Published : 17 Jun 2026, 01:24 PM
১৯৫৭ সালের অক্টোবর মাস। প্যারিসের ল্যাটিন কোয়ার্টারের একটি ছিমছাম রেস্তোরাঁ। মধ্যাহ্নভোজ সারছিলেন এক মধ্যবয়স্ক ফরাসি ভদ্রলোক। এমন সময় তার প্রকাশকের অফিস থেকে এক যুবক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো।
ওয়েটারকে সরিয়ে দিয়ে সরাসরি ভদ্রলোকের সামনে দাঁড়িয়ে খবরটা দিল- রেডিওতে ঘোষণা করা হয়েছে, এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন তিনি। ভদ্রলোক আর কেউ নন, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তক আলবেয়ার কাম্যু।
পুরস্কার পাওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পরের দৃশ্য। কোনো রাজকীয় হলরুম বা গাম্ভীর্যপূর্ণ স্টুডিও নয়, ফরাসি টেলিভিশনের সাংবাদিকরা কাম্যুর সাক্ষাৎকার নিতে গেলেন ‘পার্ক দেস প্রিন্সেস’ ফুটবল স্টেডিয়ামে। ৩৫ হাজার দর্শকের চিৎকারের মাঝে বসে আছেন নোবেলজয়ী লেখক। ক্যামেরার সামনে তিনি কথা বলছেন না কোনো দার্শনিক তত্ত্ব নিয়ে, বরং তার চোখ নিবদ্ধ মাঠের দিকে।
হঠাৎ দেখা গেল, বিপক্ষ দলের একটি ক্রস ধরতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেললেন গোলরক্ষক, বল জড়িয়ে গেল জালে। সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন গোলকিপারের এই ভুল নিয়ে। কাম্যু শান্ত গলায় বললেন, “ওর ওপর খুব বেশি কঠোর হবেন না। গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ালে বোঝা যায়, জীবন ঠিক কতটা অনিশ্চিত।”
বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে আলবেয়ার কাম্যু এক বিস্ময়কর নাম। কিন্তু সাহিত্যের চেয়েও বড় ছিল তার যাপিত জীবন, যার পরতে পরতে মিশে ছিল ফুটবল। আজ যখন আমরা ফুটবলকে কেবল গ্ল্যামার আর কোটি টাকার বাণিজ্যিক ডামাডোল হিসেবে দেখি, তখন কাম্যুর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি ছিল তার ‘জীবনের বিশ্ববিদ্যালয়’।
আলজেরিয়ার এক বস্তিতে কাম্যুর বড় হয়ে ওঠা। বাবা যুদ্ধে মারা গেছেন তার জন্মের বছরেই। মা ছিলেন নিরক্ষর, কানে কম শুনতেন। আর ছিলেন এক কঠোর মেজাজের নানি। দারিদ্র্য ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। ছোট্ট কাম্যুর নেশা ছিল ফুটবল। কিন্তু নানি ছিলেন ঘোর বিরোধী, রোজ স্কুল ফেরত নাতির জুতোর তলা পরীক্ষা করতেন। যদি জুতোর তলায় ঘর্ষণের চিহ্ন দেখা যেত, তবে কপালে জুটত বেধড়ক মার। কারণ নতুন জুতো কিনে দেওয়ার সামর্থ্য তাদের ছিল না।
বুদ্ধিমান কাম্যু এক উপায় বের করলেন। তিনি বেছে নিলেন গোলকিপারের পজিশন। সেখানে দৌড়াদৌড়ি কম, জুতোর ক্ষয়ও কম। এভাবেই নানির মার থেকে বাঁচতে গিয়েই কাম্যু প্রেমে পড়ে গেলেন গোলপোস্টের।
কিন্তু এ গোলকিপিংই হয়তো পরবর্তীকালে অ্যাবসার্ড দর্শনের সঙ্গে তার মানসিক সংযোগ তৈরি করেছিল। গোলকিপার মানেই এক নিঃসঙ্গ প্রহরী। মাঠের বাকি দশজন যখন বিপক্ষ সীমানায় আনন্দে মত্ত, গোলকিপার তখন একাকী নিজের দুর্গের সামনে দাঁড়িয়ে। দল জিতলে তার কোনো বাহবা নেই, কিন্তু দল হারলে সমস্ত দায়ভার কেবল তার। এই যে বিশাল জনসমুদ্রে একা হয়ে যাওয়া, এই নিঃসঙ্গতাই কাম্যুকে শিখিয়েছিল জীবনের অন্য সত্য।
কাম্যু ছিলেন প্রতিভাবান গোলরক্ষক। আলজিয়ার্স ইউনিভার্সিটি (আরইউএ) জুনিয়র টিমের গোলপোস্টের নিচে তিনি যেন ছিলেন দেওয়াল। ১৯৩০ সালের এক ম্যাচ বুলেটিনে তার খেলার প্রশংসা ছাপা হয়েছিল। কিন্তু নিয়তি তার জন্য অন্য চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। মাত্র ১৭ বছর বয়সে কাম্যুর ফুসফুসে ধরা পড়ল যক্ষ্মা।
তখনকার দিনে যক্ষ্মা মানেই ছিল নিশ্চিত মৃত্যু কিংবা চিরতরে পঙ্গুত্ব। কাম্যুর ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন সেখানেই সমাধিস্থ হলো। অনেকে অনুমান করেছিলেন, ম্যাচের পর প্রচণ্ড ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকার ফলেই হয়তো রোগটি বাসা বেঁধেছিল। যদিও এটি মূলত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ। যক্ষ্মা কাম্যুর শরীর কেড়ে নিলেও তার মন থেকে ফুটবলকে মুছতে পারেনি। পরবর্তী জীবনে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ফুটবল আর থিয়েটারই ছিল তার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষালয়’।

নোবেল পাওয়ার পর কাম্যু একটি ঐতিহাসিক কথা বলেছিলেন যা আজও ফুটবল দুনিয়ায় অমর হয়ে আছে, “মানুষের নৈতিকতা এবং কর্তব্যবোধ সম্পর্কে আমি যা কিছু নিশ্চিতভাবে জানি, তার সবকিছুই আমি শিখেছি ফুটবল থেকে।”
এ কথাটি ছিল আসলে তৎকালীন প্যারিসের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহলের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে জঁ-পল সার্ত্রের মতো দার্শনিকরা যখন কফি শপে বসে তাত্ত্বিক জটিলতায় পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করতেন, কাম্যু তখন ফুটবল মাঠের ‘সরল নৈতিকতা’র পক্ষে সওয়াল করতেন।
তিনি মনে করতেন, রাজনীতি বা ধর্ম মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তৈরি করে কৃত্রিম বিভেদ। কিন্তু ফুটবল মাঠ শেখায় সততা, সাহসিকতা আর সঙ্গীর বিপদে পাশে দাঁড়ানোর সহজ শিক্ষা। কাম্যুর কাছে মাঠের সেই ঘাম আর পরিশ্রম ছিল প্যারিসের অভিজাত ড্রয়িংরুমের বিতর্কের চেয়ে অনেক বেশি সত্য।
কাম্যুর দর্শনের মূল স্তম্ভ ছিল ‘অ্যাবজারডিটি’। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই পৃথিবী ও মহাবিশ্ব মানুষের অর্থ খোঁজার প্রচেষ্টার বিপরীতে এক নিথর নীরবতা পালন করে। তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দ্য মিথ অফ সিজিফাস’-এ তিনি এক পৌরাণিক চরিত্রের কথা বলেন, যাকে আজীবন এক বিশাল পাথর পাহাড়ের চূড়ায় ঠেলে তুলতে হয়, কিন্তু চূড়ায় পৌঁছানোর আগেই পাথরটি আবার নিচে গড়িয়ে পড়ে।
ফুটবল ম্যাচও কি অনেকটা তেমনই নয়? ২২ জন মানুষ একটি চামড়ার গোলকের পেছনে ৯০ মিনিট ধরে পাগলের মতো ছোটে। গোল হয়, জয় আসে, উল্লাস হয়। কিন্তু পরক্ষণেই আবার সবকিছু শূন্য। পরের সপ্তাহে আবার নতুন করে শুরু করতে হয় সেই একই পাথর ঠেলার সংগ্রাম। কাম্যু বলতেন, এই অর্থহীনতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আনন্দ। তিনি মনে করতেন, সিজিফাস যেমন পাথর ঠেলার মধ্যেই নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়, একজন ফুটবলারও তেমনি গোল আটকানো বা গোল করার অদম্য চেষ্টার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা খুঁজে পান।
কাম্যুর প্রতিটি সৃষ্টিতে ফুটবলের কোনো না কোনো প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য আউটসাইডার’-এ আমরা দেখি এক নিঃসঙ্গ নায়ককে, যে সমাজের কোনো নিয়ম মানে না। জিম হোয়াইট নামের এক সমালোচক চমৎকারভাবে বলেছিলেন, ২০০৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে জিনেদিন জিদান যখন মাতেরাজ্জিকে ঢুঁসো মারলেন, তখন তিনি যেন কাম্যুর সেই নায়ক ম্যুরসোঁ-র প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিলেন- অদ্ভুত, অযৌক্তিক কিন্তু অনিবার্য ক্ষোভ।
আবার কাম্যুর ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসে গঞ্জালেস নামক চরিত্রের ফুটবল প্রেমের মধ্য দিয়ে তিনি যেন নিজের হারানো দিনগুলোকেই তুলে ধরেছিলেন। এমনকি তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘দ্য ফার্স্ট ম্যান’-এ কাম্যু তার শৈশবের সেই আলজেরীয় মাঠগুলোর কথা লিখেছিলেন, যেখানে ‘ন্যাকড়ার তৈরি বল’ দিয়ে শুরু হয়েছিল তার পথচলা।
নোবেলজয়ী হওয়ার পর কাম্যু একবার আলজেরিয়ায় ফিরেছিলেন। সেখানে এক ট্যাক্সি ড্রাইভার তাকে দেখে চিনতে পারল। কাম্যু ভাবলেন হয়তো তার কোনো বই পড়ে ড্রাইভারটি তাকে চিনেছে। কিন্তু ড্রাইভারটি উল্লাসে চিৎকার করে বলল, “আরে! আপনিই তো আমাদের আরইউএ টিমের সেই দুর্দান্ত গোলকিপার ছিলেন, তাই না?”
কাম্যু পরবর্তীকালে তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, নোবেল পাওয়ার চেয়েও এই পরিচিতি তাকে বেশি তৃপ্তি দিয়েছিল। কারণ, সেখানে তিনি কোনো তত্ত্বের আড়ালে ঢাকা পড়া লেখক ছিলেন না, ছিলেন রক্ত-মাংসের এক যোদ্ধা।
১৯৬০ সালের ৪ জানুয়ারি। শীতের এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর। কাম্যু তার বন্ধু ও প্রকাশক মিশেল গ্যালিমার্ডের গাড়িতে করে প্যারিস ফিরছিলেন। কাম্যুর পকেটে ছিল একটি অব্যবহৃত ট্রেনের টিকিট। ট্রেনের বদলে গাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল অদ্ভুত। পথে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এ কিংবদন্তি। ঘটনাস্থলেই ধ্বংসস্তূপের ভেতর পাওয়া গিয়েছিল তার সেই অসমাপ্ত উপন্যাস ‘দ্য ফার্স্ট ম্যান’-এর পাণ্ডুলিপি।
কাম্যুর জীবনের পরিসমাপ্তি ছিল ঠিক তার দর্শনের মতোই- আকস্মিক, অযৌক্তিক ও নিষ্ঠুর। তার শেষযাত্রায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। লুরমারিন নামক যে গ্রামে তিনি শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন, সেখানকার স্থানীয় ফুটবল ক্লাবের খেলোয়াড়রা তাদের প্রিয় ‘গোলকিপার’ কাম্যুর কফিন কাঁধে বহন করেছিলেন।
একজন নোবেলজয়ী লেখকের বিদায়বেলায় রাজকীয় কোনো শোকমিছিল নয়, বরং একদল ফুটবলারের কাঁধই ছিল তার জীবনের সার্থকতা। কাম্যুর ভাষায়, “জীবন হয়তো অর্থহীন, কিন্তু ফুটবল সেই অর্থহীনতাকেই যাপন করার সাহস যোগায়।”
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য গার্ডিয়ান, লিট হাব ও উয়েফা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।