হিমুর মৃত্যুর ৩ বছর: এগোচ্ছে না বিচার, সাক্ষ্য দিয়েছেন কেবল একজন
সাক্ষী হাজির না হওয়ায় বিচারকাজ এগোচ্ছে না; দ্রুত বিচার শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন হিমুর স্বজনরা।
ছোট পর্দার অভিনেত্রী হুমায়রা হিমুর ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনার’ মামলার বিচার শুরুর পর এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র একজন।
সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে না পারায় বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে সাক্ষ্যগ্রহণ। তিন বছর আগে হিমুর মৃত্যুর ঘটনায় করা এই মামলার বিচার শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তার স্বজনরা।
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন মামলার আসামি মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন ওরফে রুফি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) সানাউল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলাটিতে মোট ২৩ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ ধরনের মামলায় সাক্ষীরা আদালতে হাজির না হওয়ায় বিচার শেষ করতে অনেক সময় লেগে যায়। ফলে বিচারকাজ বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি মামলার জটও বাড়ে।
“তবে রাষ্ট্রপক্ষ এ বিষয়ে সব সময় তৎপর রয়েছে, যেন দ্রুত সাক্ষী হাজির করে বিচার শেষ করা যায়।”
মামলাটির বিচার চলছে ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জশিতা ইসলামের আদালতে। রোববার মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। তবে এদিন কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি।
পরে আদালত আগামী বছরের ১৫ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন বলে জানিয়েছেন আদালতের স্টেনোগ্রাফার আনিসুর রহমান।
২০২৫ সালের ২৬ অগাস্ট মামলার একমাত্র আসামি রুফির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত।
ওই বছরের ১৪ অক্টোবর হিমুর মেকআপম্যান ও আর্টিস্ট কবির আহমদ মিহিরের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য চারটি তারিখ ধার্য হলেও কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি।
আদালতের দিকে তাকিয়ে স্বজনরা
হিমুর স্বজনরা বলছেন, তারা ন্যায়বিচার চান। সেজন্য বিচার শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
মামলার বাদী হিমুর খালা নাহিদ আক্তারের স্বামী কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তারিখের পর তারিখ পড়ছে। আমরা আদালতে যাওয়া-আসার মধ্যে আছি। পরের বিষয় আদালত দেখবে। আদালতের দিকে তাকিয়ে আছি।”
তিনি বলেন, “আমরা ধার্মিক পরিবার। বিষয়টা নিয়ে লজ্জা পাচ্ছি। ধুমধাম করে প্রচার করতে চাচ্ছি না। তবে ন্যায্য বিচার হোক, সেটা চাই।”
কেন লজ্জা পাচ্ছেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “সংক্ষেপে বললে, নায়ক-নায়িকারা এলোমেলোভাবে চলাফেরা করেন। আমরা ধার্মিক পরিবার। এ কারণে আর কী।”
অভিযোগের ভিত্তি নেই, দাবি আসামিপক্ষের
মামলার আসামি রুফির আইনজীবী মো. ইসমাইল ফয়সাল দাবি করেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তদন্তেও বিষয়টি উঠে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ফয়সাল বলেন, “হুমায়রা হিমু মূলত ভিডিও গেমসসহ অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ছিলেন। রুফির সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকায় তিনি তাকে আর্থিক সহায়তা করতেন। তবে হিমুর আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার ঘটনায় রুফির কোনো ভূমিকা ছিল না। মামলার চূড়ান্ত রায়ে রুফি খালাস পাবেন, এমনটাই আশা করছি।”
এদিকে রুফি নিজেকে ‘সম্পূর্ণ নির্দোষ’ দাবি করে হিমুর মেকআপম্যান ও আর্টিস্ট মিহিরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, হিমুর আত্মহত্যার ঘটনায় মিহিরের ভূমিকা ছিল।
রুফি বলেন, “আমি নির্দোষ, সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ। আমি হিমুকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিইনি। আমি দোষী হলে তো কোনো না কোনো আলামত পেত। কিন্তু কিছু পায়নি। আত্মহত্যার কিছুদিন আগে হিমুর সঙ্গে আমার কথা হয়। বেশ কয়েক দিন কথা হত না।”
মিহিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার অনেক কিছু জানা যাবে’ দাবি করে তিনি বলেন, “এখানে মিহিরের বড় ভূমিকা রয়েছে। মিহির যে নায়িকার কাছে যায়, তারা আত্মহত্যা করে। কেন তারা সুইসাইড করবে? আর মেকআপ আর্টিস্ট শুধু মেকআপ আর্টিস্ট নয়, আরও অনেক কিছু করে।
“যাই হোক, সে বিষয়ে বলতে চাই না। তবে এখানে মিহিরের একটা ভূমিকা আছে। মিহিরকে আসামি না করে কেন সাক্ষী করা হল?”
রুফির অভিযোগ, মিহির বিভিন্নজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিতেন এবং তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। হিমুর কাছ থেকেও তিনি টাকা ধার নিয়েছিলেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটিও হয়েছিল বলে দাবি করেন রুফি।
কী ঘটেছিল
২০২৩ সালের ২ নভেম্বর রাজধানীর উত্তরায় নিজের বাসা থেকে অভিনেত্রী হুমায়রা হিমুর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তার খালা নাহিদ আক্তার ওই দিনই আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন। মামলায় মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন ওরফে রুফিকে আসামি করা হয়।
মামলার পরদিন রুফিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে তিনি কারামুক্ত হন।
মামলার তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ৩১ অগাস্ট রুফির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাব্বির হোসেন।
মামলার এজাহারে নাহিদ আক্তার অভিযোগ করেন, জিয়াউদ্দিন ওরফে রুফি হিমুর বন্ধু ছিলেন। ঘটনার ছয় মাস আগে থেকে তিনি নিয়মিত হিমুর বাসায় যাতায়াত করতেন এবং মাঝেমধ্যে সেখানে রাত কাটাতেন।
এজাহারে বলা হয়, ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর রুফির মোবাইল নম্বর ও ভিগো আইডি ব্লক করে দেন হিমু। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
পরদিন ২ নভেম্বর বিকেল ৩টার দিকে রুফি হিমুর বাসায় যান। মেকআপম্যান মিহির দরজা খুলে দিলে তিনি ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর মিহির নিজের কক্ষে চলে যান।
এজাহারের ভাষ্য অনুযায়ী, রুফি সেদিন বিকেল ৫টার দিকে মিহিরের কক্ষে গিয়ে চিৎকার করে বলেন, হিমু আত্মহত্যা করেছেন। তখন মিহির তাকে প্রশ্ন করেন, তিনি তো হিমুর কক্ষেই ছিলেন। জবাবে রুফি বাথরুমে ছিলেন বলে জানান।
পরে মিহির ওই ঘরে গিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে রশি দিয়ে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় হিমুকে দেখতে পান। কক্ষের ভেতরে দুটি কাচের গ্লাস ভাঙা অবস্থায় ছিল বলেও তথ্য দেওয়া হয় এজাহারে।
এরপর মিহির ও রুফি মিলে হিমুকে নামিয়ে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ওই সময় হিমুর ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে কৌশলে চলে যান রুফি।
