Published : 29 Jun 2026, 08:03 AM
ক্লাবে যতটা উজ্জ্বল, জাতীয় দলে ঠিক ততটাই বিবর্ণ- কিছুদিন আগ পর্যন্তও এমন কথা নিয়মিত শুনতে হতো ভিনিসিউস জুনিয়রকে। লোকেদের এমন ধারণা অমূলকও ছিল না। নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ঘিরে তৈরি হওয়া সেই ধারণা অবশেষে পাল্টে দিতে শুরু করেছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা। এখন জাতীয় দলের জার্সিতেও সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছেন রেয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড।
চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফর্মে ফিরে ভিনিসিউস অবশেষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে ব্রাজিলকে গ্রুপ পর্ব পার করিয়েছেন।
“যদি বিশ্বকাপে গিয়ে চার-পাঁচটা গোল করি এবং আমরা চ্যাম্পিয়ন হই, তাহলে পুরো গল্পটাই পাল্টে যাবে। তখন লোকে বলবে, আমি তো শুরু থেকেই বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এমনকি যে ম্যাচগুলোতে ভালো খেলিনি, সেগুলোতেও।”

বিশ্বকাপের আগে ভিনিসিউসের কথাগুলো ছিল এমনই। উত্তর আমেরিকা আসরে তিন ম্যাচে চার গোল তার এরই মধ্যে হয়ে গেছে।
আসরে বড় বড় তারকা যখন পালাক্রমে পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছেন, ভিনিসিউসও তখন হতাশ করেননি। গোল্ডেন বুটের যে রোমাঞ্চকর লড়াই চলছে, সেখানে তিনি আছেন ভালোভাবে। চার গোল নিয়ে রেয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ কিলিয়ান এমবাপে, ব্যালন দ’র জয়ী উসমান দেম্বেলে ও আর্লিং হলান্ডের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছেন এবং ছয় গোল নিয়ে চূড়ায় থাকা কিংবদন্তি লিওনেল মেসির ঠিক পরেই রয়েছেন।
মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করে বিশ্বকাপে ব্রাজিল হতাশাজনক সূচনা করলেও, ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় ভিনিসিউসের মুহূর্তের ঝলক তাদের হার থেকে বাঁচিয়ে দেয়। ব্রুনো গিমারেসের পাস ধরে ডি-বক্সে বাঁ দিকে কাট করে একজনের বাধা এড়িয়ে জোরাল শটে দূরের পোস্ট দিয়ে গোলটি করেন তিনি।
হাইতির বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয়ে মাতেউস কুইয়ার গোলে অ্যাসিস্ট করার পর, ভিনিসিউস নিজে করেন দলের তৃতীয় গোল। স্কটল্যান্ডকে তো তিনি নাজেহাল করে ছাড়েন। প্রতিপক্ষের দুটি ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে করেন জোড়া গোল। বল জালে পাঠান তিনি আরও একবার, কিন্তু ভিএআরে গোল মেলেনি ফাউলের কারণে, নইলে হয়ে যেতে পারত হ্যাটট্রিকও। যে স্বাদ ১৯৫৮ বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে পেলের পর আর কোনো ব্রাজিলিয়ান পাননি।

গ্রুপ পর্বে ভিনিসিউসের এই ফর্ম তাকে একটি জায়গায় ব্রাজিলের সেরা খেলোয়াড়দের কাতারে নিয়ে এসেছে এবং বিশ্বকাপে দেশের গৌরবময় ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করতে সাহায্য করেছে।
বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করা ব্রাজিলের পঞ্চম খেলোয়াড় তিনি। আগের চার জনের ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতেছিল ব্রাজিল - ১৯৭০ সালে জাইরজিনিয়ো, ১৯৯৪ সালে রোমারিও এবং ২০০২ সালে রোনালদো ও রিভালদো। ভিনিসিউসের পূর্বসূরিদের পাশে বসাটা ব্রাজিলের জন্য হতে পারে শুভ লক্ষণ!
২০১৪ সালে ঘরের মাঠে নেইমারের পর, এক বিশ্বকাপে চারটি গোল করা প্রথম ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়ও ভিনিসিউস। ব্রাজিলের রেকর্ড স্কোরার নেইমারও এই বিশ্বকাপে দলের অংশ। স্কটল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে প্রায় তিন বছর পর জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামেনে তিনি। আসরে দলের মূল খেলোয়াড়ের দায়িত্ব ভিনিসিউসের কাঁধে তুলে দিয়ে ওই ম্যাচ শেষে নেইমার বলেন, “ভিনি জুনিয়র আমাদের তারকা খেলোয়াড়। সে অসাধারণ ফর্মে আছে, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে।”
এবারের বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহে ভিনিসিউসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য যুগান্তকারী মুহূর্ত। ক্লাব পর্যায়ে তিনি উজ্জ্বল পারফরম্যান্স দেখালেও, বিশ্বকাপ শুরুর আগে প্রায় অর্ধশত আন্তর্জাতিক ম্যাচে ২৫ বছর বয়সী এই তারকার গোল ছিল মাত্র ৯টি, অ্যাসিস্টের সংখ্যাও ছিল তাই। কাতারে ২০২২ সালের বিশ্বকাপে একটি ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় জোড়া গোল করেন তিনি। বাকি ছয়টি গোল এসেছিল প্রীতি ম্যাচ থেকে।

ভিনিসিউস নিজেই স্বীকার করে নেন, ব্রাজিলের হয়ে তার আগের পারফরম্যান্স রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে দেখানো মানের ধারেকাছেও ছিল না। এখন সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের এই ঘুরে দাঁড়ানোর মুহূর্তটি তিনি উপভোগ করছেন। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বড় জয়ের পর সেটিই বলেন তিনি।
“জাতীয় দলের হয়ে এমন সময়ও গেছে, যখন আমার ফুটবল প্রতিভা দেখাতে পারিনি। আর এমন পরিস্থিতিতে অনেক গোল করা ও দারুণ পারফর্ম করার চেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারে না। আমার প্রতিভা ও রেয়াল মাদ্রিদে করা পরিশ্রমের সুবাদে আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে, সঠিক সময়ে ব্রাজিলের জার্সিতে আবারও জ্বলে উঠব।”
ভিনিসিউস ঠিকই জ্বলে উঠেছেন। রেকর্ড পাঁচটি বিশ্বকাপ শিরোপার সবশেষটি সেই ২০০২ সালে জেতা ব্রাজিলকে তিনি কতদূর টানতে পারেন, সেটিই এখন দেখার।
নকআউট পর্বের শুরুতে জাপানের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। এশিয়ার দলটির বিপক্ষে গত অক্টোবরে প্রীতি ম্যাচে ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে ৩-২ ব্যবধানে হেরেছিল কার্লো আনচেলত্তির দল।