Published : 19 Dec 2025, 12:09 AM
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০ – ১৮৯১) নামটা উচ্চারিত হলে সবার আগে যে শব্দটা মনে পড়ে, তা হলো ‘সমাজ সংস্কারক’। তার নামের সঙ্গে এই উপাধিটা এতটাই অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে যে, তার বিশাল সাহিত্যকৃতি অনেক সময় আলোচনার আড়ালে থেকে যায়।
তিনি সারাজীবন লড়াই করেছেন সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে বিধবা বিবাহের পক্ষে তার লড়াই ছিল এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। এই লড়াইয়ে তিনি একদিকে যেমন গোঁড়া সমাজপতিদের মুখোমুখি হয়েছিলেন, অন্যদিকে তাদের সমর্থক ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গেও সমানে যুঝেছেন।
একবার সমাজসংস্কারক ও জমিদার রাণী রাসমণির বাড়িতে ইংরেজদের উপস্থিতিতে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সমাজপতিদের তুমুল তর্কযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় একা ঈশ্বরচন্দ্রই পণ্ডিতদের সমস্ত যুক্তির জবাব দিয়েছিলেন। রাণী রাসমণি মনে মনে তার পক্ষে থাকলেও সেই প্রকাশ্য তর্কে অংশ নেননি।
বিদ্যাসাগর সেদিন হিন্দু শাস্ত্র থেকে অসংখ্য উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, বিধবা বিবাহ কোনোভাবেই ধর্মবিরুদ্ধ নয়। তার অকাট্য যুক্তি ও শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য দেখে ব্রিটিশ সরকার সন্তুষ্ট হয়েছিল। এর ফলেই ১৮৫৬ সালে সরকার বিধবা বিবাহকে আইনসিদ্ধ বলে ঘোষণা করে, আইনটির নাম “হিন্দু উইডোজ’ রিম্যারেজ অ্যাক্ট”।
ঈশ্বরচন্দ্র কেবল আইন প্রণয়ন করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি যা বিশ্বাস করতেন তা নিজের জীবনেও কার্যকর করে দেখিয়েছিলেন। তিনি তার নিজের পুত্র নারায়ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এক বিধবার বিবাহ দিয়ে সমাজের সামনে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৮৭২ সালের ১৫ জুন হিন্দু বিধবাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে তিনি ‘হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুইটি ফান্ড’ নামে একটি জনহিতকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
বাল্যবিবাহের অভিশাপ মোচন এবং নারী শিক্ষার বিস্তারেও তিনি ছিলেন সোচ্চার। নারী শিক্ষার প্রসারে তার অবদান অবিস্মরণীয়; তিনি নিজ উদ্যোগে প্রায় ২৮৮টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ভারতের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়গুলোর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন তিনি।
এই বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের জন্য তিনি একটি ‘নর্মাল স্কুল’ স্থাপন করেন। ১৮৬৪ সালে তিনি কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন’, যা বর্তমানে তারই নামানুসারে ‘বিদ্যাসাগর কলেজ’ হিসেবে পরিচিত। ইতিহাস তার এই অবদানকে আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলায় জন্মগ্রহণকারী এই মানুষটি কেবল সমাজ সংস্কারক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেরও সংস্কারক। উনিশ শতকের এই শিক্ষাবিদ একাধারে লেখক, অনুবাদক, পণ্ডিত, দার্শনিক, প্রকাশক এবং মানবহিতৈষী ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণ বা রেনেসাঁয় তার অবদান মৌলিক।
তাকে বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক বলা হয় এবং তিনিই ছিলেন প্রথম সার্থক বাঙালি গদ্যকার। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মৌলিক গদ্য শোকগাথা হিসেবে পরিচিত ‘প্রভাবতী সম্ভাষণ’ তারই সৃষ্টি, যা সম্ভবত ১৮৬৩ সালে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, বিদ্যাসাগর ছিলেন ‘বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী’।
বিদ্যাসাগরের নামের ইতিহাসও অত্যন্ত গৌরবময়। ১৮৩৯ সালের ২২ এপ্রিল ‘হিন্দু ল কমিটি’র পরীক্ষায় সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রথম ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি প্রদান করা হয়। এরপর ১৮৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপকেরা পুনরায় তাকে ‘বিদ্যাসাগর’ নামে অভিহিত করেন। এরপর থেকেই তার পারিবারিক পদবি ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ যেন চিরতরে বিদ্যাসাগর নামের মহিমায় হারিয়ে যায়।
সংস্কৃত ছাড়াও হিন্দি, বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তার জ্ঞান ছিল। ১৮৪৭ সালে হিন্দি ‘বেতাল পচ্চিসী’ অবলম্বনে রচিত তার প্রথম বই ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ প্রকাশিত হয়। এই বইটির মাধ্যমেই তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথমবার ইংরেজি সাহিত্যের অনুকরণে বিরাম চিহ্নের সফল ব্যবহার করেন, যা বাংলা গদ্যকে আধুনিক রূপ দেয়।
তার অনূদিত গ্রন্থের তালিকা বেশ দীর্ঘ। সংস্কৃত থেকে তিনি অনুবাদ করেন কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তলম অবলম্বনে ‘শকুন্তলা’ (১৮৫৪), ভবভূতির উত্তররামচরিতম্ অবলম্বনে ‘সীতার বনবাস’ (১৮৬০), এবং ব্যাসদেবের মহাভারত অবলম্বনে ‘মহাভারতের উপক্রমণিকা’ (১৮৬০)। এছাড়া ১৮৭৩ সালে মধুসূদন তর্কপঞ্চানন রচিত ১১৭টি শ্লোকের অনুবাদ ‘বামনাখ্যানম’ প্রকাশ করেন।
ইংরেজি থেকেও তিনি অনেক অনুবাদ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মার্শম্যানের ‘হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল’ অবলম্বনে ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ (১৮৪৮), চেম্বার্সের ‘বায়োগ্রাফিজ’ অবলম্বনে ‘জীবনচরিত’ (১৮৪৯), এবং রবার্ট ও উইলিয়াম চেম্বার্সের ‘মোরাল ক্লাস বুক’ অবলম্বনে ‘নীতিবোধ’ (১৮৫১)। এছাড়া চেম্বার্সের ‘রুডিমেন্টস অফ নলেজ’ অবলম্বনে ‘বোধোদয়’ (১৮৫১), ঈশপস ফেবলস অবলম্বনে ‘কথামালা’ (১৮৫৬) এবং শেক্সপিয়ারের ‘কমেডি অফ এররস’ অবলম্বনে ‘ভ্রান্তিবিলাস’ (১৮৬৯) তার অন্যতম প্রধান সাহিত্যকর্ম।
সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ১৮৪৭ সালে তিনি সংশোধিত আকারে ‘অন্নদামঙ্গল’ প্রকাশ করেন। তার সম্পাদিত অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘সর্বদর্শনসংগ্রহ’ (১৮৫৩-৫৮), ‘শিশুপালবধ’ (১৮৫৩), ‘কুমারসম্ভবম’ (১৮৬২), ‘কাদম্বরী’ (১৮৬২), ‘বাল্মীকি রামায়ণ’ (১৮৬২), ‘রঘুবংশম’ (১৮৫৩), ‘মেঘদূতম’ (১৮৬৯), এবং ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ (১৮৭১)।
এছাড়া ১৮৫৫ সালে বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না, সেই বিষয়ে শাস্ত্রীয় প্রমাণসহ তার দুটি ঐতিহাসিক পুস্তক প্রকাশিত হয়। শিশুদের শিক্ষার জন্য তার ‘বর্ণপরিচয়’ (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ) ১৮৫৫ সালের ১৩ এপ্রিল প্রকাশিত হয়, যা আজও বাংলা বর্ণমালা শিক্ষার প্রধান ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। শিক্ষা ও ব্যাকরণ সংক্রান্ত গ্রন্থের মধ্যে ‘ঋজুপাঠ’, ‘সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা’, ‘ব্যাকরণ কৌমুদী’ এবং অভিধানমূলক গ্রন্থ ‘শব্দমঞ্জুরী’ (১৮৬৪) উল্লেখযোগ্য।
বিদ্যাসাগরের মৌলিক রচনার মধ্যে ‘সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব’ (১৮৫৩), ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না’ (১৮৭১) এবং ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনামে লেখা রম্য রচনাগুলো অন্যতম। তার মৃত্যুর পর ১৮৯১ সালে ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ ও ‘ভূগোল খগোল বর্ণনম’ প্রকাশিত হয়। এছাড়া তার তিনটি ইংরেজি গ্রন্থ ‘পোয়েটিক্যাল সিলেকশনস’, ‘সিলেকশনস ফ্রম গোল্ডস্মিথ’ এবং ‘সিলেকশনস ফ্রম ইংলিশ লিটারেচার’ তার পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেয়।
আমরা এখানে তার প্রায় ৫০টি গ্রন্থের উল্লেখ করেছি। তার ‘শকুন্তলা’ ও ‘সীতার বনবাস’ গ্রন্থে যে প্রাঞ্জল গদ্যশৈলী দেখা যায়, তা বাংলা ভাষাকে এক নতুন উচ্চতা দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, তিনি বাংলা গদ্যের উচ্ছৃঙ্খলতাকে সুবিন্যস্ত ও সুসংহত করে তাকে সহজ গতি দান করেছিলেন।
কর্মজীবনে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ এবং সহকারী স্কুল পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৮৫৮ সালে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘সোমপ্রকাশ’, যা ছিল রাজনৈতিক সচেতনতা সম্পন্ন প্রথম দেশীয় পত্রিকা। এছাড়া তিনি ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন। তার চরিত্রের অন্যতম বড় দিক ছিল দয়া ও মাতৃভক্তি। অকাতরে দান করার জন্য তিনি ‘দয়ার সাগর’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মায়ের প্রতি তার ভক্তি ছিল অতুলনীয়; একবার মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দামোদর নদ সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার কাহিনি আজও লোকমুখে ঘোরে। বাংলা গদ্যকে আধুনিক ও প্রাঞ্জল রূপদানকারী এই ব্যক্তি ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই ৭০ বছর বয়সে লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। আজও তিনি বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন- একজন শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক, মানবহিতৈষী এবং বাংলা গদ্যের সার্থক রূপকার হিসেবে।