Published : 18 Apr 2026, 07:57 PM
আজ থেকে ৯৬ বছর আগের কথা। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল, শুক্রবার। সেদিন ছিল খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ‘গুড ফ্রাইডে’। কিন্তু পরাধীন ভারতের পুব আকাশে সেদিন অন্য এক সূর্যোদয়ের প্রস্তুতি চলছিল। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে একদল অসম সাহসী তরুণ পরিকল্পনা করেছিলেন দেশমাতৃকাকে ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার।
চট্টগ্রামের সেই সশস্ত্র অভ্যুত্থান কেবল একটি আক্রমণ ছিল না, তা ছিল সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এক মহাবিপ্লব। ১৮ এপ্রিল সকালে জেলা কংগ্রেস অফিসে বিপ্লবীরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে সর্বাধিনায়ক সূর্য সেনের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনায় মিলিত হন। মাস্টারদা ঘোষণা করেন- রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে শুরু হবে আক্রমণ। পরিকল্পনা ছিল সুনিপুণ, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা। মাস্টারদা ও নির্মল সেন গঠন করেন ‘বিপ্লবী কর্মী বাহিনী’।
এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। চারু বিকাশ দত্তের ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ বইয়ে ৬২ জন, অনন্ত সিংহের ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ’ বইয়ে ৬৪ জন এবং রমেশ চন্দ্র সেনের বর্ণনায় ৫৭ জনের কথা উল্লেখ আছে। তবে ভারত সম্রাট বনাম সূর্যসেনের ঐতিহাসিক মামলার রায়ে ৩৪ জন বিপ্লবীর নাম পাওয়া যায়, যারা সরাসরি অস্ত্রাগার দখল ও জালালাবাদ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।
রাত দশটা বাজতেই নিস্তব্ধ শহর কেঁপে ওঠে বিপ্লবীদের রণহুংকারে। নির্মল সেন ও লোকনাথ বলের নেতৃত্বে একটি দল রেলওয়ে অস্ত্রাগার এবং অনন্ত সিংহ ও গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে অন্য একটি দল পুলিশ অস্ত্রাগার আক্রমণ করে। অম্বিকা চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একটি দল টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস করে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
আক্রমণ এতটাই নিখুঁত ও আচমকা ছিল যে, ব্রিটিশ পুলিশ ও আমলারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা প্রাণের ভয়ে পরিবারসহ কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করা জাহাজে আশ্রয় নেয়। সিপাহি বিদ্রোহের পর চট্টগ্রামে এমন সংগঠিত সশস্ত্র অভ্যুত্থান আর দেখা যায়নি। ১৮ থেকে ২২ এপ্রিল, এই কয়েক দিন চট্টগ্রাম ছিল পুরোপুরি ব্রিটিশ শাসনমুক্ত।
২১ এপ্রিল রাত থেকেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে। বিপুল সামরিক শক্তি নিয়ে ব্রিটিশরা পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। মাস্টারদা বুঝলেন, সম্মুখ যুদ্ধের সময় সমাগত। তিনি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পাহাড়ি পথ বেছে নেন। ২২ এপ্রিল বিপ্লবীরা অবস্থান নেন জালালাবাদ পাহাড়ে।
মাস্টারদা ঘোষণা করলেন, “লোকনাথ, আজকের যুদ্ধের সেনাপতি তুমি।” লোকনাথ বলের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা পাহাড়ের দুই প্রান্তে অবস্থান নেন। সেনাপতির নির্দেশে কনিষ্ঠ বিপ্লবী টেগরা বল থেকে শুরু করে সবাই লড়াই শুরু করেন। জালালাবাদ পাহাড় সেদিন পরিণত হয়েছিল এক অগ্নিগর্ভ রণক্ষেত্রে। অনন্ত সিংহ পরে লিখেছিলেন, “বই পড়ে বা সিনেমা দেখে সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা ও বীরত্ব অনুধাবন করা অসম্ভব।”
যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি হলেও ১২ জন তরুণ বিপ্লবী বীরত্বের সঙ্গে লড়ে শহীদ হন। তারা হলেন: হরিগোপাল বল (টেগরা), প্রভাস বল, নরেশ রায়, ত্রিপুরা সেন, বিধু ভট্টাচার্য, মতি কানুনগো, শশাঙ্ক দত্ত, নির্মল লাল, জিতেন দাশগুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, পুলিন ঘোষ ও অর্ধেন্দু দস্তিদার। যুদ্ধ শেষে শহীদদের সারিবদ্ধ করে লোকনাথ বল তাদের ‘গার্ড অব অনার’ দেন। মাস্টারদা অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রতিটি শহীদের নাম উচ্চারণ করে শ্রদ্ধা জানান। ২৩ এপ্রিল সকালে ব্রিটিশ বাহিনী যখন মৃতদেহগুলো উদ্ধার করতে আসে, এই তরুণদের বীরত্ব দেখে তারাও সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানাতে বাধ্য হয়েছিল।
চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ কেবল ইতিহাস নয়, এটি ছিল দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার এই বিদ্রোহকে বিপ্লববাদের এক নতুন ও সার্থক প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার কবিতায় চট্টগ্রামকে আখ্যা দিয়েছেন ‘বীর চট্টগ্রাম’ হিসেবে।
১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহকে উপমহাদেশের ইতিহাসের ‘প্রথম এবং সবচেয়ে সুসংগঠিত সশস্ত্র’ ছাত্র-যুব বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর আগে বিভিন্ন জায়গায় বিপ্লবী কর্মকাণ্ড হলেও, এভাবে একটি নির্দিষ্ট এলাকাকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করে কয়েকদিনের জন্য স্বাধীন সরকার গঠন করার মতো সুসংগঠিত ‘যুব অভ্যুত্থান’ আর দেখা যায়নি। এই বিদ্রোহের মূল চালিকাশক্তিই ছিল স্কুল-কলেজের ছাত্র ও তরুণ সমাজ।