তরুণ প্রজন্মের সাম্প্রতিক কাওয়ালি আয়োজনে ‘মাধুর্য ও ভাবরস ভাসিয়ে দিয়ে’ এবং গায়কির মূল ঢঙে ‘পরিবর্তন এনে’ যেভাবে গাওয়া হচ্ছে, তাতে এই সংগীত স্বকীয়তা হারাতে বসেছে।
Published : 11 Oct 2024, 09:19 AM
দুবছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র টিএসসির সামনে কাওয়ালির আসরে হামলার পর ফেইসবুকে কাওয়ালির ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে ‘জবাব’ দিয়েছিলেন অনেকেই।
এবারে গণঅভ্যুত্থানে সরকার হঠানোর পর ফের কাওয়ালির আয়োজন হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে ‘বুড়ো আঙুল দেখাতে’ বিদ্রোহের গান হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কাওয়ালির আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কাওয়ালি সংগীতের আয়োজক হিসেবে পরিচিত মীর হুযাইফা আল মামদূহ।
তবে কাওয়ালি সংগীতের গবেষক, শিল্পী এবং দর্শকরা বলেছেন, তরুণ প্রজন্মের সাম্প্রতিক আয়োজনে ‘মাধুর্য ও ভাবরস ভাসিয়ে দিয়ে’ এবং গায়কির মূল ঢঙে ‘পরিবর্তন এনে’ যেভাবে কাওয়ালি গাওয়া হচ্ছে, তাতে এই সংগীত স্বকীয়তা হারাচ্ছে।
আধ্যাত্মিক বা সুফি ঘরানার সঙ্গে সম্পর্কিত কাওয়ালি কীভাবে ‘বিদ্রোহের গান’ হয়ে উঠল, তা বুঝতে কাওয়ালি শিল্পী, শিক্ষক ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলেছে গ্লিটজ।
সেই আলাপচারিতায় উঠে এসেছে কাওয়ালির ইতিহাস এবং শিল্পীদের হালহকিকত।
স্বকীয়তা থাকছে তো?
বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারি ও নজরুল-রবীন্দ্রনাথসহ পঞ্চকবির গানের এই দেশে স্বাধীনতার পর থেকে ব্যান্ড সংগীত উন্মাদনা ছড়ালেও বৃহৎ পরিসরে কাওয়ালির চর্চা দেখা যায়নি।রাজধানীতে এই ঘরানার গানের চর্চা আটকে ছিল মূলত পুরান ঢাকাতেই।
সাম্প্রতিক সময়ে ২০২২ সালে টিএসসিতে কাওয়ালির আসর সাড়া ফেলেছিল। ওই অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিলেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ।
গ্লিটজকে তিনি বলেন, "ওইবারের কাওয়ালি অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগ হামলা করে পণ্ড করে দেয়। হামলার প্রতিবাদে ওই ঘটনার ঠিক পরের দিন থেকে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাওয়ালির আয়োজন করা হয়। তখন কাওয়ালিটা প্রতিবাদের সুর বা বিপ্লব হয়ে গিয়েছিল।
“সেই বিপ্লবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জুলাই বিপ্লবের পর আনন্দ উৎসব করতে কাওয়ালির আয়োজন করা হচ্ছে। কারণ গত ১৫ বছর তো কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে পারেনি। তাই কাওয়ালি আয়োজনে এত উৎসাহ জেগেছে শিক্ষার্থী-শিল্পীদের মধ্যে।“
ক্ষমতায় থাকার সময় আওয়ামী লীগ কাওয়ালি ছাড়া সংগীতের আর কোনো অনুষ্ঠানে ‘বাগড়া দেয়নি’ বলেও মন্তব্য মামদূহের।
তিনি বলেন, “এখন যারা আয়োজন করছে তারা মনে করছে, কাওয়ালি সংগীতের আয়োজন করলে আওয়ামী লীগের গায়ে জ্বালা ধরবে বেশি। এ ধরনের একটা ধারণা থেকে তরুণা কাওয়ালি বিপ্লব শুরু করে দিল।”
তবে এখনকার আয়োজনে কাওয়ালির স্বকীয়তা বা বৈশিষ্ট্য ‘অটুট থাকছে না’ বলেও মনে করেন মামদূহ।
‘ভুল ধারায়’ কাওয়ালির চর্চা হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেভাবে কাওয়ালি সন্ধ্যা করছে, এটা মূল ধারার কাওয়ালি না, তারা ধরে নিচ্ছেন এটা কোনো আধুনিক কালচার। যারা উপভোগ করছেন তারাও কিন্তু এর মহত্ব জানেন না। ফলে যাই গাওয়া হচ্ছে, নাম দেওয়া হচ্ছে কাওয়ালি সন্ধ্যা। আনন্দে মাতোয়ারা হওয়া, তাল তুলে নাচা এসব কাওয়ালি না।"
হঠাৎ করে তরুণরা কাওয়ালিতে মাতল কেন– এমন প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষক সাইম রানা বলেন, এই জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে কাওয়ালির নির্দিষ্ট কিছু সংগীতের জন্য।
“যে কাওয়ালি গানগুলো বিভিন্ন সময়ে সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছে এবং এখন যেহেতু সামাজিকীকরণের যুগ তরুণ প্রজন্ম সামাজিক মাধ্যমে যতটুকু শুনতে পাচ্ছে, সেটা নিয়েই মেতে উঠছে।"
এর সঙ্গে রাজনীতির যোগটা কোথায়, সেই প্রশ্নে রানার উত্তর, “যারা গাইছে তারা কিন্তু একবারে কাঁচা গান গাইছেন না। তারা যে সুর, তাল দিয়ে পারফর্ম করছেন, এটাও প্রস্তুতি নিয়ে গাইছেন। এই যে চর্চা বা প্রস্তুতি তা এই জুলাই বিপ্লবের পর তিন মাসেই তৈরি হয়নি। এটা দীর্ঘদিনের একটা চর্চার ফলে হয়েছে, যেটা এতদিন ফ্রন্টলাইনে আসেনি; দমন করা হয়েছিল।”
এই শিক্ষকও ২০২২ সালের কাওয়ালির আয়োজনে হামলার সঙ্গে এখনকার ‘কাওয়ালি উন্মাদনার’ যোগসূত্র দেখছেন।
“তখন আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ‘পাকিস্তানি সংস্কৃতির পুনর্জন্ম ঘটাচ্ছে’ এমন তকমা দিয়ে। তখন থেকেই কাওয়ালি চর্চাটা তরুণদের মধ্যে আবার সামনে আসে।”
তবে এখন যেভাবে কাওয়ালি গাওয়া হচ্ছে, তা ‘সঠিক ধারা মেনে হচ্ছে না’ বলে মনে করেন এই শিক্ষক।
তিনি বলেন, কাওয়ালির সঠিক ধারা ও শিল্পীদের টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতি আছে।
“কাওয়ালি সংস্কৃতি যে মানুষ হঠাৎ করে বন্ধ করে দিয়েছে তা নয়। প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে দিন দিন যেভাবে অনেক কিছুর পরিবর্তন হচ্ছে, সেভাবে কাওয়ালি সংস্কৃতিটাও চাপা পড়ে যাচ্ছে।
“যেমন গ্রামের যাত্রা পালার দল আর নেই, বিয়ে বাড়িতে যে ব্যান্ড বাজানো হত, সেগুলো এখন খুব একটা নেই। একইভাবে কাওয়ালির যে দলগুলো ছিল, তারাও আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে গেছে।”
লোক সংস্কৃতি গবেষক, লেখক ও বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সাইমন জাকারিয়া বলছেন, জুলাই বিপ্লবের পরে অনেক কিছু নতুন করে পরিচিত করার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
“বাংলাদেশে কিন্তু মাজারকেন্দ্রিক কাওয়ালির ঐতিহ্য রয়েছে। মোহাম্মদপুরে মাজারগুলেতে আমি কাওয়ালি শুনেছি, সেখানে উর্দুর পাশাপাশি বাংলা কাওয়ালিও হয়। কেরানীগঞ্জের দেওয়ানবাড়ীতেও বাংলা কাওয়ালি শুনেছি। এটা নিয়ে তারা অনেক চর্চা করে। এই চর্চাটা কিন্তু মাজারে হয়।
"এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সংস্কিৃতিটা যে বা যারা নিয়ে আসতে চান, তারা কী এর ঐতিহ্যবাহী ধারার চর্চাকারী, নাকি দেশের প্রচলতি সাংস্কৃতিক ধারার বদলে ইসলামিক সংস্কৃতির চর্চা করতে চাইছেন, তা ভাববার বিষয়।“
এই গবেষক বলেন, “একদিকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাওয়ালি হচ্ছে, তখন আরেক দিকে মাজার ভাঙা হচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আবার কেউ কেউ জাতীয় সংগীতেরও পরিবর্তন আনতে চায়। তাহলে কি কেউ আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে পাশ কাটিয়ে অন্য কোনো ধারাকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছে?"
সাইমন জাকারিয়া মনে করেন, দেশে প্রচলিত সব ধারার সংগীতের চর্চাই বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
কাওয়ালিতে নতুন ধারা?
গত কিছুদিনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাওয়ালির আসরে যে দলগুলো পারফর্ম করছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হল ‘কাসিদা’, নিজেদের তারা কাসিদা ব্যান্ড বলতেই পছন্দ করেন।
এ দলের প্রতিষ্ঠাতা মো. শাহিনুর রহমানও বললেন, কাওয়ালি সংগীতের আদি ধারায় তারা বিচরণ করছেন না; আর এর কারণও তিনি ব্যাখ্যা করলেন।
শাহিনুর গ্লিটজকে বলেন, "আমার দলে ১৪ জনের মতো আছে। আগের ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালির ধারা মেনে আমরা গান করছি না। বলিউডকেন্দ্রিক কিছু জনপ্রিয় কাওয়ালি গান আছে, আমরা সেগুলোই করছি, যেটা মডার্ন ইন্সট্রুমেন্টের সাথে গাওয়া হচ্ছে।
“এর কারণ হল, আমি আমার জেনারেশনের পালসটা জানি, তারা কোন ধরনের মিউজিক পছন্দ করে সেটা বুঝি। তাদের রুচি, মিউজিক সেন্স, আমাদের কাছে ম্যাটার করে বলে আমরা সেটাকেই ফোকাস করছি।”
কাসিদা ব্যান্ডের প্রধান বলেন, “আমি মনে করি ঐতিহ্যবাহী যে কাওয়ালি আছে, সেটা এই জেনারেশনের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। তাই আমরা চেষ্টা করছি ট্র্যাডিশনাল কাওয়ালিকে মডার্ন ইন্সট্রুমেন্টের ফিলে নিয়ে আসার। যেটা এই জেনারেশনের কাছে পৌঁছাবে। আমাদের দর্শক দেখলেই বুঝতে পারবেন এরা সবাই তরুণ। নতুন প্রজন্ম। তাই আমরা নতুন ধারায় এই গান করছি।"
আরেক কাওয়ালি ব্যান্ড দল 'সিলসিলা'র প্রতিষ্ঠাতা ও শিল্পী খালিদ হাসান আবিদ বলেন, “কাওয়ালি গান তো জটিল একটা বিষয়। যারা মূল শিল্পী, তারা তো বংশগতভাবে যুগের পর যুগ চর্চা করে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে আমাদের মেলালে হবে না। আমরা তো তাদের মত শতভাগ দিতে পারব না।
"আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন মিলে ২০১৯ সালে 'সিলসিলা' ব্যান্ড নামে চর্চা শুরু করি। আমরা মূল কাওয়ালি গানের সাথে এত পরিচিত না৷ জনপ্রিয় দুই একটা গান যেমন 'তাজেদার-ই- হারাম', 'কুন ফায়া কুন' এগুলো চর্চা করতাম, আর এগুলোই এখন দর্শকরা শুনতে চায়। স্টেজে যখন এক ঘণ্টার জন্য উঠি, তখন কিন্তু শ্রোতারাই বলে দেয় এই গানগুলো গান।”
সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, “সমালোচকদের অনেক চাওয়া থাকে। তবুও আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করছি। আমাদের সময় দিলে হয়ত আরো ইম্প্রুভ করব। নতুন গান সবাইকে শোনাতে পারব।"
ছোট ছোট পরিসরে ছড়িয়ে কাওয়ালি
বাংলাদেশে কাওয়ালির ইতিহাস অনেক পুরনো। আধ্যাত্মিক বা সুফি গান হিসেবে কাওয়ালি গাওয়া হত; যেমন কাসিদা, মিলাদ, গজলকেও কাওয়ালি ধরা হত।
শিক্ষক সাইম রানা বলেন, একটা সময় পুরান ঢাকায় এবং মোহাম্মদপুরের বিহারিপট্টিতে নিয়মিত কাওয়ালি চর্চা হত। চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডারি গান, খাজা বাবার গানও পরিচিত ছিল কাওয়ালি হিসেবে।
এসব জায়গার বহু শিল্পী একটা সময়ে কাওয়ালিকে পেশা হিসেবে নিয়ে জীবন জীবিকা চালিয়েছেন।
শিল্পীরা জিকির বা চিৎকার করে প্রভু বা মাওলাকে ডেকে ডেকে কাওয়ালি গাইতেন।
সাইম রানা বলেন, মধ্যযুগে যখন দেশে দেশে ইসলামের প্রচার শুরু হয়, তখন থেকে কাওয়ালি গানের চল শুরু। পারস্যের সুফি সাধক খাজা মইনুদ্দিন চিশতী এই ধর্মীয় গানের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ভারতের আজমীরে মইনুদ্দিন চিশতীর দরগায় এ গানের চর্চা হত।
কাওয়ালির চর্চা আজমীর থেকে প্রসার পায় দিল্লির নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরবারে। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য ছিলেন হযরত আমির খসরু, তিনি কাওয়ালি গানকে একটি চর্চার মধ্যে এনে এর প্রচার ও প্রসার ঘটাতে থাকেন।
ওস্তাদ আমির খসরু কাওয়ালিতে তার পারস্য সংগীতের দক্ষতাকে যুক্ত করে দরবারের উপযোগী সংগীতে রূপান্তর করেন। এজন্য তাকে কাওয়ালি গানের ধারক বলা হত।
খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি, নিজামুদ্দিন আউলিয়া, সেলিম চিশতি, বদরুদ্দীন রিয়াজ, শাহনেওয়াজসহ অনেকেই কাওয়ালি সংগীতের বিকাশে অবদান রেখেছেন।
গত শতকে কাওয়ালিকে দারুণ জনপ্রিয় করে তোলেন পাকিস্তানের নুসরাত ফতেহ আলী খান। আধুনিক সংগীত যন্ত্র ব্যবহার করে সহশিল্পীদের নিয়ে ফতেহ আলী খানের কাওয়ালি গানের অনুষ্ঠান রূপ পায় ধ্রুপদী আসরে।
এছাড়া পাকিস্তানের সাবরি ব্রাদার্স, হাজি গোলাম ফরিদ সাবরি, আবিদা পারভীনসহ অনেক শিল্পী কাওয়ালিকে জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রেখেছেন।
সংগীতের শিক্ষক সাইম রানা বলেন, “বাংলাদেশের প্রচলিত কাওয়ালির ধরন দিল্লি-পাকিস্তানের থেকে ভিন্ন ছিল। পাকিস্তান বা বিভিন্ন অঞ্চলে সুফি সাধকরা সরাসরি ইবাদতের একটি গভীর অংশ হিসেবে এই গান চর্চা করতেন।
“আমাদের দেশে কাওয়ালি গানগুলোতে জলসা বা আসর করে একটা পরিবেশ তৈরি করে গাওয়া হত। পারস্য বা তুর্কির একটা প্রভাব দেখা যায় আমাদের দেশের কাওয়ালি গানের লিরিকে।”
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ফারসি ভাষায় কাওয়ালি গাওয়া হত, আর ঢাকায় গাওয়া হত ঊর্দু ভাষায়। পরে অনেক বাংলা কাওয়ালি তৈরি হয়েছে বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।
তিনি বলেন, খেয়াল সংগীতে কাওয়ালির ধাঁচ আছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের হামদ-নাতেও কাওয়ালির প্রভাব আছে। বর্তমানে বেশ জনপ্রিয় কাওয়ালি গানের মধ্যে আছে ‘ছেড়ে দে নৌকা মাঝি যাব মদিনা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশ কিছু নৃত্যনাট্যের গানে কাওয়ালির সুর ও তাল ব্যবহার করা হয়েছে।
কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার কণ্ঠে 'দমাদম মাস্ত কালান্দার' গানটিও কাওয়ালি হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়। এছাড়া 'দয়াল বাবা কেবলা কাবা আয়নার কারিগর', 'খাজাবাবা খাজাবাবা মারহাবা মারহাবা’সহ বহু গান বিভিন্ন সময়ে কাওয়ালি আঙ্গিকে তৈরি করা হয়েছে।
কাওয়ালিতে কাওয়াল কোথায়?
বেশ কয়েকটি কাওয়ালি আয়োজন ঘুরে দেখা গেছে এসব অনুষ্ঠানে পারফর্ম করছে নতুন কিছু দল।
'কাসিদা', 'সিলসিলা', 'সাওয়ারি', 'কলরব', 'জাগরণ', 'রাবতা', 'রুহ হৃদম' নামের দলগুলো ঢাকা, জগন্নাথ, জাহাঙ্গীনগর, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দেড় মাসে পারফর্ম করেছে।
এই আয়োজন কেবল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েই সামীবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে কলেজ ও স্কুলেও।
টঙ্গীর মজিদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সাংস্কৃতিক ও কাওয়ালি সন্ধ্যার আয়োজন দেখতে গিয়েছিলেন মাহবুব জুয়েল নামের এক ব্যক্তি।
বেসরকারি চাকুরীজিবী জুয়েল নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে গ্লিটজকে বলেন, "কাওয়ালি আসরে কাওয়াল (কাওয়ালি শিল্পীদের কাওয়াল বলা হয়) দেখিনি। কাওয়ালি সাধারণভাবে মন প্রশান্ত করে। কিন্তু ওই আসরে কাওয়ালি হিসেবে যে দুই তিনটা গান করা হল, সেগুলো মনে হল বলিউড বা পাকিস্তানের শিল্পীদের জনপ্রিয় দুয়েকটি গান। এগুলো তো আসল কাওয়ালি না৷ “
অতীতের কাওয়ালি আসরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “সেগুলো অন্যরকম রুহানি প্রশান্তি দিত। এই গানে কাওয়ালির রীতিনীতি কিছুই ছিল না। আমার মনে হয় মূল যে কাওয়াল শিল্পীরা আছেন, তাদের দিয়ে এসব অনুষ্ঠান করা উচিত। আগে অনেক কাওয়াল শিল্পী ছিলেন, এখনো হয়ত তারা আছেন, তাদের দিয়েই গান করানো হোক।"
পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা উদায়ের হোসেন ফাতিন ছোট থেকেই এলাকায় কাওয়ালির আসর দেখে বড় হয়েছেন।
ঈদের চাঁদ রাত, জন্মদিন বা বিয়ে উপলক্ষে তাদের এলাকায় বসত কাওয়ালির আসর। তাছাড়া বেশ কয়েকবার খানকা শরিফের কাওয়ালি আসরে গিয়েছেন তিনি।
স্মৃতিচারণ করে ফাতিন গ্লিটজকে বলেন, "চার পাঁচ বছর ধরে কাওয়ালির আয়োজন কমে গেছে। আমরা সুফি ধরনের কাওয়ালি শুনে এসেছি৷ ঊর্দু ভাষায় ওই কাওয়ালি গাইতেন এক দল লোক। হারমোনিয়াম, তবলা নিয়ে একই ধরনের ড্রেস পরা, টুপি পরা বয়স্ক শিল্পী ছিলেন তারা। এখন কাওয়ালি হচ্ছে কনসার্ট ঘরনার।“
কাজের অভাবে হারাচ্ছে কাওয়াল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইম রানা বলেন, পুরান ঢাকায় কাওয়ালি এসেছে আঠারো শতকে ও নবাবি আমলে। বিয়ে, ওরস, খৎনা, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান, খানকা, মাহফিল, জন্মদিনসহ বহু অনুষ্ঠানে কাওয়ালি পরিবেশনের রীতি ছিল।
সেসময় প্রবাসী কাওয়ালদের কাছ থেকে পুরান ঢাকার শিল্পীরা দীক্ষা নিতেন। পরে তাদের উত্তরসূরি হিসেবে কায়েম রাজা, সালেম রাজা, আমির রাজা, ইভু, কালু, ফতেহ মোহাম্মদসহ অনেকে উর্দু-ফারসি ভাষায় কাওয়ালি গাইতেন।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের কাওয়ালি শিল্পীরা বলছেন, কাওয়ালির আগের ঐতিহ্য ফিকে হয়ে গেছে। এই সংগীতকে জীবিকা হিসেবে নিয়ে সংসার চালাতে ‘হিমশিম খেতে হয়’ বলে অনেকে পেশা বদলেছেন।
আর সম্প্রতি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আয়োজিত কাওয়ালির অনুষ্ঠানও তাদের হতাশ করছে। এর একটি কারণ, তারা এসব আয়োজনে ডাক পাচ্ছেন না। তাদের ভাষ্য, নতুন যারা গান করছেন, সেটা কাওয়ালির মূল ধারা না, এভাবে গান করে কাওয়ালির ‘আধ্যাত্মিক ভাব’ নষ্ট হচ্ছে।
ঢাকার মো. মাশুক কাওয়াল দশজনের একটি দল নিয়ে গত এক যুগ ধরে জেলায় জেলায় কাওয়ালি চর্চা করছেন । আজিমপুর সাজ্জাদবাড়ির বিখ্যাত সামীর কাওয়াল তার ওস্তাদ।
এখনকার কাওয়ালির আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, "ডাক পেয়েছি কিন্তু যাইনি। কারণ আমরা তো উর্দু, ফারসি কাওয়ালি করি। বর্তমানে যে কাওয়ালি করা হচ্ছে, এটা তো মূল কাওয়ালি না। নতুনদের দিয়ে করাচ্ছে। আমরা তো দরবার, খানকাতে কাওয়ালি করি। টিএসসিতে যে কাওয়ালি হচ্ছে সেটা আমরা গাইতে পারি না।
“ওরা গিটার নিয়ে কাওয়ালি গাচ্ছে এটাতো কখনো কাওয়ালির ফর্মের মধ্যেই ছিল না। আমরা আগের মত করেই গাই। তাই তাদের সঙ্গে আমাদের মিলছে না।"
এখন কাওয়ালি করে জীবন ‘চলছে না’ জানিয়ে মাশুক বলেন, "এখন প্রোগ্রাম একদমই বন্ধ হয়ে গেছে, ঘরে বসে আছি। জীবন চলবে কীভাবে বলেন, আমাদের কাজ বন্ধ, কেউ কাজ দেয় না। প্রায় দুই বছর ধরে আমরা কাজ পাচ্ছি না। শুধু আমরা না, আমাদের সঙ্গে আরও যারা কাওয়ালির দল ছিল, তাদের অবস্থাও করুণ।“
চট্টগ্রামে কাওয়ালির ইতিহাস অনেক পুরনো। লোকসংগীত গবেষক নাসির উদ্দিন হায়দার বলছেন, সেখানে কাওয়ালি হত ফারসি, উর্দু ও হিন্দি ভাষার মিশ্রণে।
ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার দরবার, পটিয়ার আমির ভাণ্ডার, লোহাগাড়ার শুকছড়ি দরবারসহ বিভিন্ন দরবারের মাহফিলে সাধনমার্গের অনুষঙ্গ হিসাবে কাওয়ালি পরিবেশিত হয়। চিশতিয়া ঘরানার বিভিন্ন দরবারে কাওয়ালি মাহফিলকে ইবাদত বা প্রার্থনার শামিল ভাবা হয়।
গবেষক হায়দার বলে, চট্টগ্রামের পথিকৃৎ কাওয়াল হলেন প্রয়াত সৈয়দ আবু কাওয়াল, যিনি কলকতার কালু কাওয়ালের শিষ্য; তার মাধ্যমেই চট্টগ্রামে কাওয়ালি চর্চা শুরু হয়।
চট্টগ্রামের শিল্পী আবু সালেহ কাওয়াল জানান, গত আড়াই দশক ধরে পাঁচ-ছয় জনের দল নিয়ে পেশা হিসেবে কাওয়ালি গান করছেন তিনি।
আবু সালেহ গ্লিটজকে বলেন, "চট্টগ্রামে কয়েক বছর আগেও প্রত্যেক মাসে কাওয়ালি আসরের আয়োজন করা হত। অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত আমরা অনেক ব্যস্ত থাকতাম। এখন কাওয়ালি আয়োজনের সময়, অক্টোবর থেকে শুরু হবে।"
তবে কাওয়ালি শিল্পীদের আগের ‘অবস্থা নেই’ জানিয়ে এই শিল্পী বলেন, "কাওয়ালি পেশা হিসেবে নিয়ে জীবন চালানোর মত অবস্থায় আর নেই। অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছে। আমি নিজেও এই পেশা ছেড়ে দেশের বাইরে চলে গিয়েছিলাম। তবে এখনো গান করি, যদি কেউ ডাকে তাহলে যাই।"
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাওয়ালি আয়োজন নিয়ে এই শিল্পী বলেন, "আমাদের কাজ নেই, অথচ চারপাশে কাওয়ালি বিপ্লব চলছে। যে কোনো ধরনের গান গেয়ে সেটা কাওয়ালি হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে।
“সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামও দিচ্ছে কাওয়ালি। এগুলোতে কিন্তু আমাদের মূল শিল্পীদের ডাকা হচ্ছে না। তারা যে নিয়মে গাচ্ছে আমরা এতে সায় দিচ্ছি না। আমরা যারা মূল কাওয়াল তারা কাজের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে।“
চট্টগ্রামের লোকসংগীত গবেষক নাসির উদ্দিন হায়দারও বললেন, ইদানিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাওয়ালি সন্ধ্যায় যা গাওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে ‘মূল কাওয়ালির যোগাযোগ কম’।