Published : 12 Oct 2025, 08:33 PM
শিশুদের একটা মজার খেলা হল ঘরের ভেতরেই নিজের একটা ছোট্ট জায়গা তৈরি করা। শিশুরা চাদর বা কাপড় দিয়ে এমন ঘর বানায়। বাজারে চমৎকার ছোট ছোট খেলার ঘর কিনতেই পাওয়া যায়। তবু বাসায় ব্যবহার করা চাদর দিয়ে বানানো ঘর তৈরির ক্ষেত্রে শিশুদের সম্পৃক্ততা অনেক গভীর হয়।
খেলার ক্ষেত্রে নির্মাণের ধারণা যুক্ত করা একটা চমৎকার পরিকল্পনা। তৈরিকৃত বস্তু যেমন গাড়ি বা প্লেন দিয়ে খেলার চেয়ে ব্লক, কাগজ বা নানা রকমের উপাদান দিয়ে প্লেন বা গাড়ি বানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে শেখার জায়গাটা ভিত্তি পর্যায় থেকেই শিশুদের মধ্যে ডিজাইন নিয়ে চিন্তা ভাবনার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
শিশুদের খেলা নিয়ে আমাদের ভাবনা কি খরিদমুখী নাকি নির্মাণমুখী? খেলনার দোকানের দৃশ্য কী বলে? আমরা যখন শহরের খেলনার দোকানগুলোতে যাই তখন সারি সারি চকচকে প্যাকেট, বাক্স, রঙিন আলো, নানা রকমের শব্দ, শিশুদের প্রিয় কার্টুন চরিত্র বা ব্যাটারি চালিত খেলনা দেখি। এর মানে হল, খেলনার জগৎটা এখন মূলত ‘রেডি-মেড কনসাম্পশন’ কেন্দ্রিক।
শিশুর খেলা ও খেলনা নিয়ে আমরা ভাবি, কিন্তু তাকে খেলা বানানোর জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে রাখছি! খেলনার দোকানের চিত্রকে যদি এক বাক্যে প্রকাশ করতে হয় তাহলে বলা যায়; “তোমার কষ্ট করে খেলনা বানানোর দরকার নেই, আমিই তোমার জন্য বানিয়ে রেখেছি”। কষ্ট করা বা খেটেখুটে কিছু তৈরি করার জায়গার দরজাটা আরও চওড়া হওয়া চাই।
এখন শিশুর খেলার জগৎকে নির্মাণমুখী করতে চাইলে সে জগতের চিত্র কেমন হবে? সে জগৎ হতে পারে প্রকৃতির মাঝে, খোলা জায়গায়। আর এটাই সেরা। খালি পায়ে ঘাসে দৌড়ানো, বয়ে চলা পানি ছুঁয়ে খেলা করা, শুকনো পাতা কুড়ানো, মাটি দিয়ে কিছু তৈরি করা, বালি দিয়ে খেলা, লাল ইট দিয়ে মাটিতেই লেখালেখি শুরু করা, ট্রি হাউজ বানানো, পিকনিক করা, চড়ুই ভাতির খেলা, এক্কা দোক্কা খেলা, কিছু তৈরি করে ভাসানো, বন্ধু বানানোর খেলা, ঝগড়া বা অভিমান মিটমাটের খেলা! কত রকমের খেলার অভিনব দৃশ্য!
নির্মাণমুখী খেলা হতে পারে বাড়ির ভেতরেও! বারান্দা বা ছাদে বা ঘরের কোণের একটা জায়গায় নিজের জন্য কেনা গাছ যত্ন করে বড় করা। হতে পারে নানা রকম, আকৃতি ও উপাদানের ব্লক নিয়ে খেলা, হতে পারে কাগজ দিয়ে ক্রাফটের কাজ, হতে পারে রুটি বা পরোটার ডো দিয়ে কিছু বানানো, হতে পারে সবজি কাটাকুটির খেলা, হতেই পারে রঙের খেলা, ভাবতে পারি প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে নানা রকমের উপাদান দিয়ে কিছু তৈরির বিষয়টি।
নির্মাণমুখী খেলা হতে পারে একা বা দলে। সাহায্য নিয়ে অথবা না নিয়েই! যেভাবেই হোক শেখার জায়গাটা হয় গভীর, চিরস্থায়ী ও ঊর্ধ্বগতির। তবে এ নিয়ে পরিকল্পনা সময় সাপেক্ষ। বাড়ির চিত্র কেমন? কী কী সুযোগ-সুবিধা আছে? বাড়ির বাইরে নাকি ভেতরে? কেমন বাজেট প্রয়োজন? সন্তানের খেলার ধরন কেমন? পছন্দের জায়গা বা ব্যক্তিত্ব কেমন? বয়স কত? শিশুর বিকাশ স্বাভাবিক গতিতে হচ্ছে কিনা; এগুলো নিয়েও চিন্তা করতে হয়।
শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে থেকেই অভিভাবক যদি নানা রকমের বই পড়েন, বিকাশ নিয়ে ভাবেন, শেখেন তাহলে সময়ের সাথে বিষয়গুলো এতো জটিল বলে মনে হয় না! অভিভাবক হওয়া মানে কেবল সন্তান জন্ম দেওয়া যে নয় সেটা আমরা জানি। কিন্তু চর্চার জায়গায় আরও ভাবার সুযোগ আমাদের তৈরি করতে হবে।
দেখুন, নির্মাণমুখী খেলা বেশ কিছু বিষয় নিশ্চিত করে। ১. এ খেলা শিশুদের অনুসন্ধিৎসু করে, ২. শিশু কিছু বানিয়ে তৈরি করতে শেখে, ৩. নির্মাণমুখী খেলা একেবারেই মুক্ত! কোন বাঁধাধরা নিয়ম সেখানে থাকে না, ৪. শিশুকে চিন্তা করে সমস্যা সমাধান করতে শেখায়, ৫. শিশুর মধ্যে কোনকিছু নিয়ে ভাবনা ও নির্মাণ সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, ৬. শিশুর কল্পনার জায়গা আরও শানিত হয় ও ৭. সময়ের সাথে সৃজনশীল হয়ে ওঠে।
বিশ্বজুড়ে এখন খেলা মানেই শেখা। সময়ের সাথে এই ধারণা এখন শিক্ষানীতির অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কানাডা, সিংগাপুর, নিউ জিল্যান্ড ও ফিনল্যান্ড সহ নানা দেশে। দেশগুলোতে খেলার ধরন, শিক্ষাগত লক্ষ্য, শিক্ষকের ভূমিকা, শিক্ষা পরিবেশ ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণসহ নানাভাবে স্কুলে খেলাধুলাভিত্তিক শিক্ষণ নিয়ে কাজ হচ্ছে। আমাদের দেশে বরাবরই পরিকল্পনার চেয়ে প্রায়োগিক দিকগুলো চ্যালেঞ্জ হয়ে থেকেছে এবং এখনও থাকছে!
এটি আসলে বৈশ্বিক লেন্সে স্কুলের চিত্র। বাড়ির চিত্র কেমন? অভিভাবকেরা কীভাবে খেলা নিয়ে ভাবেন? একটা ইতিবাচক দিক হল খেলার চমৎকার খোলা জায়গা উন্নত দেশগুলোতে আছে এবং একইসঙ্গে এই জায়গাগুলো কাজে লাগিয়ে শিশুদের জন্য খেলা নিয়ে চিন্তা করার মানুষও আছে! একইসঙ্গে যে কোন আইডিয়া প্রয়োগ করার জন্য আছে নানা দিক থেকে চমৎকার সুযোগ।
আমাদের দেশে শহরে কিছু মাঠ এখনও আছে। ঢাকা শহরের গুলশান, বনানী ও মিরপুর ডিওএইচ-সহ নানা স্থানে চমৎকার ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটির কনসেপ্ট নিয়ে পার্ক সাজানো হয়েছে। কোথাও কোথাও আছে বই কেনারও সুযোগ! গ্রামে এখনও খোলামেলা জায়গা আছে। চাইলে সেগুলোও চমৎকারভাবে কাজে লাগানো যায়! বরং শহরকে প্রকৃতির মাঝে টেনে আনার চেষ্টা চলে কিন্তু গ্রাম বাস করে প্রকৃতির বুকে!
দেখুন খেলার অসংখ্য আইডিয়া আছে। এগুলো খুঁজে কেবল কাজে লাগানো! কিনতে পারলেই সব কিছু কেনা সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই নয়! কিছু কেনা হোক আর কিছু হোক তৈরি! চাই চমৎকার ব্যাল্যান্স! সবকিছু প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমি সরকার বা রাষ্ট্রের উপরে দায় চাপিয়ে দেবো না! বরং বলবো অভিভাবকদের নিজেদেরই এই দায়িত্ব তুলে নিতে! নিজ নিজ দায়িত্ব বাড়িতে, মাঠে, কমিউনিটিতে আমরা চাইলেই শিশুর জন্য চমৎকার কিছু নির্মাণমুখী খেলার উপাদান রাখতেই পারি। আমার কাছে অসম্ভব বা কঠিন বলে মনে হচ্ছে না একেবারেই!
পরিশেষে বলতে চাই শিশু খেলবে এটা সবার আগে বোঝা, তার খেলা নিয়ে অভিভাবক হিসেবে পরিকল্পিতভাবে ভাবা এবং একইসঙ্গে শেখার ক্ষেত্রে নানা উপাদান ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া! একটুখানি সুযোগই বদলে দিতে পারে শিশুর ভবিষ্যৎ।