Published : 06 Jul 2026, 02:20 PM
সকাল থেকে বৃষ্টি নামে রাজধানীতে; তবে সেই বৈরী আবহাওয়া বাধা হতে পারেনি প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাহিত্য সমালোচক ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের বিদায় বেলায় শ্রদ্ধা নিবেদনে।
সোমবার বেলা ১১টায় বৃষ্টি উপেক্ষা করেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ঢল নামে মানুষের। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির আনা পুষ্পস্তবকে ঢেকে যায় প্রয়াত অধ্যাপকের কফিন।

শহীদ মিনারে ফজলুল হকের কফিনে শ্রদ্ধা জানিয়েছে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, প্রগতি লেখক সংঘ, বাংলাদেশ লেখক শিবির, রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন এবং দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটি।
এছাড়া শ্রদ্ধা জানায় গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস, শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের মধ্যে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় গণফ্রন্ট (কমরেড টিপু বিশ্বাসের পক্ষ থেকে), জেএসডি, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা পার্টি, বাংলাদেশ গরীব মুক্তি আন্দোলন, সাম্যবাদী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এবং সোনার বাংলা পার্টির পক্ষ থেকেও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ভাষাবিদ মনসুর মুসা, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ, অন্য প্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান, গবেষক মফিদুল হক, নয়ন জাহাঙ্গীর, মোহাম্মদ শামসুল জামান, আবু সাঈদ খান, মোহাম্মদ সুলতান উদ্দিন, আলমগীর শিকদার লিটন এবং জাহানারা হাকিম বিদ্যানিকেতন ও গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতিনিধিরা।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দীন স্টালিন বলেন, “অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের চলে যাওয়া আমাদের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিহাসের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি কখনো ভয় পেয়ে কথা বলা বন্ধ করেননি, কোনো শক্তিই তার কণ্ঠকে অবদমিত করতে পারেনি। উগ্রবাদীরা তার সন্তানকে হত্যা করার পরও তিনি দমে যাননি। তার লেখনী ও সম্পাদিত পত্রিকার মাধ্যমে তিনি অবিচলভাবে কাজ করে গেছেন।”

শ্রদ্ধা জানাতে এসে শারমিন এস মুরশিদ আপ্লুত হয়ে বলেন, “উনার সঙ্গে আমাদের পথযাত্রা দীর্ঘদিনের। আজকে জাতীয় অধ্যাপক ফয়েজ আহমদের কথাও মনে পড়ছে, যাদের সঙ্গে আমরা কালচারাল ও পলিটিক্যাল অঙ্গনে অনেক কাজ করেছি। এই পণ্ডিত ও জ্ঞানী মানুষেরা চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা ভাববার বিষয়। ওনাদের বিদায় আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।”
তিনি আরও বলেন, “সমাজ যেন জ্ঞানহীন ও বিবেকহীন না হয়ে যায়, সেটাই এখন মূল শঙ্কা। এই মানুষগুলো যে আদেশিক সম্পদ রেখে গেছেন, তা ধরে রেখে আমাদের আলো ও বিবেকের চর্চার জায়গাটা আরও বড় করতে হবে। তবে এখানে দাঁড়িয়ে দু-কথায় উনাকে মূল্যায়ন করার মতো ক্ষমতা আমার নেই, কারণ উনাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমি উনার অবমূল্যায়ন করতে চাই না। শুধু বলব, সমাজকে জ্ঞান-বুদ্ধি দেওয়ার মতো এমন গুরুজনদের সংখ্যা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাট্যকার সামিনা লুৎফা স্মৃতিচারণ করে বলেন, "সন্তানের লাশ সামনে রেখেও প্রতিবাদী হওয়া এই শিক্ষকের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক ও সবার জন্য সহজলভ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৩০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ সংক্রান্ত যেকোনো জটিলতায় তার কাছেই সঠিক সমাধান ও দিকনির্দেশনা পাওয়া যেত। ছাত্র কিংবা শিক্ষক, গুরুত্বপূর্ণ বা অগুরুত্বপূর্ণ কোনো ভেদাভেদ না করে তিনি সর্বদা মানুষকে যোগ্য সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে কথা বলতেন। তার প্রয়াণে এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।"

শহীদ মিনারে বাবার কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মেয়ে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শুচিতা শারমিন বলেন, “সবাইকে নিয়ে আমার বাবা কাজ করতে চেয়েছিলেন। সব সময় চেষ্টা করেছেন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের যাতে ভালো হয়, সেই লক্ষ্যে কাজ করতে। তিনি সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, আমরা সবাই তার দেখানো সেই আদর্শের পথেই চলব। আপনারা সবাই আমার বাবার আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করবেন।”
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষে দুপুরে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে।
শুরুতে সেখানে প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের কফিন নামানো যায়নি। পরে বেলা সাড়ে ১২টায় কলা অনুষদের মূল ফটকে তার কফিনে শ্রদ্ধা জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, বিভিন্ন বিভাগ ও শিক্ষকদের সংগঠন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলা বিভাগ, শিক্ষক নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ জনঅধিকার পার্টি, স্বপ্নযাত্রাসহ অন্যরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “ অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক একজন প্রথিতযশা মানুষ ছিলেন। তিনি রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করতেন, সমাজ নিয়ে চিন্তা করতেন। তিনি কর্মজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক অবদান রেখে গেছেন।

“তার দর্শন, চিন্তা দিয়ে আমাদের মাঝে তিনি চিরকাল বেচে থাকবেন। আমরা তার কাজের জন্য আজীবন স্মরণ করব।”
বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘তিনি ছিলেন একজন নীতিবাদী রাজনৈতিক দার্শনিক। তার এই প্রয়াণে বাংলাদেশ একজন গুরুত্বপূর্ণ মনীষীকে হারাল।
"আমরা তার কর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবো এবং তাকে আজীবন স্মরণ করবো। তার প্রস্থান বাংলাদেশের এক প্রতিবাদী সত্তার অবসান।”
সেখান থেকে আবুল কাশেম ফজলুল হকের মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে আনা হয়। পরে দুপুর পৌনে ২টার দিকে এ শিক্ষাবিদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তিনি শেষ শয্যায় শায়িত হবেন।
শেষবারের মত বাংলা একাডেমির আঙিনায় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রয়াণ
শেষবারের মত বাংলা একাডেমির আঙিনায় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক