১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কারা ছিলেন বাস্তবের ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’

সিনেমার ঝলমলে জলদস্যুরা যেমন রোমাঞ্চকর, বাস্তবের দস্যুজীবন ছিল তার চেয়ে রূঢ় ও হিংস্র।

কারা ছিলেন বাস্তবের ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’
চিত্রকর্মে বিখ্যাত জলদস্যু ব্ল্যাকবিয়ার্ড। ছবি: নর্থ উইন্ড পিকচার আর্কাইভস

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 31 Jul 2025, 12:19 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:29 PM

তিনশ বছর আগে, লন্ডনের সরু গলি প্যাটারনস্টার রো হঠাৎ করেই হয়ে উঠেছিল দুনিয়া কাঁপানো এক জলদস্যু কাহিনির জন্মস্থল। আজ যেখানে আধুনিক ক্যাফে আর মনোহারী পণ্যের দোকান, একসময় ছিল সেখানকার প্রকাশনা জগতের প্রাণকেন্দ্র। 

এখানেই ১৭২৪ সালের মে মাসে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘অ্যা জেনারেল হিস্টোরি অফ দ্য পাইরেটস’ নামে একটি বই। এটি বাস্তব জলদস্যুদের কাহিনি তুলে ধরে নির্মাণ করে রোমাঞ্চকর জলদস্যু-কাল্পনিক চরিত্রের ভিত্তি। লেখকের নাম ক্যাপ্টেন চার্লস জনসন, যদিও বাস্তবে এমন কেউ ছিলেন না।

ধারণা করা হয়, এটি ছিল ড্যানিয়েল ডিফো কিংবা ন্যাথানিয়েল মিস্ট-এর ছদ্মনাম। এই বইতেই প্রথম পরিচিত হন হেনরি অ্যাভেরি, ব্ল্যাকবিয়ার্ড, অ্যান বনির মতো কিংবদন্তি জলদস্যুরা, যাদের জীবন নিয়ে পরবর্তীকালে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য টিভি সিরিজ, উপন্যাস এবং বিখ্যাত ‘পাইরেট্স অব দ্য ক্যারিবিয়ান’ চলচ্চিত্র ফ্র্যাঞ্চাইজি। 

কিন্তু বাস্তবের জলদস্যুরা আদৌ কি ছিলেন ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারোর মতো প্রেমিক-দস্যু? নাকি ছিলেন ঠান্ডা মাথার খুনি, ডাকাত ও ধর্ষক?

পূর্ব লন্ডনের প্যাটারনস্টার রো-এর প্রবেশপথ (বাঁ দিকে), যেখানে ১৭২৪ সালের মে মাসে ‘অ্যা জেনারেল হিস্টোরি অফ দ্য পাইরেটস’ প্রকাশিত হয়। ছবি: শন কিংসলে

পূর্ব লন্ডনের প্যাটারনস্টার রো-এর প্রবেশপথ (বাঁ দিকে), যেখানে ১৭২৪ সালের মে মাসে ‘অ্যা জেনারেল হিস্টোরি অফ দ্য পাইরেটস’ প্রকাশিত হয়

কালো পতাকার ছায়ায়

১৬৯০-এর দশকে প্রথম যে জলদস্যুরা ভারতীয় মহাসাগরে ভারতের পশ্চিম উপকূল আর আরব উপদ্বীপের মধ্যকার বাণিজ্যপথে আক্রমণ চালায়, তারাই পরবর্তীকালে ১৭১০–২০-এর দশকে চোখ রাখে ক্যারিবিয়ান সাগর আর আফ্রিকার উপকূলে থাকা ক্রীতদাস-বাণিজ্যজাহাজগুলোর দিকে। ১৭২০ সালের আশপাশে, যে কোনো সময় অন্তত ৩২টি জলদস্যু জাহাজ ক্যারিবিয়ানে ত্রাস সঞ্চার করত, প্রায় ২ হাজার ৪০০ দস্যু নিয়ে। 

তাদের প্রায় অর্ধেকই ছিলেন ইংরেজ। বেশির ভাগই লন্ডন, ব্রিস্টল, লিভারপুল বা প্লাইমাউথ থেকে আসা। এক-চতুর্থাংশ ছিলেন আমেরিকার পশ্চিম ইন্ডিজ ও উত্তর আমেরিকার উপকূলীয় বন্দরনগর থেকে, যেমন বোস্টন, নিউ ইয়র্ক, চার্লসটন।

অধিকাংশ জলদস্যু ছিলেন প্রাক্তন নাবিক, রাজকীয় নৌবাহিনী বা বণিক জাহাজের কর্মী। তারা পরিচিত ছিলেন কঠোর পরিশ্রম, দুর্গন্ধযুক্ত পচা খাবার, আর নৃশংস শাস্তির অভিজ্ঞতায়। অনেকেই সামুদ্রিক বিদ্রোহের মাধ্যমে বা দস্যুদের হাতে বন্দি হয়ে এই পথে আসেন।

‘অ্যা জেনারেল হিস্টোরি অফ দ্য পাইরেটস’ বইয়ের শিরোনাম পৃষ্ঠা। ছবি: ইন্টারনেট আর্কাইভস

‘অ্যা জেনারেল হিস্টোরি অফ দ্য পাইরেটস’ বইয়ের শিরোনাম পৃষ্ঠা

ধন-সম্পদের মোহ ও স্বল্প জীবন

দস্যুজীবন মানেই ছিল সোনাদানা, মণিমুক্তা, মশলা আর মদের বিশাল রসদ। কিন্তু সেই সম্পদ বেশিরভাগ সময়ই উড়িয়ে দিত হত বেশ্যালয়, পানশালা ও উন্মত্ত আনন্দে। জলদস্যুদের স্বপ্ন ছিল বড়সড় একটি লুট, তারপর সমাজে ফিরে গিয়ে নিশ্চিন্ত জীবন। যেমন হেনরি অ্যাভেরি ১৬৯৫ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজকোষবাহী জাহাজ দখল করে নিয়েছিলেন প্রায় ৬ লাখ পাউন্ড মূল্যের সম্পদ, আজকের হিসাবে যা প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ডলার। তবে অধিকাংশ দস্যুই সফল হননি। কেউ সৈন্যের হাতে, কেউ প্রাকৃতিক দুর্যোগে, কেউ বিশ্বাসঘাতে প্রাণ হারান।

স্বাধীনতার স্বপ্ন, কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম

মজার বিষয় হল, জলদস্যুদের জাহাজেও ছিল এক ধরনের গণতন্ত্র। অধিকাংশ সিদ্ধান্ত হত ভোটে, পণ্যলুটের ভাগ পেত সবাই। এমনকি দস্যু জাহাজের ক্যাপ্টেনকেও প্রতিস্থাপন করা যেত। তবে এ ছিল নিছকই প্রয়োজনের বাস্তবতা, সমান বণ্টন মানেই ছিল কম বিদ্রোহ। নারীদের সাধারণত নিষিদ্ধ করা হত, তবে অ্যান বনি ও মেরি রিড এই নিয়মের ব্যতিক্রম। পুরুষদের মধ্যে ‘মাতলোতাজ’ নামে এক ধরনের ‘অঙ্গীকারবন্ধন’ হত, যেখানে দুইজন দস্যু একে অপরের সম্পদের উত্তরাধিকারী হত। 

হিংসা ও ভয়ের রাজনীতি

সব দস্যু সমান ছিল না। ব্ল্যাকবিয়ার্ড ছিলেন আতঙ্কের প্রতীক, দাড়িতে জ্বলন্ত ফিউজ লাগিয়ে জাহাজে হানা দিতেন। তবে সবচেয়ে ভয়ানক ছিলেন এডওয়ার্ড লো। একবার এক পর্তুগিজ ক্যাপ্টেন স্বর্ণ মুঠো ফেলে দিলে তার ঠোঁট কেটে ভেজে খাওয়ানো হয় অন্য নাবিককে।

কিন্তু সহিংসতা সবসময় উদ্দেশ্য নয়, বেশিরভাগ দস্যুই চেয়েছিলেন জাহাজ দখল করতে রক্তপাত ছাড়াই। এ জন্য তারা বিভিন্ন নাটকীয় উপায় অবলম্বন করতেন—নগ্ন হয়ে হামলা, ভয়ংকর মুখোশ বা নারী দস্যুর নগ্ন লড়াই।

দস্যু পতাকা, কালো বা লাল রঙের ছিল এই সাইকোলজিকাল যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র। কালো পতাকা মানে ছিল আত্মসমর্পণ করলে প্রাণভিক্ষা মিলবে। লাল মানেই কোনো ছাড় নেই।

‘অ্যা জেনারেল হিস্টোরি অফ দ্য পাইরেটস’ বইয়ে বার্থলোমিউ রবার্টসের একটি খোদাইচিত্র। ছবি: ইন্টারনেট আর্কাইভস

‘অ্যা জেনারেল হিস্টোরি অফ দ্য পাইরেটস’ বইয়ে বার্থলোমিউ রবার্টসের একটি খোদাইচিত্র

করুণ পরিণতি

বেশিরভাগ বিখ্যাত জলদস্যুই শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছেন ও ফাঁসিতে ঝুলেছেন। ব্ল্যাকবিয়ার্ডকে মাথা কেটে হত্যা করা হয়, বেলামি ও তার দলের প্রায় সবাই সাগরে ডুবে যান, আর বারথলোমিউ রবার্টসকে গুলিতে হত্যা করে রাজকীয় নৌবাহিনী। আশ্চর্যজনকভাবে, জলদস্যুদের এক-চতুর্থাংশই ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ, যাদের অনেকেই প্রাক্তন ক্রীতদাস। যদিও জাহাজে তারা ছিলেন সমান অধিকার নিয়ে, ঔপনিবেশিক প্রশাসন তাদের খুব কম ক্ষেত্রেই বিচার দিয়েছে, প্রায় সবাইকে ফের দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে।

জলদস্যুদের কাহিনি টিকে আছে কীভাবে?

বাস্তব দস্যুরা ছিলেন অপরাধী- ডাকাত, খুনি, ধর্ষক। তবু তারা হয়ে উঠেছেন ‘স্বাধীনতার প্রতীক’। কারণ তারা ছিল ‘আইনের বাইরে’ এক রকমের বিদ্রোহ, এক পলকের জন্য হলেও, শাসকের চোখ রাঙানিকে বুড়ো আঙুল দেখানো জীবন। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, জলদস্যুরা জনপ্রিয় কারণ, তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘ম্যাগনেটিক চার্ম’ আছে, একটি রোমান্টিক ভাবনা, যেখানে নিয়ম ভাঙার মধ্যে এক ধরনের মুক্তির স্বাদ মেলে।

তবে বাস্তবতা ছিল, এটা ছিল ‘জীবনকে উপভোগ করো, দ্রুত মরো’ নীতির ওপর গড়ে ওঠা এক বিপজ্জনক খেলা। যেমন কিংবদন্তি ইংরেজ জলদস্যু বার্থলোমিউ রবার্টস বলেছিলেন, “সৎ চাকরিতে মেলে অল্প খাবার, কম মজুরি আর বেশি খাটুনি। দস্যুজীবনে আছে ভরপেট খাবার, মদ, আনন্দ আর স্বাধীনতা। তাই আমার নীতি- একটা আনন্দময় জীবন, যতটা ছোট হোক না কেন।”

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন ডটকম