Published : 19 Jul 2025, 04:00 PM
নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও পরিচালক হুমায়ূন আহমেদের 'শ্রাবণ মেঘের দিন' সিনেমায় একদিন শুটিং করে কাজটি ছেড়ে দেন অভিনেত্রী আফসানা মিমি। বাড়ি থেকে গোছগাছ করে এক মাসের প্রস্তুতি নিয়ে স্পটে গিয়েও, ফিরে আসেন মাত্র তিনদিনের মাথায়।
আর মিমির ছেড়ে দেওয়া ‘শাহানা’ নামের চরিত্রটিতে অভিনয় করে দর্শক-সমালোচকদের আলোচনায় আসেন রুমানা ইসলাম মুক্তি।
কিন্তু কেন মিমি ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমার কাজ হাতছাড়া করলেন, সেই কৌতুহল অভিনেত্রী মিটিয়েছেন নিজেই।
গ্লিটজের সঙ্গে এক আলাপে সে বিষয়ে কথা বলেছেন নব্বইয়ের জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী, যিনি নির্দেশনাতেও দেখিয়েছেন মুন্সীয়ানা।
হুমায়ূন 'কোথাও কেউ নেই', 'নক্ষত্রের রাত', 'সবুজ সাথী', 'অদেখা ভুবন' নামের নাটকগুলোর করার পর 'শ্রাবণ মেঘের দিন' সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব যায় মিমির কাছে। তবে কাজ শুরুর পর চরিত্রের সঙ্গে ‘সংযোগ হারিয়ে ফেলেন’ বলে ভাষ্য মিমির, তৈরি হয় ‘অনাগ্রহ’।
মিমি গ্লিটজকে বলেন, "যখন সিনেমাটার কাজের প্রস্তাব আসে আমি তো খুব এক্সসাইটেড। তবে সিনেমাটা করতে গিয়ে হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে আমার এক ধরনের একটা সংকট তৈরি হয়। 'সংঘাত' কিন্তু না 'সংকট'। হুমায়ুন ভাই আমাকে যে চরিত্রের জন্য চেয়েছিলেন আমি শুটিংয়ে গিয়ে ওই চরিত্রটা নিয়ে অনাগ্রহী হয়ে পড়ি।"
'শ্রাবণ মেঘের দিন' সিনেমায় দুইটি প্রধান নারী চরিত্র ছিল। একজন ডাক্তার শাহানা, দ্বিতীয়জন হলেন গ্রামের মেয়ে কুসুম।
ডাক্তার শাহানা চরিত্রে নেওয়া হয়েছিল মিমিকে।
কাজটি না করার কারণ খোলাসা করে মিমি বলেন, "একদিন শুটিং করার পর আমি নিজের মধ্যে শাহানাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হুমায়ূন ভাইকে গিয়ে বললাম, 'আমি কাজটা করব না। আমার ইচ্ছে করছে না।”
হুমায়ূন আহমেদ খুব নম্রভাবেই তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন মিমি।
“হুমায়ূন ভাই বললেন, ‘কেন আমায় বলো?’ আমি বললাম, ‘আমার ইচ্ছা করছে না। আমি একাত্ম হতে পারছি না। আপনি আমাকে ছুটি দিয়ে দেন।”
এরপর হুমায়ূন বললেন, “আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যাও।’”
শুটিংয়ের জন্য এক মাসের প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়া মিমি মাত্র তিন দিনের মাথায় ফিরে আসেন স্পট থেকে। তবে মিমিকে ফিরিয়ে আনতে হুমায়ূন আহমেদ তাকে চিরকুটও লিখে পাঠিয়েছিলেন।
“উনি দুইবার ছোট ছোট করে চিরকুট লিখে পাঠিয়েছিলেন, যেখানে কাজটিতে ফিরতে বলেছিলেন তিনি। তখন আমি সবিনয়ে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলি যে আমি একাত্ম হতে পারছি না। আমার মনে হয়েছিল প্বার্শ চরিত্র হিসেবে এটা খুব গুরুত্ব পাবে না”
এরপর আর হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে তার কোনো কাজ হয়নি। এছাড়া অভিনয় থেকেও সেসময় বিরতিতে চলে যান আফসানা মিমি।
“হুমায়ূন ভাইও পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন, তারপর আর কাজ করা হয়নি।”
'শ্রাবণ মেঘের দিন' সিনেমাটি না করায় কখনো আফসোস বা আক্ষেপ হয়েছে কী না জানতে চাইলে মিমি গ্লিটজকে বলেন, "আমি সেসময় জেনেবুঝেই কাজটি ছেড়ে এসেছি।তবে আমার নির্বুদ্ধিতা ছিল।”
সেটা কেমন? উত্তরে মিমি বলেন, ভালো একজন মানুষ, ভালো একজন লেখক এবং পরিচালকের সঙ্গে কাজ করা থেকে তিনি নিজেই নিজেকে ‘বঞ্চিত করেছেন’।
"আবার এটাও বলব, হুমায়ূন ভাইও আমার মত একজন অভিনেত্রীকে মিস করেছেন। আমি গর্বের সঙ্গে বলছি না, তবে উনার সঙ্গে আরও কাজ করতে পারলে সেটা অনেক সুন্দর হত। আমি মনে করি, এটা আমার ক্যারিয়ারে আমি নিজেই নিজের ক্ষতি করেছি।”
মিমি মনে করেন, হুমায়ূন আহমেদ যদি বেঁচে থাকতেন, তিনি ফের তার সঙ্গে কাজ করতেন।
“আমি উনার কাছে গেলে নিশ্চয়ই উনি আমাকে কাজে নিতেন।”
হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৯৯ সালে। এতে অভিনয় করেন জাহিদ হাসান, মেহের আফরোজ শাওন, মাহফুজ আহমেদ, আনোয়ারা, রুমানা ইসলাম মুক্তি, সালেহ আহমেদ, এজাজুল ইসলামসহ অনেকে।
সিনেমার গল্প আবর্তিত হয় গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে। যেখানে লোকগায়ক মতির প্রেমে পড়ে কুসুম নামের একটি মেয়ে। শহর থেকে আসা গবেষক সুরুজ মিয়াও কুসুমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। কুসুমের পরিবার তাকে সুরুজের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে চায়। কিন্তু কুসুমের ভালোবাসা থেকে যায় মতির জন্যই।
পুরো সিনেমাজুড়ে ডাক্তার শাহানা চরিত্রটি শক্তপোক্ত প্রভাব রাখে।
সিনেমায় ময়মনসিংহের লোককবি ও গায়ক উকিল মুন্সীর গান ব্যবহার করেন হুমায়ূন আহমেদ। ‘সোয়াচান পাখি’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’ ইত্যাদি গান দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন প্রয়াত গায়ক বারী সিদ্দিকী।
মূলত এই গানগুলোর মাধ্যমে বারী সিদ্দিকীও শিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তার সোপানে পা রাখেন। হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’ গানটিতে কণ্ঠ দেন সুবীর নন্দী। এই গানটিও জনপ্রিয় হয়। গসিনেমাটি সেবছর সাতটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়।
১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় হুমায়ূন আহমেদ নির্মীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’। এরপর একে একে তিনি নির্মাণ করেছেন আরও সাতটি সিনেমা। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ তার জনপ্রিয় সৃষ্টি।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই পৃথিবী ছাড়েন হুমায়ূন আহমেদ।