Published : 28 May 2026, 09:46 PM
রায়বাহাদুর দর্পনারায়ণ চৌধুরী থেকে সুকুমার-পরিচালক অনীক দত্তের সঙ্গে অভিনেতা পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক অন্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাই পরিচালকের আকস্মিক প্রয়াণে শোকার্ত বর্ষীয়ান অভিনেতা। বন্ধুর চিরবিদায় বিশ্বাস করতে পারছেন না বলে ভাষ্য তার।
কলকাতার বাংলাদৈনিক আনন্দবাজারকে পরান বলেন, “যে কোনও মৃত্যুই দুঃখের, কষ্টের। অথচ মেনে নিতেই হবে। অনীককে সবাই ভালবাসত। মূল্যবোধ, সমাজসচেতনতা, তার আদর্শ, লক্ষ্য সবকিছুই ছিল পরিশীলিত। সেই জন্যই তো মানুষ মানুষকে ভালবাসে। এই জন্যই অনীক অনেকের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। তার মধ্যে আমিও এক জন।”
কথা বলতে বলতে অঝোরে কেঁদে ফেলেন পরান।
তিনি বলেন, “তার অনেকগুলো সিনেমায় কাজ করেছি আমি। যার মধ্যে একটি সিনেমায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সম্মান পেয়েছিল। আমি সেরা অভিনেতা হিসাবে সম্মানিত হই। অনীকই একমাত্র বন্ধু যার সৃষ্টিতে আমি আন্তর্জাতিক ভাবে ধন্য হয়েছিলাম। আমি কখনও ভুলব না।
পরান জানিয়েছেন, এই সংবাদ যদি তিনি না শুনতেন তা হলে বেশি খুশি হতেন। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ , ‘বরুণবাবুর বন্ধু’, ‘আশ্চর্য প্রদীপ’সহ অনীকের বেশ কিছু সিনেমায় অভিনয় করে নন্দিত হয়েছেন পরান।
দক্ষিণ কলকাতার হিন্দুস্তান পার্ক এলাকায় বুধবার চারতলা ভবনের ‘ছাদ থেকে পড়ে গেলে’ দ্রুত ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয় অনীককে। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ওই ভবনের ছাড় থেকে একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার করেছে পুলিশ। যে নোটটি অনীক লিখেছেন তার সুইডেন প্রবাসী মেয়ের উদ্দেশে।
তবে ওই নোটে কাউকে দোষারোপ করেননি অনীক। ছাদে একটি ম্যাগাজিনের মধ্যে একটি খাম থেকে মিলেছে সেই সুইসাইড নোট।
হিন্দুস্তান পার্কের ওই ভবনে অনীকের সাবেক স্ত্রী থাকেন। তবে সেদিন তার ফ্ল্যাও যাননি অনীক।
অনীক দত্তর মৃত্যুর খবরে কলকাতার চলচ্চিত্র ও রাজনৈতিক মহলে শোকের ছায়া নেমে আসেন।
শোকবিহ্ববল শ্রীলেখা বলেন, “অনীকদার মৃত্যু নিয়ে কথা বলার ক্ষমতা সত্যি আমার নেই। অবসাদ খুব সাংঘাতিক একটা বিষয়। দিনের পর দিন মানুষ অবসাদকে অবহেলা করে। যারা বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না, তরা ভাবেন, ‘অবসাদ এমনকি যে, এমন চরম পদক্ষেপ করতে হবে'”
অভিনেত্রীর আক্ষেপ, “ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অভিভাবককে হারালাম। আমিও কিন্তু অনীকদার অভিভাবকের মতোই ছিলাম। অসম্ভব স্নেহ করতেন আমাকে। সোজাসাপটা মানুষ ছিলেন, মুখের উপর কথা বলতেন। তাই অনেকেই তাকে পছন্দ করতেন না।”
অনীক দত্তের ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’, ‘আশ্চর্য প্রদীপ’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন শ্রীলেখা।
অনীক দত্তের মৃত্যুর খবর অনেকের মতোই মেনে নিতে পারছেন না অভিনেতা আবীর চট্টোপাধ্যায়ও। পরিচালকের শেষ সিনেমার নায়ক তিনিই।
গত বছর পূজোয় মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’-তে অভিনয় করেছিলেন আবীর। সিনেমা মুক্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হলেও, পরে তা প্রেক্ষাগৃহে দেখেছিলেন দর্শক। সাড়াও ফেলেছিল সেই সিনেমা।
অনীক দত্তের ‘মেঘনাদবধ রহস্য’-তেও অভিনয় করেছিলেন আবীর। পরিচালকের সঙ্গে বহু স্মৃতি রয়েছে তার।
শোকস্তব্ধ আবীর বলেন, “এই খবর সত্যিই কল্পনাতীত। প্রথমে ভেবেছিলাম, অসুস্থতাজনিত কারণে কিছু হয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন তিনি অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু পরে সবটা জেনে হতবাক হয়ে যাই। ভাবতে পারছি না এমনও হতে পারে।”
অনীক দত্তের মেয়ের ঐশী দত্তের দেশে ফেরার কথা রয়েছে বৃহস্পতিবার। শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য পরিচালকের মরদেহ রাখা হতে পারে নন্দনে। শুক্রবার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে অনীককে দাহ করা হবে বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
বিজ্ঞাপন জগত থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনায় আসা অনীক দত্ত ২০১২ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ সিনেমার মাধ্যমে দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেন।
তার আরও কিছু কাজের মধ্যে আলোচিত হয়েছে ‘আশ্চর্য প্রদীপ’, ‘মেঘনাদ বধ রহস্য’, ‘ভবিষ্যতের ভূত’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ এবং সত্যজিৎ রায়ের জীবন অবলম্বনে নির্মিত ‘অপরাজিত’। অনীকের সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’।