Published : 17 May 2026, 11:32 PM
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে প্রতিনিয়ত শিশু মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছেন ঢাকায় ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
বুধবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেছেন, টিকার ঘাটতি নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছেন তারা এবং বৈঠক হয়েছে অন্তত ১০টি।
বাংলাদেশে টিকার ‘আসন্ন ঘাটতির’ কথা তুলে ধরে জাতীয় নির্বাচনের দুদিন আগে ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে যে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন রানা ফ্লাওয়ার্স, তা নিয়ে ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে এই চিঠি পাঠানো হলেও এমন চিঠি সেটিই প্রথম ছিল না বলে বুধবার দাবি করেছেন ইউনিসেফ প্রতিনিধি।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এ সংবাদ সম্মেলনে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “আমার সামনে হয়ত সবগুলো তারিখ এখন নেই এবং আমার ধারণা, সেটা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তবে আমি জানি ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ কি ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছি।

“এই চিঠিটি গেছে এই আশায় যে, নতুন সরকারের যিনি ওই পদে আসবেন, তিনি যেন চিঠিটি তার ডেস্কে পেয়ে যান। এরপর আমরা জানতে চেয়েছি এবং বৈঠক করতে চেয়েছি।”
তার দাবি, টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তত ১০টি বৈঠক হয়েছে তার।
“বলেছি, ‘আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখুন, আমি চিন্তিত যে, আপনারা ঘাটতিতে পড়তে যাচ্ছেন’।”
মার্চের মাঝামাঝি থেকে দেশে হামে ও হামের লক্ষণ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। হামের প্রকোপ ছড়িয়েছে দেশজুড়ে। হঠাৎ করে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে টিকার সংকটের বিষয়টি সামনে এলে সমালোচনা শুরু হয়।

মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের সময় টিকা সংগ্রহ না করার অভিযোগ ওঠার মধ্যে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও হয়েছে।
২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় টিকা আনত সরকার। এতে অর্থায়ানের মূল উৎস ছিল দাতাদের সহায়তা। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে এটাকে রাজস্ব বাজেটের খরচের আওতায় এনে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার পথে এগোয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তবর্তী সরকার।
এছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার বিরূপ পরিস্থিতি এবং টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের কারণেও টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যখন অন্তর্বর্তী সরকার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই মূলত দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। মার্চ মাসে গিয়ে হামের রোগী বাড়ার ফলে টিকা কার্যক্রম ঠিকমত না চলার বিষয়টি সামনে আসে।
টিকা কেনার প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে দেশে যে টিকার ঘাটতি আসন্ন, সে বিষয়টি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে লেখা চিঠিতে তুলে ধরেন ঢাকায় ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
চিঠিতে তিনি লেখেন, হাম-রুবেলার এমআর৫ টিকার সময়সীমা ৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে গেছে। পোলিওর ‘বিওপিভি’, টিটেনাস ও ডিপথেরিয়া (টিডি) এবং যক্ষ্মার বিসিজি টিকার সময়মীমা যথাক্রমে ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২২ ফেব্রুয়ারি এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হতে যাচ্ছে।

“সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তা নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে শিশুদের নির্দিষ্ট সময়ে টিকা নেওয়া ব্যাহত হয়। এছাড়া টিকায় প্রতিরোধ করা যায়, এমন রোগ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।”
এ চিঠির খবর সামনে এলে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ঠিকমত টিকা সংগ্রহ না করার সমালোচনা ও বিক্ষোভ বাড়তে থাকে।
হামে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের দায় এড়ানোর সুযোগ না দেখার কথা বলেছে চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’।
গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত হাম ও হামের লক্ষণ নিয়ে দেশে ৪৫১ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরমধ্যে হামে মৃত্যু হয় ৭৪ জনের।
এমন প্রেক্ষাপটে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে এসে রানা ফ্লাওয়ার্স নতুন সরকার আসার পর নেওয়া পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি, যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং অন্য অংশীদারদের সহযোগিতায় জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার।
ইউনিসেফ প্রতিনিধি বলেন, ৩০টি উচ্চ-ঝুঁকির উপজেলায় ৫ এপ্রিল জরুরি টিকা অভিযান শুরু হয় এবং যেটাকে পরে জাতীয় হাম কর্মসূচি হিসেবে বাড়ানো হয়। ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এ কার্যক্রম গত ১০ মে শতভাগের কাছে পৌঁছতে পেরেছে।

জরুরিভিত্তিতে এনে শিশুদের টিকা দিয়ে দেওয়ার পর হামের ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা গেছে বলে তুলে ধরেন তিনি।
শুধু টিকা কিনতে না পারায় হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি বলে মন্তব্য করে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “এটাকে বড় রকমের বিপর্যয়ের মত মনে হয়েছে এবং যার শেষটা হয়েছে টিকা কিনতে না পারায়। সুতরাং টিকা কিনতে না পারার কারণে প্রাদুর্ভাব হয়েছে তা না।
“বাংলাদেশে ঘটতে থাকা বিভিন্ন কারণে এটা হয়েছে। তবে আমাদেরকে সঠিক পর্যালোচনার দিকে তাকাতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এটা ভবিষ্যতে না ঘটে।”
হামের প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্তের ঘোষণাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তিনি। ইউনিসেফের তরফে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে সহায়তার আশ্বাসও দেন তিনি।
তিনি বলেন, “তদন্ত চালিয়ে নেওয়া প্রয়োজন এবং স্বচ্ছভাবে করা প্রয়োজন। যাতে কিছু সিদ্ধান্তের কী যুক্তি কাজ করেছে, তা বেরিয়ে আসে।”

তদন্তে সহায়তার বিষয়ে আরেক প্রশ্নে ইউনিসেফ প্রতিনিধি বলেন, “আমরা সত্যটা দিয়ে সহায়তা করব এবং সত্যের প্রমাণসহ। যেভাবে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছিল, সেভাবেই এটা দিব আমরা।”
প্রতি বছরই কিছু না কিছু হামের রোগী থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৯ সালে সংখ্যাটা অনেক বেড়েছিল। এতে বোঝা যায়, শিশুদের অনেকে টিকা পায়নি এবং সে কারণে সরকার বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে থাকে। তবে নিয়মিত টিকা কার্যক্রমকে ভালোমত এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই ইউনিসেফের লক্ষ্য।
টিকা সংকট হওয়ার বিষয়ে তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, ইউনিসেফের সরবরাহ বিভাগকে গত বছর ৫০ শতাংশ টিকা কিনতে বলা হয়েছিল। দেশ কি টিকার ঘাটতিতে পড়েছিল? হ্যাঁ। তবে, সেই মাত্রায় নয়, কেননা ৫০ শতাংশ এসেছিল।

“আর ভিটামিন-এ টিকাও ৫০ শতাংশ আনা হয়েছিল গতবছর। এটাও শেষ হয়ে যেতে পারত। ঘাটতি হতে পারে, এই পূর্বাভাস আমরা ২০২৪ সালে দিয়েছিলাম। অন্যান্য টিকার সময় ঠিক করা ছিল এবং ২০২৫ ও ২০২৬ সালে এসে প্রভাব পড়ত। সুতরাং আমরা আগেই সতর্ক করছিলাম এবং প্রতিনিয়িত স্মরণ করাচ্ছিলাম, আপনারা সংকটে পড়তে যাচ্ছেন।”
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ২০২৫ সালের অগাস্টে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক বৈঠকে ‘টিকার ঘাটতি এবং সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব’ নিয়ে সতর্ক করেছিলেন ইউনিসেফের উপ-নির্বাহী পরিচালক টেড শাইবান।
তিনি বলেন, “ওই পর্যায়ে এটা ছিল এই রকম যে, আপনি ঘাটতি মোকাবেলা করছে এবং তার মানে হচ্ছে, আপনি সম্ভাব্য বড় আকারের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হবে। কেননা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা অবস্থা প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করার মত নয় এবং সেটাই আমরা দেখেছি।”
আরও পড়ুন-
টিকার সংকট 'আসন্ন': অন্তর্বর্তী সরকারকে যা বলেছিল ইউনিসেফ
টিকার ঘাটতি নিয়ে ইউনূস সরকারকে 'বহুবার' সতর্ক করা হয়েছে: ইউনিসেফ