Published : 06 Jul 2026, 12:13 PM
প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাহিত্য সমালোচক ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক কফিনবন্দি হয়ে শেষবারের মত এলেন তার দীর্ঘদিনের প্রিয় কর্মস্থল বাংলা একাডেমিতে।
বাংলা একাডেমির প্রয়াত এই সভাপতির মরদেহে সেখানে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তার সহকর্মী, শিক্ষার্থী, লেখক, সাহিত্যিক ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
সোমবার সকালে বাংলা একাডেমি চত্বরে তার কফিন আনা হলে সহকর্মীরা তার স্মৃতিচারণ করেন।
কফিনে ফুল দিয়ে একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা জানিয়েছে মনসুর মুসা, কথা সাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, গবেষক সাইমন জাকারিয়া, কবি সরকার আমিনসহ বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিরা।

‘তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী’
শ্রদ্ধা জানিয়ে সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে নিয়ে বলেন, “তিনি ছিলেন এক অনন্য প্রতিভাবান বুদ্ধিজীবী। তিনি আমৃত্যু অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, দারুণভাবে সমাজ সচেতন এবং স্বাধীনতাকামী একজন দেশপ্রেমিক মানুষ ছিলেন। দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তার অবদান অবিস্মরণীয়।”

প্রয়াত অধ্যাপকের ছাত্র হিসেবে নিজের প্রথম জীবনের স্মৃতি তুলে ধরে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ব্যক্তিগত জীবনে তার ছাত্র ছিলাম, যখন স্যারের শিক্ষকতা জীবনের প্রথম দিক। পরবর্তী সময়ে আমি যখন প্রথমবার মন্ত্রী হলাম, তখনও স্যারের কাছে আসতাম। যতবারই ঢাকার বাইরে থেকে পেশাগত কাজ শেষে ফিরতাম, স্যারের কাছে ছুটে আসতাম। ওনার কাছে বসলে মনে হত যেন এক পরম শান্তিময় বটবৃক্ষের নিচে বসে আছি। তিনি সবসময় দেশ, মানুষ এবং শোষিত মানুষের সংগ্রামের কথা বলতেন।”

২০১৫ সালে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হাতে নিহত অধ্যাপক ফজলুল হকের একমাত্র ছেলে ও জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপনের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “তার একমাত্র ছেলে দীপনকে যখন একটা উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী নৃশংসভাবে হত্যা করল, তিনি কিন্তু তখন প্রতিশোধের পথে হাঁটেননি, প্রচলিত অর্থে রাষ্ট্রীয় বিচারও চান নাই। তিনি এক অনন্য উচ্চতা দেখিয়ে বলেছিলেন মানুষের দেশের জন্য আমি তাকে উৎসর্গ করে দিলাম। এমন স্থির ও আলোকিত মানুষ এই দেশে, এমনকি পৃথিবীতেই খুব বিরল।”
সংস্কৃতিমন্ত্রী তার পরবর্তী করণীয় নিয়ে বলেন, “স্যারের অগণিত ছাত্র-ছাত্রী এখনো দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছেন। আবুল কাসেম ফজলুল হক সাহেবের এই স্মৃতিকে অম্লান ও চিরস্থায়ী করে রাখার জন্য আমাদের সবারই কিছু করা দরকার। আমি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে এবং তার একজন ছাত্র হিসেবে স্যারের আদর্শ ও স্মৃতি রক্ষার্থে যা যা করা প্রয়োজন, তা করব।”

স্মারকগ্রন্থ ও জাতীয় শোকসভার পরিকল্পনা
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম তার শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বলেন, “অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন আমাদের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাবন্ধিক, চিন্তক এবং সাহিত্য সমালোচক। বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি প্রায় নিয়মিতই এখানে আসতেন। কোনো আনুষ্ঠানিক কাজ না থাকলেও তিনি আসতেন, লিখতেন, বলতেন এবং দেশ-বিদেশের বহু মানুষ তার কাছে ছুটে আসতো। তিনি প্রায়শই আমাকে একাডেমি পরিচালনার ক্ষেত্রে নানামুখী কল্যাণকামী ও আদর্শিক পরামর্শ দিতেন।”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মহাপরিচালক বলেন, “এখন তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। আমাদের প্রধান কাজ হবে তার লেখালেখি পড়া, সেগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করা এবং তার যাপিত আদর্শবাদী জীবনকে অনুসরণ করা। বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে আমরা দ্রুতই তাঁর স্মরণে একটি জাতীয় শোকসভার আয়োজন করার চেষ্টা করব।
“এর পরের ধাপে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে স্যারের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি বিস্তারিত ও মানসম্পন্ন ‘স্মারকগ্রন্থ’ প্রকাশের পরিকল্পনা করা, যেখানে তাঁর সামগ্রিক মূল্যায়ন ও শ্রদ্ধানিবেদন স্থান পাবে।”

মোহাম্মদ আজম আরও বলেন, “তিনি সারাজীবন সাহিত্যতত্ত্ব, রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজ নিয়ে লিখেছেন। তার সেই গণতান্ত্রিক ও উদারনৈতিক মূল্যবোধের ব্যাপারে চারপাশের মানুষকে সচেতন করতে পারলেই তার প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা নিবেদন করা সম্ভব হবে।”
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদন ও জানাজা শেষে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহ সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়।
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে।
এরপর দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে এবং সেখানেই শেষ শয্যায় শায়িত হবেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।