাঠের ওপাশে দূর পাহাড়। পাহাড় থেকে উড়ে আসে সাদা বকের ঝাঁক। বক দেখতে গিয়ে দূর পাহাড়ে বৃষ্টি পড়তেও দেখি।
খানিক পর বাতাস বৃষ্টি ভাসিয়ে আনে আমাদের কাছে। আমরা পিছু হটলেও রেহাই পাই না। আমাদের ভিজিয়ে দিয়ে চলে যায় বৃষ্টি। যত এগোই ততই দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়। মনে হয় কোনো স্বপ্নপুরীতে চলে এসেছি। প্রকৃতি আমাদের মন ভুলিয়ে দেয়। স্বর্গীয় পরশ নিয়ে মৃদুমন্দ বাতাস বয়। দৃষ্টির সামনে পাহাড়গুলো যেন আমাদের ক্রমাগত ডাক দিয়ে যায়। আমরা উদাস হই। কখন পৌঁছাব পাহাড়ের রাজ্য গোপালপুরে!

গোপালপুরে পৌঁছাতে বিকেল হয়। পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখি একপাশে সবুজে মোড়ানো ফসলের খেত। ঠিক যেন কোনো গলফ খেলার মাঠ। ওপর থেকে মাঠের আইলগুলো দেখতে অন্য রকম লাগে। আমরা নানা ঢঙে ছবি তুলি।
হঠাৎ কোথা থেকে যেন ভেসে আসে গানের সুর, ‘নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক, পায়েল খানি বাজে...’। পাহাড়ে নারীকণ্ঠ! অবাক হয়ে উৎস খুঁজি। চোখ যায় ছড়ার দিকে। দেখি একদল যুবক-যুবতী। গান গাইতে গাইতে জল নিয়ে খেলায় মেতেছে। মাঝেমধ্যে হাসির তুফান তুলে পাহাড়ের গায়ে আনন্দের ঢেউ তুলছে।
জুয়েল ওদের সঙ্গে যোগ দিতে ছুটে যায় ছড়ার দিকে। আমরা তখন গল্প জমাই আদিবাসীদের সঙ্গে। গারো বৃদ্ধ প্রণাশ মারাক আমাদের বসতে দেন। আপন ভেবে জানান দুঃখের কথা।
এই পাহাড়েই মাঝেমধ্যে আক্রমণ করে বন্য হাতির দল। তখন আগুন জ্বালিয়ে আর ঢোল বাজিয়ে তারা বাঁচার পথ খোঁজেন। বন্ধু অরণ্য আফসোস করে। ইস! যদি দেখা যেত দু’একটাকে!
দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে আসে। চারপাশে তখন অন্ধকার। পাহাড়ের দৃশ্যপটও বদলে যেতে থাকে। দূরে আদিবাসী গ্রামগুলোতে বাজে ঢোল-মাদলের বাদ্যি। ঝিঁঝি পোকার ডাক আর জোনাকির মিছিল ভেঙে আমরা ফেরার পথ খুঁজি।