Published : 16 May 2026, 01:48 PM
হামে চারশতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের দায় এড়ানোর সু্যোগ দেখছে না চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট।
শতভাগ শিশুকে হামের টিকার আওতায় নিয়ে আসা, শিশুদের নিয়মিত ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো, আক্রান্তদের সরকারি খরচে চিকিৎসাসহ গাফিলতির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে সংগঠনটির তরফে।
শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ সংকট থেকে উত্তরণে সংগঠনটি ১৫ দফা দাবি তুলে ধরে।
সংগঠনের সভাপতি শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে ‘হামে শিশুমৃত্যু: জনস্বাস্থ্য সংকট ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. এম এইচফারূকী।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, “সম্প্রতি ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ক্রয় সংক্রান্ত জটিলতার কারণে টিকার ঘাটতি, রোগ নজরদারির প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্ব, জনগোষ্ঠীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে না পারাই বর্তমান হাম প্রাদুর্ভাব ও এ সংক্রান্ত শিশু মৃত্যুর মূল কারণ।
“সুতরাং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের কারো এ মৃত্যুর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।”
ডা. এম এইচ ফারূকী বলেন, “আমরা জানি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করায় রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা এ বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ অর্থ বরাদ্দ করেনি।
“সুতরাং আমরা মনে করি, আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭ থেকেই স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।”
গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ও হামের লক্ষণ নিয়ে ৪৫১ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে ৭৪ জন এবং হামের লক্ষণ নিয়ে ৩৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
বাংলাদেশে সাধারণত ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সের শিশুরাই হামে আক্রান্ত হয় বলে মন্তব্য করে ডা. ফারূকী বলেন, “সঠিক সময়ে ও সঠিক মাত্রায় টিকা নেওয়া থাকলে সেসব শিশুদের এ রোগে সংক্রামিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম এবং আক্রান্ত হলেও তা মারাত্মক আকার ধারণ করে না।
“সুতরাং সময়মত টিকা দেওয়ার ঘাটতিই এ সংকটের জন্য দায়ী- যা টিকা ক্রয় ও মজুদের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যার্থতার করণে ঘটেছে বলেই বিভিন্ন তথ্য থেকে উঠে এসেছে।”
অন্তর্বর্তী সরকার শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো বন্ধ করে দেওয়ায় হামে মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ করেন ডা. ফারূকী।
তিনি বলেন, “হামের কারণে শরীরে যে সকল সমস্যা দেখা দেয় তার প্রতিরোধে ভিটামিন এ খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
“পূর্বে সরকারের কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সের শিশুদের ৬ মাস অন্তর ভিটামিন এ খাওয়ানো হতো। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ কর্মসূচিটিও বন্ধ হওয়ায় হামের কারণে মৃত্যুঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।”
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য উল্লেখ করে ডা. ফারূকী বলেন, “চতুর্থ ধাপের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম (এইচএনপিএসপি) শেষ হয় ২০২৪ এর জুনে। পঞ্চম ধাপের কার্যক্রমের প্রস্তুতি চললেও নানা কারণ দেখিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়ের যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই সেটি বাতিল করে এবং ২ বছরের একটি কর্মসূচি হাতে নেয়।
“কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর আর টিকার জন্য অর্থ বরাদ্দ ছাড় করা হয়নি। ফলে টিকা ক্রয়ের পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে টিকা ক্রয় ও মজুদে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়।”
হামে মৃত্যুর হার কমাতে হাসপাতালগুলোতে চালু থাকা আইসিইউয়ের একটি অংশ শিশুদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া, আইসিইউয়ের আগের পর্যায়ে থাকা রোগীদের হাই ফ্লো অক্সিজেন সরবরাহ এবং লক্ষণ দেখা দেওয়া রোগীর সঙ্গরোধের পরামর্শ দেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন।
তিনি বলেন, “যাদের আইসিইউ প্রয়োজন, এখন তাদের সবাইকে আইসিইউ দিতে হবে। সরকারি হাসপাতালের আইসিইউগুলোকে শিশুর উপযোগী মডিফাই করা যায়। আপনি আইসিউউর সংখ্যা যদি বাড়ান, মেকানিক্যালি বাড়াতে পারেন। আইসিইউ চালাবার মত লোক বাড়াতে পারবেন না। ওটা জন্ম দেওয়া যায় না দ্রুত।
"তাহলে যেখানে আইসিইউ চালু আছে, সেখান থেকে একটা ভাগ শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড করতে হবে এবং বেসরকারি হাসপাতালে এনআইসিইউ, বেসরকারি শিশু ক্লিনিক আছে, হাসপাতাল আছে-সেগুলোকে সরকার অধিগ্রহণ করতে পারে জরুরি জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতির কারণে।"
মুশতাক হোসেন বলেন, “আইসিইউর পূর্ব পর্যায়ে যারা আছে, তাদেরকে আমরা হাই ফ্লো অক্সিজেন দেব। হাই ফ্লো অক্সিজেন দিয়ে আমরা কোভিডের সময় অনেক রোগীকে বাঁচিয়েছি।
“মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আমাদের চিকিৎসকরা তারা কম খরচে কীভাবে হাইফ্লো অক্সিজেন দেওয়া যায়, সেটা তারা বের করেছেন এবং তারা বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের উদ্যোগে এটা বিতরণ করেছে।”
হাম প্রতিরোধে সমাজভিত্তিক পদক্ষেপ নিলে মৃতুহার দ্রুত কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে ১৫ দফা দাবি তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে রয়েছে-
>>চলমান গণটিকাদান কর্মসূচি সারাদেশে জোরদার করে দেশের প্রায় শতভাগ শিশুকে পূর্ণমাত্রায় টিকার আওতায় আসা।
>>সব সরকারি হাসপাতালে ‘হাম কর্নার’ চালু এবং প্রয়োজনীয় ঔষধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা।
>>৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের ৬ মাস অন্তর নিয়মিত ভিটামিন-এ খাওয়ানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
>>প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের সম্পূর্ণ সরকারি খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং তাদের পরিবারকে উপযুক্ত সামাজিক সহায়তা দেওয়া।
>>যারা এ গাফিলতির জন্য দায়ী তাদেরকে চিহ্নিত করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং তাদের শান্তির আওতায় আনা।
>>রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে টিকা উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং টিকা উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
>>গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও উপজেলা হাসপাতাল থেকে জনস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া এবং শহর এলাকাতেও ওয়ার্ডভিত্তিক এ ধরণের কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা।
>>ইপিআই কার্যক্রমের আওতায় টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য অন্যান্য রোগের টিকার ঘাটতি দ্রুত নিরসন করা।
>>ছয়টি বিভাগে নির্মিত শিশু হাসপাতালগুলো দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা।
>>জরুরিভিত্তিতে স্বাস্থ্যখাতের শূন্যপদে নিয়োগ দেওয়া।
>>মাঠ পর্যায়ে টিকা বহনকারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং নিয়মিতকরণ করা।
>>স্বাস্থ্যকে 'জনগণের মৌলিক অধিকার' হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং আইন ও বিধি দ্বারা তা নিশ্চিত করা।
>> জনস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মূল ভিত্তি ধরে ‘জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি’ প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করা।
>> জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ ও জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দেওয়া এবং বরাদ্দ দেওয়া টাকার দুর্নীতিমুক্ত ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
>>উপজেলা হাসপাতাল ১০০ শয্যায় এবং সব জেলা হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নীত করতে হবে এবং এ সকল হাসপাতালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী শয্যা অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ দেওয়া। সেই সঙ্গে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জোগাড় ও চালু রাখার ব্যবস্থা করা।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ডা. সারওয়ার ইবনে সালামের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন, ডা. লেনিন চৌধুরী, ডা. কাজী রকিবুল ইসলাম, ডা. আবু সাইদ।