বাংলাভাষীদের জন্য নয়, জেকে ৭১ একটি আন্তর্জাতিক সিনেমা: ফাখরুল আরেফিন

ফাখরুল আরেফীন খান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই চলচ্চিত্র আন্দোলনে সক্রিয়। তখনই চলচ্চিত্র নির্মাণের কলাকৌশল শেখেন তারেক মাসুদের কাছ থেকে। তারপর বাউল সাধক লালন সাঁইয়ের জীবনী নিয়ে তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘হকের ঘর’। আরও কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে হাত মকশো করার পর হাত দেন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার প্রথম সিনেমা মুক্তি পায় ২০১৭ সালে। তা সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘ভূবন মাঝি’। দ্বিতীয় সিনেমা গণ্ডি মুক্তি পায় ২০২০ সালে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে আসছে এই নির্মাতার তৃতীয় চলচ্চিত্র ‘জেকে-৭১’। একাত্তরের বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে দুঃসাহসী এক প্রয়াসের নায়ক জ্যঁ কুয়েকে নিয়ে এই সিনেমা। বাংলাদেশিদের নতুন করে চেনাবে প্রায় বিস্মৃত এই ফরাসিকে। গ্লিটজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই সিনেমা নির্মাণের পূর্বাপর নিয়ে কথা বলেছেন ফাখরুল আরেফিন। তিনি বললেন, শুধু বাংলাভাষীদের লক্ষ্য করে এই সিনেমাটি বানাননি তিনি, চেষ্টা করেছেন একটি আন্তর্জাতিক সিনেমা বানাতে।

মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Jan 2023, 03:57 AM
Updated : 22 Jan 2023, 03:57 AM

জেকে-৭১ এর গল্প অনেকেরই জানা। তারপরও যদি গল্পটা নিয়ে জানতে চাই।

এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের খুব ব্যতিক্রমী, অথচ কম আলোচিত একটি ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জ্যঁ ইউজিন পল ক্যুয়ে নামের এক ফরাসি যুবক পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান হাইজ্যাক করে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি তোলেন, ওই বিমানে করে ২০ টন ওষুধ ও ত্রাণ সামগ্রী পাঠাতে হবে কলকাতায়, বাংলাদেশ শরণার্থী শিবিরে। ওই ঘটনায় পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়া বাংলাদেশের শরণার্থী সংকট নিয়ে সরব হয়। ঘটনাটা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এবং বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখে। হাজার হাজার মাইল দূরের এক যুবকের বাংলার মানুষের জন্য ভালোবাসা ও দুঃসাহসিক কর্ম তুলে ধরে জ্যঁ কুয়েকে বাংলায় আবার নিয়ে আসাই সিনেমার গল্প ও উদ্দেশ্য।  

ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধন হয়েছে ‘জেকে-৭১’ নিয়ে। কেমন লাগছে?

সিনেমাটা নিয়ে খুব একটা হ্যাপি না। কারণ আমরা যখন সিনেমাটা বানাই তখন মহামারীর তাণ্ডব চলছিল। নানা বিধি-নিষেধের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল আমাদের। সিনেমা শেষে টিমের ২১ জনের কোভিড হয়েছিল। বৃষ্টিতে আমাদের সেট ডুবে গিয়েছিল। যে প্লেনটার ভেতরে সিনেমার বেশিরভাগ অংশের শুটিং, সেটাই ডুবে গিয়েছিল। আরও অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। সবকিছু মিলিয়ে পরিবেশগত, প্রাকৃতিক ও কারিগরি অনেক বাধা ডিঙ্গিয়ে সিনেমাটা বানানো। এসব কারণে গল্পটা যেভাবে দেখাতে চেয়েছিলাম পুরোপুরি সেটা পারিনি।

কাজ শুরু করে তো আবার বন্ধ রাখতে হয়েছিল?

হ্যাঁ। সিনেমা বানানোর জন্য যে টাকাটা পাওয়ার কথা ছিল, সেটা সময়মতো পাইনি। টাকার অভাবে অনেক দিন গ্যাপ দিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে হয়েছে। আমার ইচ্ছা ছিল ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি দেওয়ার। তাহলে বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তিতে মুক্তি দিতে পারতাম। সেটাও পারিনি। সব মিলিয়ে এই সিনেমাটাকে বিরাট সংগ্রামের ফসল বলা যায়।

বাজেট বেড়েও গেছে নিশ্চয়?

সব ক্ষেত্রে সিনেমা ঝুলে গেলে বাজেট বেড়ে যায়। আমার আরও কমাতে হয়েছে। বললাম না, সীমাবদ্ধতার শেষ নেই। সিনেমাটার পেছনে অনেক বড় বড় গল্প আছে। সেসব এখন বলা যাবে না। হয়ত কোনো একদিন বলব।

প্রদর্শনী শেষে দর্শক চোখে পানি মুখে হাসি আর তুমুল করতালিতে অবিভাদন জানিয়েছে। এত সীমাবদ্ধতার পরও এই প্রাপ্তি, কেমন লাগছে?

এটা আমার প্রাপ্তি না। পুরো প্রাপ্তিটাই ফরাসি যুবক জ্যঁ কুয়েরের। ৫১ বছর আগে সে বাংলাদেশিদের জন্য যা করেছে, হয়ত তারই প্রতিফলন সেদিন দর্শক দিয়েছেন। তাদের কাছে জ্যঁ কুয়ে ফিরে এসেছে বলেই এই ভালোলাগা প্রকাশ করেছে। আমি তাকে ফিরিয়ে আনতে সামান্য ভূমিকা রেখেছি মাত্র।

জ্যঁ কুয়ের পরবর্তী প্রজন্মের কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে? সিনেমাটা নির্মাণের ঘটনা তারা জানেন?

তিনি মারা গেছেন ২০১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর। তার তিন মেয়ে আছেন। তিন বোন তিন দেশে থাকেন। এখন পর্যন্ত তাদের খোঁজ পাইনি। তবে আমি চেষ্টা করছি। তার মেয়েদের খুঁজে বের করে সিনেমাটা দেখাতে পারলে ভালো লাগবে।

সিনেমার শেষে ক্রেডিট লাইনের সময় জ্যঁ কুয়ের ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। ওটা কি আসল ফুটেজ?

হ্যাঁ, ওটা ১৯৭১ সালে বিমান হাইজ্যাকের পরের

সিনেমায় মোট কয়টা ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে?

চারটা। ফ্রেঞ্চ, স্পেনিশ, ইংলিশ, উর্দু। একটা বিমানে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষি মানুষ ভ্রমণ করে। তাদের ভাব প্রকাশে চার ভাষা ব্যবহারের বিকল্প ছিল না।

শুধু বাংলাটা নেই। অথচ সিনেমাটা বাংলা ভাষার মানুষের জন্য বানানো হয়েছে।

বিমানে বাঙালি কেউ ছিল না। যার কারণে বাংলা ভাষার ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না। আর এই ছবিটা বাংলা ভাষার দর্শকদের জন্য বানাইনি আমি। এটা পরিষ্কার করতে চাই, জেকে-৭১ আন্তর্জাতিক ছবি। আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্যই আমি বানিয়েছি। ১৯৭১ একটি প্ল্যাটফর্ম। ঘটনাটা ঘটেছিল ৭১ কে কেন্দ্র করে। সাধারণভাবেই বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য সিনেমাটা আগ্রহের। কিন্তু এই ঘটনাটা আন্তর্জাতিক ছিল; সিনেমাটাও আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্যই বানানো।

একটা সিনেমায় চারটি ভাষা। সবগুলো ভাষাই গল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতগুলো ভাষা ব্যবহার করে সিনেমা বানানো একটা দুঃসাহস বলা যায়। কোন ভাবনাটা এই দুঃসাহসী পদক্ষেপ নিতে সাহস জোগাল?

আমার আসলে কিছু করার ছিল না। চরিত্রগুলোর এত মাল্টি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল, আমি যদি সিঙ্গেল ল্যাঙ্গুয়েজে যেতাম, ব্যাপারটা জগাখিচুড়ি হয়ে যেত। সবচেয়ে বড় কথা এই সিনেমার সৌন্দর্যই হলো মাল্টি ল্যাঙ্গুয়েজ। কারণ পাকিস্তানি যাত্রী ছিল ১৩ জন। দুজন ফ্রেঞ্চ, দুজন স্পেনিশ, এয়ার হোস্টেসরা পাকিস্তানি, কন্ট্রোল টাওয়ারে ইংরেজি আর ফ্রেঞ্চ ভাষাভাষী। যার যে ভাষা, তাকে সেটা বলতে দিতে হবে, আমার কাছে মনে হয়েছিল এটাই একটা ডাইমেনশন তৈরি করবে।  

চিত্রনাট্য করলেন কীভাবে?

প্রথমে বাংলায় চিত্রনাট্য করেছি। সেটাকে ইংরেজিতে নিয়েছি। এরপর যখন সংলাপ এসেছে, আমরা যার যার ভাষার সংলাপে চলে গেছি। পুরো সিনেমার কাজে চারজন অনুবাদক ছিলেন। তারা সবসময় শুটিং সেটে স্ট্যান্ডবাই ছিলেন।

জেকে-৭১ মুক্তি নিয়ে পরিকল্পনা কী?

আগামী ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাবে। বাংলাদেশে সিনেপ্লেক্সগুলোর বাইরে ১১টা হল ঠিক করেছি। প্রাথমিকভাবে এই ১১টা হলে মুক্তি পাবে। এরপর ধীরে ধীরে বাড়বে। কিন্তু একসঙ্গে অনেক হলে আমরা যাব না। অল্প অল্প করে আগাবো।

অল্প হলে দেওয়ার কারণ কী?

এটা বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র না। আমরা ধরেই নিচ্ছি সব মানুষের কাছে ছবিটা বোধগম্য হবে না। এজন্যই প্রথম সপ্তাহ দেখব। এরপর দর্শকের চাহিদা বুঝে দ্বিতীয় সপ্তাহে হল বাড়াব।

দেশের বাইরে?

দেশের বাইরে ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গে কথা চলছে। কী হয় না হয়, মার্চের দিকে দেখা যাবে।

ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। সব্যসাচী চক্রবর্তী ঘোষণা দিয়েছেন তিনি আর অভিনয় করবেন না। আপনার দুটি সিনেমায় তিনি কাজ করেছেন। আবার যদি নতুন কোনো গল্পে সব্যসাচীকে প্রয়োজন হয়, আপনি ডাকলে রাজি হবেন?

আমার বিশ্বাস রাজি হবেন।

তার সঙ্গে যোগাযোগটা কীভাবে হল?

আপনাদের সঙ্গে যেভাবে হয়েছে সেভাবেই। কাজের মাধ্যমে। আমি গণ্ডির গল্প নিয়ে তার কাছে গিয়েছিলাম। গল্প পড়ে রাজি হলেন। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে অদ্ভুত রসায়ন তৈরি হয়েছে আমাদের। সব্যসাচী আমাকে স্যার বলে ডাকেন, আমিও তাকে স্যার বলে ডাকি। তিনি আমাকে কখনও আপনি ছাড়া কথা বলেন না, আমি তো আপনিই বলব। তিনি আমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসেন। আমিও তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি।  

নতুন কী কাজ নিয়ে ভাবছেন?

দুটো স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করছি। একটা প্যারাসাইকোলজি; আরেকটা হিউম্যান ট্রাফিকিং তথা মানব পাচার নিয়ে। এরমধ্যে হিউম্যান ট্রাফিকিংটা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র, ইংরেজিতে হবে। প্যারাসাইকোলজিটা বাংলাদেশের জন্য। দুইটাতে দুইটা চমক থাকবে।

চমকের আভাসটা দেওয়া যাবে না?

দিলে তো চমক নষ্ট হয়ে যাবে। তারপরও ধরেন দুই চমকের এক চমক হলো, মুম্বাইয়ের মনোজ বাজপাইর মতো শিল্পী কাজ করবেন একটায়। এখনও নিশ্চিতভাবে বলছি না। হতে পারে।

চলচ্চিত্র আন্দোলন থেকে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে, এখন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানাচ্ছেন। আপনি কেন সিনেমা বানান?

এই প্রশ্ন নিজেকে বহুবার করেছি। এখনও উত্তরটা পাইনি। সম্ভবত আমার যা কিছু অভিজ্ঞতা, তা প্রকাশ করতেই সিনেমা বানাই। আমি যেহেতু লিখতে পারি না, বলতেও পারি না। তারেক মাসুদ এটাই শিখিয়ে দিয়েছেন, এটাই পারি। যে টুকু শিখিয়েছেন, সেটুকু দিয়ে এই কাজটাই করছি।

বাংলাদেশে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার ভবিষ্যৎ কী? ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার সিদ্ধান্তটাই বা কতটা যৌক্তিক?

আসলে এটা আমার ক্যারিয়ার না, প্যাশন। সিনেমাকে কখনোই ক্যারিয়ার হিসেবে নেইনি। আমি দীর্ঘদিন চাকরি করেছি। ক্যারিয়ার শুরু করেছি সাংবাদিক হিসেবে। তবে হ্যাঁ বাংলাদেশে এখন সিনেমা নির্মাণকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার সুযোগ এসেছে। আমাদের সময় এটা ক্যারিয়ার ছিল না। আমরা যখন সিনেমা বানানো শুরু করি, ২০০০ সালে, তখন সিনেমা বানানো অনেক কঠিন ছিল। ধার-দেনা করে কাজ করতে হত।

চলচ্চিত্রে দুইটা ধারা দাঁড়িয়ে গেছে। একটাকে বলা হচ্ছে স্বাধীন ধারা, আরেকটা বাণিজ্যিক ধারা। এই বিভাজনকে কীভাবে দেখেন?

বিভাজন তো ভালোই। পদ্মা-যমুনা, দুইটা নদীর পানিই তো মেশে না। মাঝখানে লাইন থেকে যায়। অথচ দুইটাই পানি। ভাগ না হওয়াই ভালো। থাকুক যার মতো সে, দুইটাই তো সিনেমা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক