আমার ঘর ক্রমশ সমুদ্রসৈকতে পরিণত হলো, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তেই নতুন রূপে সে আমাকে অবাক করত।
Published : 05 Apr 2025, 02:57 PM
মেক্সিকোর কবি ও প্রাবন্ধিক অক্তাবিও পাস (১৯১৪-১৯৯৮)। জন্ম মেক্সিকো সিটিতে। পাবলো নেরুদার উৎসাহে, পাস কিশোর বয়সেই সাহিত্যজীবন শুরু করেন। ওই বয়সে তিনি প্রথম কবিতা প্রকাশ করেন এবং ‘বারান্দাল’ নামে একটি পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। যৌবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনে সময় কাটান, মডার্নিস্ট এবং সুররিয়ালিস্ট আন্দোলনে প্রভাবিত হন। ১৯৬২ সালে তিনি ভারতে মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত হন এবং ছয় বছর পর মেক্সিকো সিটিতে ছাত্র আন্দোলনের দমনপীড়নে সরকারি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন।
পাসের উল্লেখযোগ্য কবিতা সংকলনগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘পিয়েদ্রা দে সোল’ (১৯৫৭) এবং ‘অ্যাগুইলা ও সোল’ (১৯৫১)। তার কাজ মেক্সিকোর ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতীয় পরিচিতির গভীর বিশ্লেষণ ও চিত্র তুলে ধরে। ১৯৯০ সালে পাস সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তার ‘মি বিধা কন লা ওলা’ শিরোনামে এ গল্পটি মূল স্প্যানিশ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন প্রখ্যাত অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক এলিয়ট ওয়াইনবেরগার। সেখান থেকে এটি বাংলায় অনূদিত হলো।
আমি যখন সেই বিশাল সমুদ্র ছেড়ে আসছিলাম, তখন দেখলাম একটি ঢেউ অন্যদের চেয়ে একটু বেশি এগিয়ে আসছে। দীর্ঘ ও হালকা, যেন বাতাসের স্পর্শে উড়ছে। অন্য ঢেউগুলো যখন তাকে টেনে ধরে রাখতে চাইছে, তখন সে আমার হাত আঁকড়ে ধরল।
আমি অবাক হয়ে গেলাম, কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না। আমি চাইনি তাকে লজ্জায় ফেলতে, তার বন্ধুদের সামনে সে যেন বিব্রত না হয়। তাছাড়া, বিশাল ঢেউগুলোর রূঢ় দৃষ্টিও আমাকে থমকে দিয়েছিল। অনুভব করলাম, এই ঢেউটি অন্যদের চেয়ে আলাদা।
শহরে পৌঁছে আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, এভাবে আমার সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। সে যা ভাবছে, শহরের জীবন তার চেয়ে অনেক আলাদা। গম্ভীর দৃষ্টিতে সে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আমার কথা বুঝতে চাইছে, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছে না। আমি তাকে বললাম, “তুমি তোমার প্রকৃত স্থান ছেড়ে এসেছ, এখানে তুমি টিকতে পারবে না।”
কিন্তু সে মাথা নাড়ল, “না, আমি আর ফিরে যাব না।” আমি তাকে বোঝানোর জন্য কোমল, কঠোর, তাচ্ছিল্য— সবকিছু ব্যবহার করলাম, কিন্তু কিছুই কাজে এল না। সে কাঁদল, চিৎকার করল, জড়িয়ে ধরল, এমনকি হুমকি দিল। আমি বুঝতে পারলাম, সে সত্যিই ফিরে যেতে চায় না। শেষে আমাকে ক্ষমা চাইতে হলো, কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম, সে অনুভূতির গভীরতায় আমার চেয়ে অনেক বেশি প্রবল।
পরদিন থেকেই শুরু হলো আমার দুঃসময়। কীভাবে তাকে নিয়ে শহরের মধ্যে চলাফেরা করব? ট্রেনে উঠব কীভাবে? কোথায় তাকে রাখব? এমন কোনো আইন নেই যে ঢেউ পরিবহন নিষিদ্ধ, কিন্তু সমাজের চোখে এটা অপরাধের চেয়ে কম নয়। আমি গভীর চিন্তায় পড়ে গেলাম। অবশেষে, ট্রেন স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই একটা জগ খালি করে ফেললাম এবং সতর্কতার সঙ্গে তাকে সেখানে ঢেলে দিলাম।
প্রথম সমস্যা দেখা দিল, যখন এক শিশু সেখানে পানি খেতে এল। আমি দ্রুত অন্যকিছু পানীয় দিতে চাইলাম, কিন্তু তার মা জগের পানি ঢালতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি চমকে উঠে চিৎকার করে বললেন, “আহ! এই পানি লবণাক্ত কেন?” চারদিকে হইচই শুরু হয়ে গেল। মানুষ ছুটে এলো, একজন কন্ডাক্টর এলো, তারপর ইন্সপেক্টর, এমনকি পুলিশও হাজির হলো। অবশেষে আমাকে বিষপ্রয়োগের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হলো। আমার মাথার ভেতর তখন শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল— আমি কি সত্যিই এত বড় ভুল করেছি?
আমি কারাগারে দিন গুনতে লাগলাম। কেউ আমার কথা বিশ্বাস করল না। যখন আদালতে হাজির হলাম, বিচারক বললেন, “তোমার অপরাধ গুরুতর, তবে যেহেতু এতে কারও ক্ষতি হয়নি, তোমার শাস্তি কম হবে।” কিছুদিন পর আমি মুক্তি পেলাম, কিন্তু আমার মন ভারাক্রান্ত ছিল। আমি জানতাম না, আমার ঢেউ কী অবস্থায় আছে। সে কি আমাকে ভুল বুঝবে? সে কি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?
আমি যখন বাড়ি ফিরে এলাম, দরজার সামনে অদ্ভুত এক হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। আমি চমকে উঠলাম। দরজা খুলেই দেখলাম, আমার ঢেউ হাসছে, গান গাইছে, আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি হতবাক হয়ে বললাম, “তুমি ফিরে এলে কীভাবে?” সে খিলখিল করে হেসে বলল, “এ তো সহজ! ইঞ্জিনে ফেলে দিয়েছিল, আমি বাষ্প হয়ে গেলাম, তারপর বৃষ্টি হয়ে আবার নেমে এলাম!”
আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম, তার এই রূপান্তরের ক্ষমতা দেখে। তার উপস্থিতি আমার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিল। আমার ঘর এক অনন্য সৌন্দর্যে ভরে উঠল। সে যেন কেবল এক ঢেউ নয়, বিশাল সমুদ্রের এক প্রতিনিধি। কখনো সে শান্ত ও কোমল, কখনো উচ্ছল ও বন্য। আমি যখন তাকে আলিঙ্গন করতাম, সে প্রসারিত হয়ে আকাশ ছুঁত, আবার মুহূর্তেই সাদা ফেনায় পরিণত হতো। আমাদের প্রেম যেন এক অনিঃশেষ সৃষ্টি, এক চিরন্তন খেলা।
আমার ঘর ক্রমশ সমুদ্রসৈকতে পরিণত হলো, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তেই নতুন রূপে সে আমাকে অবাক করত। আমরা একসঙ্গে হাসতাম, খেলতাম। সে আমার চারপাশে ঘূর্ণি তৈরি করত, আমাকে এক অদ্ভুত আনন্দের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যেত। কখনো সে নীরব থাকত, গভীর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত, যেন তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা রহস্য আমাকে বোঝাতে চায়।
কিন্তু আমি কখনো তার অন্তরে পৌঁছাতে পারিনি। তার অস্তিত্ব যেন এক বিশাল চক্রবাকের মতো, যার কেন্দ্রে শুধু শূন্যতা। সে আমাকে বহুদূর বিস্তৃত স্পন্দনে ছড়িয়ে দিত, কিন্তু আমি তার আসল রূপ বুঝতে পারিনি।
এরপর এক সময় সে একাকিত্ব অনুভব করতে লাগল। আমি তাকে আনন্দ দিতে ঘর ভরে দিলাম ঝিনুক আর ছোট ছোট নৌকা দিয়ে। কিন্তু কিছুতেই তার একাকিত্ব কাটল না। তখন আমি তাকে সঙ্গ দিতে মাছ নিয়ে এলাম। কিছু মাছ ছিল ভয়ঙ্কর ও হিংস্র। অদ্ভুতভাবে সে তাদের ভালোবাসতে শুরু করল। আমি সহ্য করতে না পেরে তাদের সরাতে চাইলাম, কিন্তু সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। তখনই আমি বুঝলাম, আমি তাকে আর ভালোবাসতে পারছি না।
আমি পুরনো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করতে শুরু করলাম। এক পুরনো বান্ধবীকে গোপনে সব বললাম। সে আমাকে সাহায্য করতে চাইল, কিন্তু সে কি পারবে এমন এক সত্তার বিরুদ্ধে, যা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে? সে কি পারবে এমন এক ঢেউয়ের বিরুদ্ধে, যার কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি নেই?
শীত এলো। সে নিস্তব্ধ, শীতল আর অন্ধকার হয়ে উঠল। রাতে ক্রমাগত চিৎকার করত। আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। দিনের পর দিন আমার জীবন যেন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। একদিন আমি পালিয়ে গেলাম পাহাড়ে। সেখানে গিয়ে আমি মুক্তির স্বাদ পেলাম, ঠান্ডা বাতাসে নিশ্বাস নিলাম।
মাসখানেক পর ফিরে এসে দেখলাম, সে বরফ হয়ে গেছে। বিন্দুমাত্র দুঃখ অনুভব করলাম না। আমি বুঝতে পারলাম, আমার জন্য তার আর কোনো প্রয়োজন নেই। আমি একটি বড় বস্তায় তাকে ভরে নিয়ে এক রেস্তোরাঁর ওয়েটারের কাছে বিক্রি করে দিলাম। সে বরফ টুকরো করে কাটল এবং বোতল ঠান্ডা রাখার জন্য ব্যবহার করল।
আমি আর ফিরে তাকাইনি। আমার জীবনের সেই অধ্যায় সেদিনই শেষ হয়ে গেল।