সংস্কারের নামে বন্ধ, ১৯ বছরেও চালু হয়নি মিরপুর টাউন হল

সাংস্কৃতিক কর্মীরা নিজস্ব উদ্যোগে টাউন হলের শূন্যস্থানে একটি মুক্তমঞ্চ তৈরি করলেও সিটি করপোরেশন সেখানে রাখে ময়লার গাড়ি।

পাভেল রহমানবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 21 Sept 2022, 05:46 AM
Updated : 21 Sept 2022, 05:46 AM

ঢাকার মিরপুরের ১০ নম্বর সেকশনে একটি ‘আধুনিক নাট্যমঞ্চ’ নির্মাণের দাবি দুই দশকের; সেই আন্দোলনকে আরও জোরদার করতে আগামী শুক্রবার আবারও সমবেত হচ্ছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মীরা।

মিরপুর সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আলম শাহীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা।

“মিরপুরে একটি আধুনিক নাট্যমঞ্চ নির্মাণ করা আমাদের প্রাণের দাবি, যেখানে থাকবে নাটক, সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা আবৃত্তিসহ শিল্পের সব শাখার আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত মঞ্চ, গ্যালারি, পাঠাগার। এই দাবিতে ২৩ সেপ্টেম্বর আবার সমবেত হচ্ছি আমরা।“

১৯৭৮ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত মিরপুর ১০ নম্বরে একটি টাউন হল ছিল। তৎকালীন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে এবং মিরপুর উন্নয়ন কমিটির তত্ত্বাবধানে টাউন হলটি নির্মাণ করা হয়। ওই টাউন হলে মিরপুরের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন করত।

ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে হলটি ভেঙে ফেলা হয় ২০০৩ সালে। সেখানে সিনেপ্লেক্স, নাট্যমঞ্চসহ সংস্কৃতি চর্চার নানা সুযোগ-সুবিধাসহ একটি বহুতল টাউন হল নির্মাণের কথাও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

পরে সিটি করপোরেশন একটি বেসরকারি ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে সেখানে ‘মার্কেট’ তৈরির পরিকল্পনা নেয়।

মার্কেট তৈরির সেই প্রক্রিয়া শুরু হলেও এলাকার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ‘ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের’ মুখে বন্ধও হয়ে যায়।ওই আন্দোলনে একাত্ম হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, পথনাটক পরিষদসহ অনেকে।

এরপর ২০১৩ সালে সাংস্কৃতিক কর্মীরা নিজস্ব উদ্যোগে টাউন হলের শূন্যস্থানে একটি মুক্তমঞ্চ তৈরি করলেও বর্তমানে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি রাখায় জায়গাটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ, সিটি কর্পোরেশন থেকে আধুনিক নাট্যমঞ্চ তৈরির আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আলম শাহীন বলেন, “টাউন হলের জায়গাটিতেই আমরা শিগগিরই একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করব। সেখানে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মহোদয়কেও আমন্ত্রণ জানাব এবং সেখানে আমাদের দাবিদাওয়া তুলে ধরব।”

উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজাও মনে করছেন, মিরপুরের মত জনবহুল জায়গায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সহমত প্রকাশ করছেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম মানিকও।

আন্দোলন পরিক্রমা

টাউন হলটি ২০০৩ সালে ভেঙে ফেলার দুবছর পর ২০০৫ সালে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের জাতীয় সম্মেলনে তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা মিরপুরে একটি আধুনিক নাট্যমঞ্চ নির্মাণের ঘোষণা দেন। যদিও পরে তা আলোর মুখ দেখেনি।

একই বছর গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন মেয়র বরাবর ১০ দফা দাবিও উপস্থাপন করে, সেখানে অন্যতম দাবি ছিল ‘আধুনিক নাট্যমঞ্চ’।

২০০৭ সালে স্বাধীনতা উৎসবের এক অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী মিরপুরে টাউন হলের ফাঁকা জায়গায় একটি আধুনিক নাট্যমঞ্চ করার দাবি জানান এবং সেটি ‘শহীদ মুনীর চৌধুরীর’ নামে করার প্রস্তাব দেন।

সে প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মীরা নাট্যমঞ্চের আন্দোলনকে আরও তরান্বিত করেন। ২০১৩ সালে ‘গণ অর্থায়নে’ ওই ফাঁকা জায়গায় একটি মুক্তমঞ্চ নির্মাণ করে সংস্কৃতিকর্মীরা। সেখানে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হত। কিন্তু পরে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি রেখে জায়গাটিকে ‘ময়লার ডিপো’ বানিয়ে ফেলা হয়।  

চলতি বছরের অগাস্ট মাসে স্থানীয় নাটকের দল ‘অপেরা’ টাউন হলের ফাঁকা জায়গায় নাট্যমঞ্চ করার দাবিতে প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করে।

‘অপেরা’র সাংগঠনিক সম্পাদক নাহিদ স্মৃতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মিরপুরে অনেকগুলো সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। কিন্তু প্রায় ৬০ লাখ মানুষের বসবাসের এই এলাকায় কোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নেই। মঞ্চ না থাকার কারণে আমাদেরকে সেগুনবাগিচায় গিয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠান করতে হয়। নাটক মঞ্চায়ন করতে হলে সেটসহ অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে শিল্পকলায় গিয়ে অনুষ্ঠান করা অনেক কঠিন।

“এজন্য আমরা মনে করি মিরপুরে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং নাট্যমঞ্চ তৈরি করা খুবই জরুরি। এক সময় টাউন হল ছিল সংস্কৃতিকর্মীদের প্রাণের জায়গা। সেই টাউন হলের জায়গাটিতেই হোক নাট্যমঞ্চ।”

মিরপুর সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরামও গত ১০ সেপ্টেম্বর একই দাবিতে মিরপুর-১ স্বাধীনতা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে।

মিরপুরের সংস্কৃতিকর্মীদের এই আন্দোলনে ইতোমধ্যে সংহতি জানিয়েছেন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ, পথনাটক পরিষদের সভাপতি মিজানুর রহমান, নাট্যনির্দেশক মোহাম্মদ বারী, অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী, আবৃত্তিশিল্পী মাসকুর-এ সাত্তার কল্লোলসহ অনেকে।

রামেন্দু মজুমদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মিরপুরের মত একটি জনবহুল জায়গায় কোনো সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নাই। এখন তো জায়গাও কমে গেছে। চাইলেও নতুন করে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করা খুব কঠিন। তাই টাউন হল যেখানে ছিল, সেই জায়গাটিতে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বা নাট্যমঞ্চ করার যে আন্দোলন সেটি খুবই যৌক্তিক। এরকম একটি যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে সিটি কর্পোরেশন সেখানে নাট্যমঞ্চ তৈরি করবে বলে আমি আশা করছি।”

অভিনেতা ও নাট্যনির্দেশক মোহাম্মদ বারী বলেন, “মিরপুরের সাংস্কৃতিক চর্চাকে আরো গতিশীল করার জন্যই টাউন হল চালু করা জরুরি। নবরূপে টাউন হলের ফাঁকা জায়গায় আধুনিক নাট্যমঞ্চ করা হোক।"

টাউন হলের ফাঁকা জায়গায় নাট্যমঞ্চ করার দাবি ‘যৌক্তিক’ উল্লেখ করেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সংস্কৃতিকর্মীদের এই দাবিটি যৌক্তিক। আমি মনে করি আমাদের যেহেতু জায়গার সংকট রয়েছে সেহেতু বহুমুখী কিছু করার পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। “

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের জন্য আইসিটি সেন্টার, হেলথ ক্লাবও তৈরির পরিকল্পনা করা তাগিদ দেন তিনি।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করার জন্য সিটি কর্পোরেশনের এমনিতেই উদ্যোগ রয়েছে। ২০/২৫ বছর আগে যে জায়গাটিতে টাউন ছিল এবং সেটি নিয়ে কী পরিকল্পনা ছিল, তার আদ্যপান্ত খুঁজে বের করার জন্য আমি সমাজ কল্যাণ কর্মকর্তাকে বলেছি। পুরো বিষয়টি জানার পর বিস্তারিত বলতে পারব।”

সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ি থাকার বিষয়টি নিয়ে সেলিম রেজা বলেন, “সেখানে আমাদের আঞ্চলিক অফিস আছে। তার পাশের খালি জায়গায় সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি রাখা হয়।”

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। উত্তরের তথ্য কর্মকর্তা পিয়াল হাছান জানান, মেয়র বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক