Published : 15 Dec 2025, 01:10 AM
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের চেতনা থেকে বাংলাদেশের ‘দূরে সরে যাওয়ার’ দুটো কারণ দেখতে পাচ্ছেন এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তার ভাষায়, প্রথম কারণ হল ইতিহাসের চর্চা ‘কমে যাওয়া’ এবং ইতিহাসের ‘বিকৃতি’। আর দ্বিতীয় কারণ হল, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন আর চেতনা থেকে দূরে সরে যাওয়া।
রোববার সন্ধ্যায় ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবন মিলনায়তনে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ কথা বলেন।
এ আয়োজনে গান, কথন ও নাট্যাংশে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সুমন মজুমদারের একক সংগীতে। তিনি শোনান ‘মৃত্যু নাই নাই দুঃখ’ গানটি। পরে কথনে অংশ নেন ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী।
একক সংগীতে অভয়া দত্ত পরিবেশন করেন ‘ক্ষত যত ক্ষতি যত মিছে হতে’। এরপর কথনে অংশ নেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
বাংলাদেশ এখন 'ধনীদের উপনিবেশে' পরিণত হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, "পাকিস্তানিরা, তার আগে ইংরেজরা, তার আগে মোগলরা যেমন করে আমাদের সম্পদ বিদেশে পাচার করত, তাদের রাজধানীতে নিয়ে যেত। আজকের ধনীরাও এভাবে আমাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে।
"যে সম্পদ জনগণের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, শ্রমের মধ্য দিয়ে এবং ত্যাগের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে- সেই সম্পদ তারা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে আগের শাসকদের মত। কাজেই শাসক বদল হয়েছে, কিন্তু শাসকদের শোষণকারী চরিত্রের বদল হয়নি।"
বারবার অভ্যুত্থান হলেও তা কেন ‘ব্যর্থ’ হয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে নিজের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি বলেন, "এই অভ্যুত্থানগুলো আসলে যে প্রয়োজন— সমাজ পরিবর্তনের প্রয়োজন, সামাজিক বিপ্লবের প্রয়োজন, ব্যক্তিমালিকানাকে উঠিয়ে দিয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন— সেই কাজটা করতে পারিনি।"

বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ‘মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, "কেবল বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবী জুড়ে ঘটছে। সারা পৃথিবীতে প্রতিক্রিয়াশীলরা শক্তিশালী হয়েছে। ডনাল্ড ট্রাম্পের মতন একজন নিকৃষ্ট মানুষ- তার হাতে কত ক্ষমতা, একক ক্ষমতা।"
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষক রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনকে 'কাফের-মুরতাদ' বলেছেন, তারও সমালোচনা করেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ।
তিনি বলেন, "আমাদের প্রধান উপদেষ্টা রোকেয়া দিবস উপলক্ষে বলেছেন যে আমরা ১০০ বছরেও একজন দ্বিতীয় রোকেয়া তৈরি করতে পারলাম না। কেন পারলাম না? তার জবাব কিন্তু ওই দিনের সংবাদপত্রে ছিল এবং তার বক্তৃতায় ছিল।
“সেটা হল এই যে- রোকেয়াকে কাফের-মুরতাদ বলে ঘোষণা করা এবং এই ধরনের মনোভাব সম্পন্ন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপনা করেন। এই পরিস্থিতিতে আমরা বসবাস করছি।"
ছায়ানটের এ অনুষ্ঠানে তাহমিদ ওয়াসীফ ঋভু পরিবেশন করেন ‘তোমার কাছে এ বর মাগি’ গানটি। এরপর কথনে অংশ নেন অধ্যাপক মনসুর মূসা।
সংগীত পর্বে লাইসা আহমদ লিসা পরিবেশন করেন ‘তোমারি তরে, মা, সপিনু এ দেহ’। এরপর নাট্যদল বঙ্গরঙ্গ প্রযোজিত নাট্যাংশ ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ মঞ্চস্থ হয়। সৈয়দ শামসুল হক রচিত এই নাট্যাংশটি নির্মাণ করেছেন আসিফ মুনীর ও মিথুন মোস্তফা।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে সমবেত সংগীতে পরিবেশিত হয় ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব’। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এই সাংস্কৃতিক আয়োজন।