Published : 28 Jun 2026, 06:59 PM
গঠনতন্ত্রের ‘শর্ত লঙ্ঘন করে’ নিয়মবহির্ভূতভাবে নতুন ৪০ জনকে পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় 'অনিয়মের অভিযোগ' উঠেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির বিরুদ্ধে।
চলতি মাসের শুরুতেই আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে এই নতুন সদস্যপদ দেওয়া হয়। তবে এসব সদস্যের অনেকের পাঁচটি মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের 'শর্ত পূরণ না করায়' স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে।
বলা হচ্ছে, বর্তমান প্রার্থীর মেয়ে এবং স্ত্রীর পাশাপাশি এমন অনেকে পূর্ণ সদস্যপদ ও ভোটাধিকার পেয়েছেন, যাদের মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার সংখ্যা দুই বা তিন, আবার কারো কোনো সিনেমাই মুক্তি পায়নি।
শিল্পী সমিতির গঠনতন্ত্রের ৫ (ক) ধারায় লেখা রয়েছে, “পূর্ণ সদস্যের তালিকায় বাংলাদেশে মুক্তিপ্রাপ্ত ন্যূনতম পাঁচটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অবিতর্কিত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করিলে তিনি পূর্ণ সদস্য পদের জন্য আবেদন করিতে পারিবেন। কার্যকরী পরিষদে তার আবেদন গৃহীত হইলে তিনি পূর্ণ সদস্য পদ লাভ করিবেন এবং তিনি ভোটাধিকার সহ কার্যকরী পরিষদের যে কোন পদের জন্য যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইবেন। পূর্ণ সদস্য পদের জন্য আবেদনকারীকে পেশাগতভাবে অবশ্যই 'চলচ্চিত্র অভিনয় শিল্পী' হইতে হইবে। ”

'গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে' নতুন সদস্য পদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে সমিতির সদস্য এবিএম সোহেল রশিদ গ্লিটজকে বলেন, শিল্পী সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পাঁচটি সিনেমায় কাজ না করলে সদস্য পদ দেওয়ার নিয়ম নেই।
“কিন্তু এবার সম্পূর্ণ নিয়ম লঙ্ঘন করে প্রায় ৪০ জন নতুন সদস্য নেওয়া হয়েছে। বর্তমান কমিটির একটি প্যানেলের সহ-সভাপতি তার পদের প্রভাব খাটিয়ে স্নেহবশত নিজের মেয়েসহ পরিচিতদের মেম্বার বানিয়েছেন। যেখানে মেয়ে শিশুশিল্পী হিসেবে সিনেমায় কাজ করেছেন।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের সময়ে ৫০-৬০টি সিনেমা করার পর, দুই-তিন বছর চেষ্টা করে মেম্বার হতে হয়েছিল। আর এখন নিয়ম ভাঙার এই সংস্কৃতি চলছে। এখানে নতুন সদস্যদের মধ্যে প্রার্থীদের একজনের স্ত্রীও আছেন, যার পাঁচটি সিনেমা করা হয়নি কিন্তু পূর্ণ সদস্যপদ পেয়েছেন। আরও অনেকজন আছে যাদের সদস্যপদ হওয়ার জন্য যোগ্যতা তৈরি হয়নি কিন্তু সদস্য হয়ে গেছেন।"
এই ঘটনায় কোনো অভিযোগ করেছেন কি না প্রশ্নে রশিদ বলেন, "প্রতিবাদ জানিয়েছি, আর এখানে তো সুযোগ নাই অভিযোগ জানানোর। শিল্পী সমিতির এজিএম-এ আমরা কেউ কেউ দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম, কিন্তু প্রভাবশালীদের সংখ্যা বেশি থাকায় আমরা আসলে কিছু করতে পারিনি।"

শিল্পী সমিতির সদস্য কিন্তু ভোটাধিকার প্রাপ্ত হননি, এমন একজন সদস্য গ্লিটজকে বলেন, "সিনেমা করে নাই, কাজ করে না এমন অনেক সদস্য হয়েছে নতুন, যাদেরকে আমরা চিনি না। পরিচিত আর টাকা থাকলেই এখানে সদস্য হওয়া যায়। অথচ আমরা পুরাতন সদস্য হয়েও ভোট দিতে পারছি না। সিনেমা নেই, কাজ নেই, চাঁদার টাকা দিতে পারিনি।"
নতুন সদস্যদের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, সমিতির ৫৩৪ নম্বর সদস্য হয়েছেন মোহাম্মদ বাবুল, যিনি মুন্না খান নামে পরিচিত। তার মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার সংখ্যা দুইটি, সেগুলো হচ্ছে ‘ডার্ক ওয়ার্ল্ড’ এবং ‘তছনছ’।
প্রযোজক থেকে শিল্পী সমিতির সদস্য হয়েছেন মিয়া মোহাম্মদ সেলিম। তিনি গ্লিটজকে বলেন, "আমি আগে চার পাঁচটি সিনেমা প্রযোজনা করেছি। এত বছর সমিতির সদস্য হইনি।"
প্রযোজক হয়েও কী শিল্পী সমিতির সদস্য হওয়া যায় প্রশ্নে তিনি বলেন, "আমি সেসব সিনেমায় টুকটাক অভিনয়ও করেছি, ‘রাজু আমার ভাই’ ও ‘অস্ত্র ছাড়ো কলম ধরো’ এসব আমার সিনেমা।"
পূর্ণ সদস্যপদ পেয়েছেন জান্নাতুল ফেরদৌস সানঞ্জানা। তবে তার অভিনীত কোনো চলচ্চিত্র এখনো মুক্তি পায়নি।
এ বিষয়ে জানতে ফেরদৌস সানঞ্জানার মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
চিত্রনায়িকা রোমানা নীড়ও নতুন সদস্যদের তালিকায় রয়েছেন। তিনি গ্লিটজকে বলেন, তার অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো হলো ‘ভালোবাসলে দোষ কী’ এবং ‘উতলা মন, 'এদেশ তোমার আমার', 'রাস্তার ছেলে'। 'হিমুর বসন্ত' ও 'ভালোবাসি কত বুঝাব কেমনে' সিনেমা দুইটি সেন্সর সার্টিফিকেশন ছাড়পত্র পেয়েছে তবে হলে মুক্তি পায়নি।
তবে বাংলা মুভি ডাটাবেজে 'রাস্তার ছেলে' সিনেমার অভিনয়শিল্পী হিসেবে রোমানা নীড়ের নাম পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ পূর্ণ সদস্যপদ পেতে পাঁচটি মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রে অভিনয়ের শর্ত পূরণ করেননি। নীড় একটি প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী জয় চৌধুরীর স্ত্রী।
একইভাবে সনিয়া অমিদ মিতু, সুস্মি রহমান, শাহ হুমায়রা হোসেন সুবহা, মো. মামুন, নজরুল ইসলাম রাজ, মোহাম্মদ মনির হোসেন যুবরাজসহ আরও কয়েকজন সদস্য হয়েছেন যাদের পাঁচটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করা হয়নি।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা এবং অভিযোগ উঠেছে অভিনেতা ডি এ তায়েবের মেয়ে দেওয়ানজাদী তুসমি তায়েফ টুনটুনিকে নিয়ে। শিশুশিল্পী হিসেবে পরিচিত টুনটুনির মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র মাত্র দুইটি ‘সোনাবন্ধু’ ও ‘আমার মা’। গঠনতন্ত্রের শর্ত পূরণ না হলেও তিনি পূর্ণ সদস্যপদ পেয়েছেন।
এই অভিযোগের বিষয়টিকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন অভিনেতা ডি এ তায়েব। তিনি বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি পদে আছেন এবং আসন্ন নির্বাচনে একটি প্যানেল থেকে একই পদে নির্বাচন করছেন।
তিনি বলেন, "গঠনতন্ত্রের নিয়মের বাইরে কোনো সদস্য পদ যুক্ত হয়েছে এমন প্রশ্নের কোনো সুযোগই ওঠে না। আমি সব সময় নিয়মের মধ্যে চলাই পছন্দ করি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই ধরণের অনেক কথাই ওঠে, তবে নিয়মের বাইরে এখানে কিছুই হয়নি। পাঁচটি সিনেমা না করার যে অভিযোগটি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ কাল্পনিক কথা। কারণ শতভাগ আইনগত ও যুক্তিসঙ্গত না হলে আমার কেবিনেট কখনোই এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।"
গঠনতন্ত্র না মেনে সদস্য পদ দেওয়া হয়ে থাকলে তা অভিনয়শিল্পীদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মনে করেন অভিনেতা ওমর সানী।
তিনি বলেন, "আমি দীর্ঘ সময় শিল্পী সমিতির কমিটিতে ছিলাম এবং সর্বশেষ সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। আমাদের সংবিধান বা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সদস্য পদের জন্য চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা বা ন্যূনতম ৫টি সিনেমায় কাজ করার একটি সুনির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া রয়েছে। কেউ যদি কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে এবং তার অবস্থানগত যোগ্যতা থাকে, তবে সে ছেলে নাকি মেয়ে—সেটি বিবেচ্য নয়, সে শিল্পী সমিতির নিয়ম অনুযায়ী সদস্য হতে পারবে।"

নতুন সদস্য তালিকায় 'শিশুশিল্পী' অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিযোগ নিয়ে সাবেক এই নেতা বলেন, "আমি যতটুকু জানি, সুনির্দিষ্ট বয়সের অবকাঠামো তৈরি হওয়ার আগে কোনো শিশুশিল্পী কোনোভাবেই শিল্পী সমিতির ভোটার বা পূর্ণ সদস্য হতে পারে না। আমি যেহেতু কমিটিতে নেই, এই সময়ের মধ্যে তারা গঠনতন্ত্রে কোনো পরিবর্তন এনেছে কিনা তা আমার জানা নেই। তবে নতুন যে ৪০ জন সদস্য হয়েছে তাদের মধ্যে ৩০ জনকেই আমি চিনি কি না, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।"
বর্তমান কমিটির সমালোচনা করে এই শিল্পী আরও বলেন, "আমরা যখন অতীতে কমিটি পরিচালনা করেছি, তখন কখনো এত বেশি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি। এখনকার কমিটি যেভাবে একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়ছে। আর গঠনতন্ত্র অমান্য করে সদস্য পদ দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সিনিয়র শিল্পী হিসেবে আমি বলব 'এটি ভীষণভাবে দুঃখজনক'। এসব কারণেই আমাদের মত সিনিয়ররা এই জায়গায় (কমিটিতে) নেই।"
শিল্পী সমিতির এই সদস্যপদ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে কোনো অভিযোগ যায়নি বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার খোরশেদ আলম খসরু।
তিনি বলেন, "এই সদস্যগুলো তো শিল্পী সমিতি থেকে বাছাই করে আমাদের দেওয়া হয়, আমরা আসলে এই বিষয়ে জানি না। আমাদের এখানে কোনো অভিযোগও আসেনি।"
শিল্পী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ৩ জুলাই। ৫৭৩ ভোটার দুটি প্যানেল থেকে পছন্দের প্রার্থী বেছে নেবেন।
নির্বাচনে এক পরিষদের সভাপতি প্রার্থী ফাইটার ও প্রযোজক আরমান এবং সাধারণ সম্পাদক পদে লড়ছেন চিত্রনায়িকা রুমানা ইসলাম মুক্তি।
অন্য পরিষদে সভাপতি পদে শিবা সানু ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী জয় চৌধুরী।