Published : 20 Jul 2025, 12:39 AM
এক সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় রাজত্ব করা চিত্রনায়িকা কবরী ভেবেছিলেন, বড় হয়ে সাদা শাড়ি পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে গিয়ে ছাত্র পড়াবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরা থেকে যায় অভিনেত্রীর। চৌদ্দ বছর বয়সেই লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় জীবন। যে আলো ঝলমলে জীবন তাকে নিয়ে যায় তারকালোকে।
যে জীবনে আছে খ্যাতি, সাফল্য, সংগ্রাম।
শনিবার কিংবদন্তি চিত্রনায়িকা কবরীর ৭৫তম জন্মবার্ষিকীতে আত্মজৈবনিক রচনা ‘স্মৃতিটুকু থাক’ থেকে গ্লিটজ তুলে ধরেছে তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু অংশ।
‘স্মৃতিটুকু থাক’ শিরোনামে কবরীর লেখা সেই বইটি ২০১৭ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর পাবলিশিং লিমিটেড- বিপিএল।
যেখানে আছে প্রেম নিয়ে কবরীর দর্শন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, সমাজের বৈষম্য নিয়ে খেদ, এবং সন্তানদের সঙ্গে তার সম্পর্কের গল্প।

তবে ব্যক্তিকথার বাইরে এই রচনায় স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলা সিনেমার দুর্দশাগস্ত সময়ের কথা একটি বড় জায়গা নিয়ে আছে। ষাটের দশকে অভিনয়ে নাম লেখানো কবরী বলেছেন, দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ‘সুবিধা করতে পারেনি’।
মুক্তিযুদ্ধের পরেও যখন সিনেমা জগতে যে ‘অনিয়ম’ ভর করে, কবরী তা দেখেছেন ভীষণ কষ্টের চোখে। দেশ স্বাধীনের পর সিনেমা শিল্পের পরিস্থিতিতে কবরী বর্ণনা করেছেন অনেকটা ‘হালুয়া-রুটির ভাগবাটোয়ারার’ মত।
কবীরর কথায়, তার জীবনে ‘প্রেম আসেনি’, এই না পাওয়াকে অনেকটা আপদ থেকে বেঁচে যাওয়ার মত বর্ণনা করেছেন।
‘স্মৃতিটুকু থাক’ বইয়ে কবরী লিখেছেন, “কম বয়সে ছেলেদের প্রচণ্ড ভয় পেতাম। জেএম সেন হাই স্কুলে সেভেনে উঠেই সিনেমা জগতে পা ফেলি। সবে দুধের দাঁত পড়েছে। মনের মধ্যে প্রেম প্রেম খেলা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ভয়ে মুখ খুলিনি। প্রেমের পরে কী হবে! আমি কী করব! কিছুই জানি না। প্রথমে প্রেম এরপর বিয়ে!

“আমার কপালে প্রেমের সুখ কোনোদিন হয়নি। যাক আপদ চুকেছে। প্রেমে পড়ে কার না কার ঘরনী হতাম। তবে যা হবার তা তো হয়েছেই। ”
১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে জন্ম নেওয়া নেন এক কিশোরী। বাবা মা নাম দিয়েছিলেন মিনা পাল। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজারে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে নির্মাতা সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রে মিনা পালের অভিষেক হয় 'কবরী' নামে। সেই থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জনমনে কবরী হিসেবেই বেঁচে ছিলেন তিনি।
জীবনের লক্ষ্য নিয়ে কবরী লিখেছেন, “মানুষজন বড় হয়ে কত কী হতে চায়-ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, পাইলট, অভিনেতা, সাংবাদিক বা অন্য কিছু। আমার স্বপ্ন ছিল-বড় হয়ে সাদা শাড়ি পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে মাস্টারি করবো। কিন্তু আমার জীবন যে একদম উল্টো। অ্যাকশন-কাট-লাইট-এনজি-ওকে।”
কবরী লিখেছেন, “চলচ্চিত্রের বাইরের মানুষ ভাবেন নায়িকারা খুব সুখে থাকে। ঘুমায়, শুটিং করে, দাস-দাসী মাথায় তেল লাগায়, ঘরদোর পরিষ্কার করে। নায়িকারা শুধু মজার মজার খাবার খায় আর টাইম টু টাইম ঘুমায়। তাই মেকআপ করে ড্রেস পরে যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায় তাদের মোহনীয় লাগে।”

কবরী রান্না করতে পছন্দ করতেন। বইয়ে তিনি লিখেছেন, তার মা ছিলেন একজন ‘অসাধারণ রাঁধুনি’। তার মায়ের হাতে সেরা রান্নার তালিকায় আছে শর্ষে ইলিশ, পোস্ত পালং, কই মাছ, ফুলকপি-আলু কিংবা পাঁচমিশালী নিরামিষ তরকারি।
সেই রন্ধনপ্রেম কবরীর মধ্যেও ছিল। সন্তান ও বন্ধুদের জন্য রান্না করতেন ভালোবেসে।
“তারা খেয়ে মজা করে বলতেন ‘তোমার হাতে কি জাদু আছে?’”
স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পরবর্তী সংগ্রাম নিয়ে স্মৃতিচারণে কবরী লিখেছেন, “মুক্তির আনন্দ অন্যরকম। এই স্বাধীনতা অনেক কষ্টে অর্জিত। ভারত থেকে দেশে ফিরে আরেক বিড়ম্বনার শিকার হই। নিজস্ব কষ্ট থেকে কোনোমতে উতরানো যায়, কিন্তু সমষ্টিগত বাধা থেকে নিস্তার পাওয়া খুবই কঠিন। স্বাধীনতাযুদ্ধের পর নানাজনের সাথে কথা হতো, মেলামেশা হতো, কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের সাথে পরিচয় হয়ে ওঠেনি। কবরী হিসেবে আমাকে তারা চিনতেন, কিন্তু যাওয়া আসা তেমন ছিল না।
“শুধুমাত্র শ্রদ্ধেয় মালেক উকিল সাহেবের পরিবারের সাথে আমার ওঠা-বসা। তাঁর মেয়ে বেবী, লিলি, মায়া ওদের সাথেই আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। আমি আর অভিনেত্রী রোজী সামাদ প্রায়ই মালেক ভাইয়ের পারিবারিক দাওয়াতে যেতাম।”
ঢাকাই সিনেমার জগৎ নিয়ে আক্ষেপের কথা জানিয়ে অভিনেত্রী লিখেছেন, “বাংলাদেশ সৃষ্টির পরে ছবি আগের মত আর সুবিধা করতে পারেনি। কিছু ভালো ছবি যে হয়নি তা নয়, কিংবা কিছু ছবি ভালো ব্যবসা করেনি তাও নয়। তবে পুরোনোদের অনেকে চলে যাওয়ায় এক ধরনের সিস্টেম লস হয়েছে। সে সময় যারা এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন, তারা একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতেন। স্বাধীনতার পর আনাড়ি কিছু লোকের হাতে সিনেমা শিল্পটি হালুয়া-রুটির ভাগবাটোয়ারায় পরিণত হয়। দিনে দিনে এর পরিণতি হলো করুণ থেকে করুণতর।

“এজন্য রাজনীতিও দায়ী। তাই যা হবার তা-ই হয়েছে, হচ্ছে। এখনও আমাদের পুরোনো সিনেমাগুলো টিভি চ্যানেলে সম্প্রচারিত হলেও পরের ছবিগুলোর হদিস নেই। দর্শকনন্দিত হতে পারেনি সেগুলো। সোনালি জগৎ এখন ধূসর অতীত।”
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমা নির্মাণকালের সময়ের স্মৃতিও বইয়ে তুলে ধরেছেন অভিনেত্রী। সিনেমার শুটিংয়ে অংশ নিতে গিয়ে গ্রামে আটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে।
“রাতে ফেরার কথা ছিল, হঠাৎ বৃষ্টিতে গাড়ি কাদায় আটকে যায়। স্থানীয় এক বাড়িতে পাঁচজন মেয়ে মিলে একটা চৌকিতে শুয়ে গল্প করেই রাত কাবার করলাম।”
তারপরের কিছু কথাতে সমাজব্যবস্থার 'বৈষম্যের' দিকে আঙুল তুলেছেন অভিনেত্রী।
কবরী লিখেছেন, "এত কষ্ট করে বাসায় ফিরে প্রশ্নের মুখোমুখি-কেন রাতে থাকলাম? রাত বলে কথা। যেন দিনে কিছু হয় না। মেয়েদের জীবন ভারি অদ্ভুত। বিশ্বাসের জায়গায় মেয়েদের ঠাঁই করে নিতে হলে সৃষ্টিকর্তাকে নতুন করে ভাবতে হবে। সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে অন্য পুরুষের সাথে জড়িয়ে চরিত্র হনন। সত্যি কি মিথ্যা-সে বিশ্লেষণও নেই। অথচ এর চাইতে বড় অপরাধও তো হতে পারে। বাবা, ভাই, স্বামী, পড়ন্তবেলায় সন্তান জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। এমনকি ছেলেবন্ধু থাকলে তার কাছেও হার মানতে হয়।"
কবরীর লেখায়, পর্দার বাইরে এই অভিনেত্রী আবির্ভূত হয়েছেন একজন ‘প্রাণবন্ত, রসিক’ মানুষ হিসেবে। নতুন কোনো নায়কের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কি ধরনের মজা তিনি করেছেন তাও লিখেছেন বইয়ে।
“ক্লোজআপ শটে প্রেমিকের চোখে চোখ রেখ তাকানোর বদলে চোখ ট্যারা বানিয়ে তাকিয়ে থাকতাম।”
এতে প্রথম শটেই হিরো ভুল করলে পরিচালকের ধমক খেতেন।

পাঁচ সন্তানের জননী কবরী। তারা হলেন-অঞ্জন (বাবুনী), রিজওয়ান (মন্টি), শাকের, জয়নাল (চিশতি) ও শান।
সন্তানদের নিয়ে কবরী লিখেছেন, “বাচ্চারা ছোট থাকতেই বেশি কাজ করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের আগে আমার দ্বিতীয় সিনেমা 'বাহানার' সময় আমি এক সন্তানের মা। এটি ছিল উর্দু সিনেমা, পাকিস্তানের করাচি শহরে শুটিং হয়েছিল। আমার বাচ্চাকে আমি এক বছর পর্যন্ত বুকের দুধ খাইয়েছি।
“অনেক পেশাজীবী মা বিশেষ করে গ্ল্যামার জগতের নারীরা বাচ্চাদের ব্রেস্ট ফিড করায় না। তাদের ভয় পাছে সৌন্দর্য নষ্ট হয়। কিন্তু বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, মেধার বিকাশ ঘটানো এসব ছাড়াও মা ও সন্তানের মাঝে সেতুবন্ধ গভীর করে এটা। সন্তান বলে কথা- বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।”
কবরী কেবল 'নায়িকা' ছিলেন না, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হাসিখুশি খেলায় মেতে ওঠা একজন মা ছিলেন তিনি।
“ওরা যখন ছোট ছিল, তখন আমিও ছোট্টটি হয়ে ওদের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলতাম, পিস্তল দিয়ে খেলতাম।”
কবরীর সন্তানরা বড় হয়ে একে একে পড়াশোনার জন্য বিদেশে পাড়ি দেন।
কবরীর ভাষ্য, “আমরা মা-ছেলেরা খেলতে খেলতে কখন যে বড় হয়ে গেলাম বুঝিইনি”।
‘সাত ভাই চম্পা’, ‘আবির্ভাব’, ‘ময়নামতি’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘দর্প চূর্ণ’, ‘কাঁচ কাটা হীরে’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ‘রংবাজ’, ‘লালন ফকির’সহ বহু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। তবে বেশি সিনেমা তিনি করেছেন নায়ক রাজ রাজ্জাকের সঙ্গে।
‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’, ‘পরিচয়’, ‘অধিকার’, ‘বেঈমান’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘সোনালী আকাশ’, ‘অনির্বাণ’, ‘দীপ নেভে নাই’সহ অর্ধশতাধিক সিনেমায় ‘রাজ্জাক-কবরী’ জুটি জনপ্রিয়তায় ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
‘সারেং বউ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। অভিনয়ের পাশাপাশি কবরী নির্মাণও করেছেন চলচ্চিত্র। রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে হয়েছিলেন সাংসদও।
২০২১ সালের ১৭ এপ্রিল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান কবরী।