০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘আবার আসবেন, গানওলা’

কবীর সুমন গাইলেন। হাসালেন, কাঁদালেন, ভাবালেন। বিদায় বেলায় বললেন, “আর কদিনই বা আছি। ৭৩ বছরের বুড়ো মানুষ।”

মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 22 Oct 2022, 01:34 AM

Updated : 14 Dec 2022, 07:24 PM

গান গাইতে হল না। কিবোর্ডে তিনি আঙুল ছোঁয়ালেন, টুংটাং শব্দেই দর্শক কণ্ঠ সুরে-বেসুরে ভাসল - ‘তোমাকে চাই, তোমাকে চাই, তোমাকে চাই’। 

কয়েক কলি তিনিও গাইলেন। ‘প্রথমত আমি তোমাকে চাই, দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই, তৃতীয়ত আমি তোমাকে চাই, শেষ পর্যন্ত তোমাকে চাই।’ 

আরেকটু গেয়ে থেমে গেলেন। বললেন, “কথা ভুলে গেছি।”

সাত-আটশ দর্শক ‘কথা চালিয়ে’ নেওয়ার দায়িত্ব গলায় তুলে নিলেন। গানওলার গলা চলছে না, তবে আঙুল থামছে না। দর্শক গাইছে, বাজাচ্ছেন কবীর সুমন। 

মাঝে মাঝে অবশ্য কেরাসে সঙ্গ দিচ্ছেন। গান চলছে- ‘অধিকার বুঝে নেয়া প্রখর দাবিতে, সারারাত জেগে আঁকা লড়াকু ছবিতে, ছিপছিপে কবিতার ছন্দে ভাষায়, গদ্যের যুক্তিতে বাঁচার আশায়... বিক্ষোভে বিপ্লবে তোমাকে চাই...।’

গানের শেষ টানটা দিতে দিতে ভোটে জেতা নেতার মত দুই হাত উঁচু করলেন সুমন। বিহ্বলতা কাটিয়ে দর্শক তখন করতালির জোয়ার বইয়ে দিয়েছে। 

সুমন দাঁড়ালেন। দাঁড়ালেন মিলনায়তনে উপস্থিত প্রতিটি দর্শক। তাদের তালিতেও ছন্দ ভর করল যেন। 

পেছনের দর্শক স্লোগানের ছন্দে ডাকতে থাকলেন। ‘সুমন/ সুমন/ সুমন।’ তিনি উড়ন্ত চুম্বন ছুড়লেন দর্শকের উদ্দেশে। বললেন, “দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। ভীষণ ভালো থাকবেন।” 

তালি থামতে চায় না। চলল সুমনের প্রস্থান অবধি। তার আগে বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে রাত প্রায় ৮টা পর্যন্ত গান গল্পে মাতিয়ে রাখলেন দর্শকদের। হাসালেন, কাঁদালেন, ভাবালেন। 

শুক্রবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে বসেছিল আধুনিক গানের আসর। শিল্পী একজন। কবীর সুমন। ‘তোমাকে চাই’ গানের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিনটি কনসার্টে গাইতে এক সপ্তাহের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন আধুনিক বাংলা গানের জনপ্রিয় এই ভারতীয় শিল্পী। 

১৫ নভেম্বর ছিল তার প্রথম কনসার্ট। সেদিনও ছিল আধুনিক গান। বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত একের পর এক শুনিয়ে গেছেন নিজের করা জনপ্রিয় সব গান।

দ্বিতীয় কনসার্ট ছিল বাংলা খেয়ালের। মঙ্গলবার একই সময়ে একই মঞ্চে শুনিয়েছিলেন খেয়াল। তবলা, স্বরমণ্ডল আর বেইজ গিটারে সুমনের খেয়াল দর্শকদের করে রাখে বেখেয়াল । সঙ্গে চলে স্বভাবসুলভ গল্প, দুষ্টুমি, দর্শন আর জীবনবোধের সব গল্প। চলে বাংলা খেয়ালের সংজ্ঞা, ইতিহাস, আকার-প্রকারের ক্লাস।

শুক্রবার শেষ দিনের পরিবেশনা শুরু করেন সাড়ে ৪টায়। প্রতিদিনের মতই গান-গল্পের আসর খুলে বসেন গানওলা।

জুড়লেন রাজনীতির আলাপ, “ওরা আমার হাতে পায়ে ধরে ভোটে দাঁড় করিয়ে দিল। এবার আর বনিবনা হল না। চলে এলাম।”

জানালেন ঘরের কথাও। বললেন, “আমার বাড়ির লোকেরা আনন্দে আছে। আমার তো ছেলে-মেয়ে নেই। কয়েকজন আছে যারা আমাকে ভালোবাসে। ওরা আমার বাড়িতে থাকে। আমার দেখাশোনা করে। উড়ে এসে জুড়ে বসেছে আর কি। আমি বাংলাদেশে এসেছি। আমাকে নিয়ে গণমাধ্যমে লেখা হচ্ছে। এর সবই ওরা পড়ে। আপনাদের লেখা পড়ে ওরা খুব কান্না-কাটি করছে। একজন আমাকে বলল, “আপনাকে নিয়ে এভাবেও তাহলে লেখা যায়?”  

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে ধন্যবাদ দিলেন সুমন। বললেন, “কতদিন আমাকে নিয়ে ভালো কথা শুনিনি। কলকাতায় আমাকে নিয়ে নানা আলাপ হয়। আমি কতটা মমতার, নকশাল ছিলাম কি না এসব নিয়ে আলাপ হয়। আপনদের একটি গণমাধ্যম আমাকে লিখেছেন উপমহাদেশের কি-বোর্ড লেজেন্ড। বিশ্বাস করেন, এ কথা কেউ কোনোদিন বলেনি।

“দক্ষিণ এশিয়ার লেজেন্ড কবীর সুমন– একথা বলতে বুকের পাটা লাগে। আমার দেশে আমি খুব সফট টার্গেট। আমাকে মেরে যদি ওরা সুখ পায়...।”

কথা শেষ না হতেই সুমন গানে চলে যান- ‘দিনটা আজকে অন্যরকম ছিল।’

গান থামিয়ে হঠাৎ বলে ওঠেন, “সামনে একজন কি-বোর্ড লেজেন্ড আছেন। ফুয়াদ নাসের বাবু। উনি আমার চেয়ে ঢের বড় মাপের।”

সামনে বসে থাকা বাবুর দিকে করজোড়ে নমস্কার জানিয়ে বললেন, “বাবু, ক্ষমা করে দেবেন।”  

দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী গান গাইব?’ কেউ একজন বলে উঠলেন, ‘চেনা দুঃখ’। তিনি যেন জানতেন এটাই কেউ শুনতে চাইবে। দর্শকের কথা শেষ হওয়ার আগেই শুরু করলেন- “চেনা দুঃখ, চেনা সুখ, চেনা চেনা হাসিমুখ, চেনা আলো, চেনা অন্ধকার; চেনা মাটি, চেনা পাড়া, চেনা পথে কড়া নাড়া, চেনা রাতে চেনা চিৎকার।”

এ গানের রেশ ধরেই গাইলেন, ‘হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে’, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা।’ এ গানের মাঝপথে থেমে বললেন, “গানটা আপনাদের দেশের কবি শহীদ কাদরীর লেখা কবিতা থেকে করেছি। তার অনুমতি নিয়ে ছোট ছোট পরিবর্তন এনেছি আমি। এই যেমন মার্চপাস্টের জায়গায় কুচকাওয়াজ লাগিয়েছি।”

যেন প্রয়াত বন্ধুর মুখ মনে করেই বললেন, “আমার বিশ্বাস, শহীদ কাদরী আমার গান শুনছে।” 

এতক্ষণ শুধু কি-বোর্ড বাজিয়ে গান করছিলেন। এবার মঞ্চের পেছনে থাকা বাদ্যশিল্পীদের বললেন, “ইন্দ্র একটু এদিকে আসবি?” 

তিনজন বাদ্যশিল্পী এলেন। একজন প্যাড সামনে নিয়ে বসলেন। একজন গিটার, আরেকজন তবলার পেছনে। ইন্দ্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই গানটা গাওয়া জরুরি; বাজা।” 

সুমন শুরু করলেন, “আমি চাই সাঁওতাল তার ভাষায় বলবে রাষ্ট্রপুঞ্জে, আমি চাই মহুল ফুটবে সৌখিনতার গোলাপ কুঞ্জে। আমি চাই কাশ্মীরে আর শুনবে না কেউ গুলির শব্দ, আমি চাই মানুষের হাতে রাজনীতি হবে ভীষণ জব্দ।”

দর্শক গানের তালে হাততালি দিচ্ছিল। সবাইকে থামিয়ে দিলেন গায়ক। বললেন, “ওরা বাজাচ্ছে। তাল যা আসার এখান থেকেই আসবে। আপনারা গানটা শুনুন। এই গানটা শোনা জরুরি।”

গানওলা ফের গাইতে শুরু করলেন। “আমি চাই হিন্দু নেতার সালমা খাতুন পুত্রবধূ, আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু।” 

এই লাইনে এসে থেমে গেলেন সুমন। বললেন, “এই গানটা যখন রেকর্ড করি, আমার নাম ছিল সুমন চট্টোপাধ্যায়। তখন কেউ আমাকে ঘৃণা করত না। বিভিন্ন জায়গা থেকে গান গাইতে ডাকত। এরপর এফিডেভিট করে, সকল নিয়ম মেনে আমার নামের অংশ থেকে হিন্দু ধর্মের চিহ্ন চট্টোপাধ্যায় বাদ দিলাম। পত্রিকাগুলোতে আমার নামে হাজার হাজার চিঠি গেল। ‘সুমন তো এখন মুসলমান। নামের আগে কবীর। তাহলে এখন কেন গাইবে- আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু? কবীর বাদ দিয়ে গান’।

“দেখুন, সুমন চট্টোপাধ্যায় থাকতে কেউ বলেনি, হিন্দু নাম বাদ দিয়ে এই গান গাও। যখন কবীর লাগিয়েছি, তখন বলে, আমি কেন এই গান গাইব? কবীর সুমন হতেই তাদের কত আপত্তি।”

সুমনের কণ্ঠে আক্ষেপ, “কবীর সুমন নামের মধ্যে কোনো ধর্মীয় টাইটেল নেই। এটা তারা বুঝল না।”

সন্ধ্যা ৬টায় নিলেন ছোট্ট বিরতি। ফিরে এসে দর্শকদের বললেন, “আমি এভাবে কষ্ট করে নিজের গান শুনি না। আপনারা শুনছেন। আপনাদের জন্য কী করা যায় বলুন তো? আমি প্রাণপণে চেষ্টা করব আপনাদের কষ্ট পুষিয়ে দেওয়ার।”

দর্শক সারির আলো নেভানো হলে এক পর্যায় গান থামিয়ে বললেন, “সব আলো কি নেভাতেই হবে? আমি কি কিছুতেই দেখতে পাব না? আমি কি ভূতেদের গান শোনাচ্ছি? একটু আলো জ্বালিয়ে দেন। আসহায় লাগে।”

আলো জ্বালানো হলে আনন্দচিত্তে বললেন, “এই যে, দেখতে পাচ্ছি। কী সুন্দর লাগছে আপনাদের দেখতে। ওই যে গানের তালে তালে দুজন সাপের ফনার মত এদিক ওদিক দুলছেন, ভীষণ আনন্দ লাগছে দেখে। আমি খুবই দুর্ভাগা, যে দেশে থাকি, সেখানে কেউ নড়ে না চড়ে না, গান শোনে না। এভাবে মাথা দোলানো আমি জীবনেও দেখিনি।”  

সুমনও চান, বেঁচে থাকুক তার গান। বললেন, “বিভিন্ন জায়গায় গাই, অনেকে রেকর্ড করে। অনলাইনে আপলোড দিয়ে দেয়। আজ আপনারা কেউ রেকর্ড করছেন হয়ত। অনলাইনে দিয়ে দেবেন। এভাবেই গানগুলো থেকে যাক। যার ইচ্ছা অনলাইন থেকে শুনবেন। আমি আর কদিনই বা আছি। ৭৩ বছরের বুড়ো মানুষ।”

গ্যালারি থেকে একজন বলে উঠলেন, “অনেকদিন থাকতে হবে। কথা দিয়েছেন আবার আসবেন।” 

সে দর্শকের কথা শুনতে পাননি কবীর সুমন। ওই দূর মঞ্চ থেকে পড়তে পারেননি গান শেষে ঘরে ফেরা শত শত দর্শকের চোখের ভাষা। সবার চোখে তখন এটুকুই মিনতি- ‘আবার আসবেন, গানওলা।’