Published : 24 Nov 2025, 06:06 PM
ধর্মেন্দ্রর আগে ভারতীয় সিনেমার নায়ক মানেই ছিল ট্র্যাজিক হিরো!
সেই মলিন পর্দায় একদিন আবির্ভাব হল এক অন্যরকম যুবকের। তিনি শার্ট খুলে ফেললেন, জাহির করলেন পৌরুষ।
তার গ্রিক দেবতার মত চেহারা আর গর্বিত পৌরুষের দ্যুতি এমন এক জাদুতে দর্শককে মোহাবিষ্ট করল, যা আগে খুব কম নায়কের ক্ষেত্রেই ঘটেছে।
তার কারিশমায় ভারতীয় চলচিত্রের চালচিত্র বদলে গেল। সিনেমা পেল এক নতুন ধর্ম–হিন্দিতে বললে–‘ধরম’।

‘গরম’, ‘নরম’–তাকে বর্ণনা করতে বিশেষণের কমতি ছিল না। তাকে বলা হত গ্রিক দেবতা, মাটির ছেলে, ফ্যামিলি ম্যান। সবচেয়ে বড় কথা, তার মনটাও ছিল পর্দার মতই খোলা। প্রতিটি বিশেষণই তার গায়ে ঠিকঠাক পোশাকের মত এঁটে যেত।
নব্বই বছরের জীবন তিনি বাঁচলেন অকুণ্ঠ ভালোবাসায়, বাঁচলেন কোটি দর্শকের হৃদয়ের নায়ক হয়ে। এমন এক জীবন তিনি যাপন করে গেলেন, যে জীবনে ‘আগামীকাল’ বলে কিছু নেই।
পর্দায় যখন তিনি সেই ‘সিটি মার’ সংলাপ আউড়াতেন, হাততালিতে ভাসিয়ে দিত দর্শক। ছয় দশক জুড়ে তিন শতাধিক সিনেমায় তিনি সেই জাদু ছড়িয়ে গেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের কয়েক প্রজন্মের দর্শককে তিনি করে রেখেছেন মোহাবিষ্ট।

২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর, নব্বইতম জন্মবার্ষিকীর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে, ধর্মেন্দ্র তার অগণিত দর্শককে শেষবারের মত বিদায় জানালেন।
এক স্বপ্নপূরণের গল্প
পাঞ্জাবের লুধিয়ানার নসরালি গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারের ছেলে ধর্মেন্দ্র কেভল কৃষ্ণ দেওল। ১৯৪৮ সালে মুক্তি পাওয়া দিলীপ কুমারের ‘শহীদ’ সিনেমা দেখে তার মনে দানা বাঁধে নায়ক হওয়ার স্বপ্ন।
শৈশবে সাইকেলে চড়ে ঘুরে বেড়াতেন গ্রামের পথে পথে। খুঁজতেন, কোথাও নিজের মত দেখতে কাউকে সিনেমার পোস্টারে দেখা যায় কি না! রাতে যখন শুয়ে থাকতেন, মাথায় ঘুরত বম্বের রঙিন জগতের স্বপ্ন।
ধর্মেন্দ্র নিজেই বলেছিলেন, “অসম্ভব স্বপ্ন দেখতাম। সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করতাম–আমি কি কখনও দিলীপ কুমারের মত হতে পারব?”
তিনি জানতেন না সেই স্বপ্ন তাকে কোথায় নিয়ে যাবে।
১৯৫৮ সালে ফিল্মফেয়ারের ট্যালেন্ট কনটেস্টে প্রথম হলেন ধর্মেন্দ্র। আয়োজকদের প্রতিশ্রুতি ছিল, এ প্রতিযোগিতার বিজয়ীকে নায়ক করে মুক্তি পাবে নতুন সিনেমা।
কিন্তু সেই সিনেমা আর হল না। তার নিয়তি লিখেছিল অন্য গল্প।
দুই বছর অপেক্ষার পর ১৯৬০ সালে অর্জুন হিংগোরানির ‘দিল ভি তেরা হম ভি তেরে’ দিয়ে শুরু হল ধর্মেন্দ্রর বলিউডযাত্রা।
১৯৬৬ সালে মুক্তি পায় ধর্মেন্দ্র অভিনীত প্রথম বাংলা সিনেমা পারি। ১৯৭২ মুক্তি পায় এর হিন্দি সংস্করণ অনোখা মিলন। দুই সিনেমাতেই নিজের আইডল দিলীপ কুমারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয় ধর্মেন্দ্রর। দিলীপ কুমারকে তিনি কাছে পেয়েছেন বড় ভাইয়ের মত।
শুরুর সংগ্রাম
পথটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রযোজকদের অফিসে হাঁটতে হাঁটতে জুতো ক্ষয়ে গেছে। এমনও হয়েছে, কয়েকদিন পেটে পড়েছে কেবল ছোলা।

সেইসব দিনের স্মৃতি স্মরণ করে ধর্মেন্দ্র বলেছিলেন, “মুম্বাইয়ে প্রথম দিকে গ্যারাজে থাকতাম। থাকার ভালো কোনো জায়গা ছিল না। একটা ড্রিলিং ফার্মে কাজ করতাম, বেতন দিত ২০০ রুপি। বাড়তি আয়ের জন্য ওভারটাইম করতাম।”
বাস্তব জীবনের সেই সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের চরিত্র নিয়ে তিনি বহুবার হাজির হয়েছেন পর্দায়। ষাটের দশকে তার প্রথম দিককার ‘আনপাড়’, ‘বন্দিনি’, ‘অনুপমা’, ‘আয়া সাওয়ান ঝুমকে’ সিনেমায় এরকম ভূমিকাতেই তাকে দর্শক দেখেছে।
সেই ‘কমন ম্যান’ ধর্মেন্দ্র পরে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ‘মাচোম্যান’। ‘শোলে’, ‘ধর্মবীর’, ‘ফুল অউর পাথ্থর’, ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’, ‘সীতা অউর গীতা’ সিনেমায় ধর্মেন্দ্রর চরিত্রগুলো রীতিমত সাড়া ফেলে দেয়।

১৯৬৬ সালের ‘ফুল অউর পাথ্থর’ তার প্রথম মেগা হিট, যেখানে শার্ট ছাড়া উন্মুক্ত উর্ধাঙ্গ দেখিয়ে তিনি দর্শককে হতবাক করে দেন। একইসঙ্গে জোটে প্রশংসা আর সমালোচনা।
‘আমি জানি না গ্রিক দেবতা বলতে কী বোঝায়’
এক সাক্ষাৎকারে ধর্মেন্দ্র বলেছিলেন, “আমাকে মানুষ গ্রিক দেবতা বলত, কিন্তু সত্যি বলতে আমি জানতামই না এর মানে কী।
“আমি কোনোদিন নিজের ইমেজ আঁকড়ে ধরে থাকিনি। দর্শক যে ভালোবাসা দিয়েছে, তার নেশায় কখনও বুঁদ হইনি। ভালোবাসা আমাকে মাটি দিয়েছে, আমি তা শেকড়ের মত আঁকড়ে রাখার চেষ্টা করেছি।”
ঊনিশশ ষাট ও সত্তরের দশকের অন্য অনেক অভিনেতার মতই জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মেন্দ্রর অভিনয়ও ধীরে ধীরে ‘হিরো-ইমেজ’ নির্ভর হয়ে যায়, যেখানে তার ‘হি-ম্যান’ ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে সংলাপভিত্তিক নাটকীয় অভিনয় হলভরা দর্শকদের শিস আর তালি কুড়াত।
তবে উষ্ণ, আবেগময় অভিনয়শৈলী তাকে এনে দেয় ‘গরম ধরম’ খেতাব। পরে সেই ডাকনাম ব্যবহার করেই তিনি শুরু করেন বলিউড থিমের রেস্তোরাঁ চেইন ‘গরম ধরম ধাবা’।
‘মাচো ম্যান’, যে প্রেমে পড়েছিল ‘ড্রিম গার্লের’
সত্তর ও আশির দশকে বড় পর্দার বাইরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ধর্মেন্দ্র। আর সেটা হেমা মালিনীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কারণে।

‘শোলে’, ‘সীতা অউর গীতা’, ‘ড্রিম গার্ল’সহ বহু সিনেমায় একসঙ্গে কাজ করতে করতে কখন যেন তারা প্রেমে জড়িয়ে পড়েন।
প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌরের ঘরে তখন ধর্মেন্দ্রর চার সন্তান–সানি, ববি, অজীতা, বিজেতা। হেমা মালিনীকে তিনি বিয়ে করেন ১৯৮০ সালে। গুঞ্জন ছিল, হেমাকে বিয়ে করতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন ধার্মেন্দ্র। তাদের সংসারে জন্ম নেয় দুই কন্যা–এশা আর অহনা।

বলা হয়, ধর্মেন্দ্রই ছিলেন সালমান খানের বডিবিল্ডিং–অনুপ্রেরণা। তবে সেই পেশীবহুল কঠিন আবরণের আড়ালে ছিল কোমল এক মানুষ, যাকে পাওয়া গেল হৃষিকেশ মুখার্জির ‘গুড়ি’ আর ‘চুপকে চুপকে’ সিনেমায়।
আশির দশকে ‘নওকর বিবি কা’, ‘গুলামি’, ‘ইনসানিয়ত কে দুশমন’, ‘লোহা’ সিনেমায় আবার ফিরে আসে ধর্মেন্দ্রর জনপ্রিয়তা। নব্বইয়ের দিকে সেই জৌলুসে ভাটার টান এলেও নিজেকে বদলে ধর্মেন্দ্র হয়ে ওঠেন ‘চরিত্রাভিনেতা’।
১৯৮৩ সালে বিজয়তা ফিল্মস নামে নিজের প্রোডাকশন হাউস খোলেন ধর্মেন্দ্র। ছেলে সানি দেওলকে ‘বেতাব’ সিনেমায় পর্দায় এনে শুরু হয় তার চলচ্চিত্র ব্যবসার নতুন অধ্যায়। ১২ বছর পর ছোট ছেলে ববি পর্দায় আসেন ‘বারাসাত’ সিনেমা দিয়ে।

বাবার পথ ধরেই সানি দেওল খোলেন সানি সাউন্ড প্রাইভেট লিমিটেড, ২০১৯ সালে নিজের ছেলে করণ দেওলকে পর্দায় আনেন ‘পল পল দিল কে পাস’ সিনেমা দিয়ে। এই নামটি নেওয়া হয়েছিল ধর্মেন্দ্র অভিনীত ১৯৭৩ সালের ‘ব্ল্যাকমেল’ সিনেমার তুমুল জনপ্রিয় এক গানের লাইন থেকে।
রাজনীতিতে পদার্পণ

পর্দার তারকা ধর্মেন্দ্র জড়িয়েছেন রাজনীতিতেও, যদিও সে অধ্যায় ছিল সংক্ষিপ্ত। বিজেপির টিকেটে ২০০৪ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত রাজস্থানের বিকানারের এমপি ছিলেন তিনি।
ভোটের প্রচারে তিনি মজা করে বলেছিলেন, তাকে আজীবনের জন্য নির্বাচিত করা উচিত, যাতে তিনি গণতন্ত্রের মৌলিক শিষ্টাচার শেখাতে পারেন।

২০১২ সালে ‘পদ্মভূষণ’ পদকে ভূষিত এই অভিনেতাকে পার্লামেন্টে অনুপস্থিতির জন্য সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল।
অকৃত্রিম
২০২৩ সালে ‘রকি আউর রানি কি প্রেম কাহানি’তে স্মৃতিভ্রষ্ট এক বৃদ্ধের চরিত্রে অভিনয় করে নতুন করে আলোচনায় আসেন ধর্মেন্দ্র। তার শেষ সিনেমা ইক্কিস মুক্তি পাবে ২৫ ডিসেম্বর। এ সিনেমায় তিনি আবারও কাজ করেছেন পরিচালক শ্রীরাম রাঘবানের সঙ্গে, যিনি ‘জনি গাদ্দার’ বানিয়েছিলেন।
পরিবারের জন্য ধর্মেন্দ্রর ছিল প্রবল টান। ‘অ্যানিমাল’ সিনেমায় ববি দেওলের অভিনয়ের প্রশংসায় তিনি ছিলেন পঞ্চমুখ। সানি দেওলের সাফল্যে তিনি গর্ব প্রকাশ করেছেন প্রকাশ্যেই। সোশাল মিডিয়ায় নাতিকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। তার এক্স পোস্টে বার বার এসেছেন স্ত্রী হেমা মালিনী।

২০২০ সালে যখন কৃষক আন্দোলনে পুরো ভারত সরগরম, ধর্মেন্দ্র সেই গুটিকয় বলিউড তারকার একজন, যিনি কৃষকদের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হয়েছিলেন। বিজেপির এমপি হয়েও তিনি লিখেছিলেন, “কৃষক ভাইদের কষ্ট দেখে মন ভেঙে যায়।”
ইনস্টাগ্রামে প্রায়ই তিনি নিজের খামার, শাকসবজি আর গবাদিপশুর ছবি শেয়ার করতেন, যারা ছিল তার সন্তানের মত।
এবং আরো একটি পরিচয় ছিল ধর্মেন্দ্রর। উর্দু ভাষায় কবিতা লিখতেন তিনি।
‘ফুল আউর পাথর’ সিনেমায় মীনা কুমারীর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে শায়েরির প্রেমে পড়েন ধর্মেন্দ্র। নিজের কবিতা নিয়ে ভিডিও বানানোর ইচ্ছাও ছিল তার।
এক সাক্ষাৎকারে ধর্মেন্দ্র বলেছিলেন, “আমি একজন শায়ের। মানুষ যা অনুভব করে, আমি তা নিয়েই লিখি। কবির লেখা কৃত্রিম হলে সে কবিতা মানুষকে ছুঁতে পারে না। আমার শায়েরি সার্বজনীন।”
সোশাল মিডিয়ায় এক্স ও ইনস্টাগ্রামে ভক্তদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপে যুক্ত হতেন এই বলিউড তারকা। নিজের স্বাস্থ্যের খোঁজ খবর জানাতেন। ভালোবাসা আর শান্তির বার্তা শেয়ার করতেন।
আজকের দিনে যেখানে তারকাদের সোশ্যাল মিডিয়া সামলাতে আলাদা টিম কাজ করে, সেখানে ধর্মেন্দ্র নিজেই প্রকাশ করতেন নিজের মনের অনুভূতি।
তিনি ছিলেন অকৃত্রিম; জীবনে যেমন, পর্দাতেও তেমনই।
[এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুসরণে]