Published : 01 Jul 2026, 10:38 PM
দুই বছর আগে যে কিশোর-কিশোরীরা মাধ্যমিক পাস করে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছিল, তাদের মধ্যে ৭ লাখ ২৪ হাজার শিক্ষার্থী বৃহস্পতিবার উচ্চ মাধ্যমিকে বসছে না।
আর ২০২৪ সালে এসএসসি পাস করা যে শিক্ষার্থীরা একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল, তাদের মধ্যে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ছাত্রছাত্রী এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা দিচ্ছে না।
এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কি শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ল? বিষয়টি যাচাই করে দেখার কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর ঝরে পড়ার এ হার কমে আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার। তারাই এবার পরীক্ষায় বসছে, যারা ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হয়েছিল।

• ২০২৪ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছিল ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ জন।
• তাদের মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হয়েছিল ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৩২ জন।
• অর্থাৎ এসএসসি পাস করেও ১ লাখ ৮০ হাজার ২২১ জন শিক্ষার্থী সেবার উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়নি।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা পরীক্ষায় অংশ নেবে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী। তাদের মধ্যে নিয়মিত শিক্ষার্থী ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন। বাকিরা অনিয়মিত ও মনোনন্নয় পরীক্ষার্থী বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
• অর্থাৎ, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তির পরও ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯৮৯ জন শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষায় বসছে না।
বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিভাগের সচিব আবদুল খালেক চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীদের তথ্য তুলে ধরেন।
এছাড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীদের বিস্তারিত তথ্য সাংবাদিকদের সরবরাহ করেন বিভাগের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ শিবলী সাদিক।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে উচ্চমাধ্যমিক, আলিম এবং এইচএসসি ভোকেশনাল-বিএমটিতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৩২ জন। তবে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন নিয়মিত পরীক্ষার্থী।
আর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হলেও ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯৮৯ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেননি।
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নয়টি সাধারণ বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে রেজিস্ট্রেশন করেছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছে।
নয়টি সাধারণ বোর্ডের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা অংশ নিতে ফরম পূরণ করেনি, যা মোট নিয়মিত শিক্ষার্থীর ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ।
একই শিক্ষাবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন আলিম মাদ্রাসায় একদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে রেজিস্ট্রেশন করেছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ জন। তাদের মধ্যে আলিম পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করে ৭৮ হাজার ২৬৯ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী।

এই হিসাবে ৬১ হাজার ৬৬০ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি, যা মোট নিয়মিত শিক্ষার্থীর ৪৪ দশমিক ০৭ শতাংশ।
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ভোকেশনাল, বিএমটিসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাক্রমে ভর্তি হয়ে রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন। তাদের মধ্যে ৭৫ হাজার ১৯৭ জন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করলেও নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯০ হাজার ৩৪৫ জন ফরম পূরণ করেনি, যা মোট নিয়মিত শিক্ষার্থীর ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
সংকট কোথায়
আর্থিক অনটন, আত্মবিশ্বাসের অভাব, বাল্যবিয়েসহ নানা কারণে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ছে বলে মনে করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. আজম খান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবনের ইতি টানছে। এটি জাতির জন্য অশনি সংকেত। এসএসসি পাস করার পর হয়ত তাদের অনেকে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে। তাই তারা ভর্তি হয়নি। আবার অনেকে ভর্তি হওয়ার পর কাজে যোগ দিয়েছে।

“আসলে দেশে বেকারত্বের সমস্যা এতোটা প্রবল যে নতুন প্রজন্ম আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে। কারণ অনার্স পাস করার পরও অনেকেই বেকার। সেখানে যে ছেলেটা কোনমতে এসএসসি পাস করেছে, সে আর পড়াশোনা করছে না। তারা কাজে ঢুকে যাচ্ছে। মেয়েদের একটি বড় অংশ বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে।”
এ শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন অধ্যাপক আজম।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও বর্তমান সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার মনে করেন, এ সোয়া ৭ লাখ শিক্ষার্থীর একটি অংশ শিক্ষাজীবন থেকে বেরিয়ে গেলেও সবার ক্ষেত্রে হয়ত তা ঘটেনি।
“এদের কেউ কেউ হয়ত অর্থনৈতিক কারণে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়নি। কিন্তু পরে ভর্তি হলেও হয়ে থাকতে পারে। আবার অনেকে নির্বাচনী পরীক্ষায় খারাপ করে ফরম পূরণ করেনি। বা প্রিপারেশন খারাপ বলে ফরম পূরণে করেনি।”
তবে এ ধরনের শিক্ষার্থীদের বাইরেও একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী যে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে থাকতে পারে, সেই আশঙ্কার কথা স্বীকার করছেন তিনি।

কারণ খতিয়ে দেখার উদ্যোগ
বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পার হওয়ার আগেই শিক্ষাজীবনের ইতি টানছে, তা খতিয়ে দেখতে গবেষণামূলক উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা একটা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছি। তার আওতায় আমরা তথ্য সংগ্রহ করে তা যাচাই বাছাই করে দেখবে। আগামী অগাস্ট মাসে শিক্ষা বোর্ডগুলো পক্ষ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে যাচাই বাছাই করে দেখা শুরু হবে বলে আশা করছি।”
উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন থেকে ছিটকে পড়া নিয়ে বুধবার শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা ড্রপ করে কেন? এর উত্তর কে দেবে? নিশ্চয় আমাদের দিতে হবে।
“আমাদের সময়টা পার হতে দিন, তারপরে দেখবেন আমরা কারেক্টলি অ্যানালাইসিস করছি এই দুর্বলতাগুলো। সেই ফাইন্ডিংস থেকে আমরা আগামী দিনে এটা অ্যাড্রেস করব। ইনশাআল্লাহ, এই ধরনের ঘটনা ঘটবে না।”