Published : 29 Mar 2026, 01:06 AM
আশির দশকের দর্শকপ্রিয় ব্যান্ড 'ইন ঢাকা' প্রায় সাড়ে তিন দশকের বিরতি শেষে নতুন গান নিয়ে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে গড়ে ওঠে ব্যান্ড 'ইন ঢাকা'; সে সময় মেটাল সংগীতে বেশ প্রভাব ফেলেছিল দলটি।
ব্যান্ডে ছিলেন জয় ইসলাম (গিটার), মাশুক রহমান (গিটার), শাহেদ আহমেদ (ভোকাল) ডাক নাম ‘গোর্কী’ , তুষার আহমেদ (বেস গিটার ও ভোকাল) এবং চৌধুরী সাইদুজ্জামান, (ড্রাম), তিনি ‘রোজেন’ নামে পরিচিত ছিলেন।
এই পাঁচ সদস্যদের গান নিয়েই ফিরবে দলটি। ব্যান্ডের ড্রামার রোজেন গ্লিটজকে এই খবর দেন।
কোভিড মহামারীর সময়ে অনলাইন আড্ডা থেকেই নতুন অ্যালবাম তৈরির ভাবনা আসে বলে জানিয়েছেন এই শিল্পী।
"আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও যোগাযোগটা ছিল, কোভিডের সময় সবার কাজ বন্ধ, বাসায় সবাই। তখন অনলাইনে আমাদের পাঁচজনের প্রতিদিন দুই থেকে চার, পাঁচ ঘণ্টা করে আড্ডা হত। তখন এই আড্ডার মধ্যে আমরা নতুন অ্যালবাম করার সিদ্ধান্ত নিলাম।"
নয়টি গানের এক অ্যালবাম নিয়ে ফিরবে দলটি। তা জানিয়ে রোজেন বলেন, "এটা অনেকটা 'ডিসট্যান্স অ্যালবামের মত। আমরা সবাই, একেকজন একেক দেশে। আমরা অনলাইনেই তিনটা গান তৈরি করলাম, আরও ছয়টা গানের স্ট্রাকচার তৈরি করা হয়েছে। তারপর আগামী বছর গানগুলো সংগ্রহ করে আমরা একটা চূড়ান্ত রূপ দিব।"
দীর্ঘ সময় পর ফেরা নিয়ে এই শিল্পীর ভাষ্য, "আমাদের গান নিয়ে আসতে হবে, এবার আমাদের সিদ্ধান্তটা হল আমরা আমাদের নিজেদের জন্য কিছু গান করব। ‘ইন ঢাকার’ হয়ত এখন একজন ভক্ত থাকতে পারে, আমরা তার জন্য গান করব।
“আমাদের 'এই রাত' গানটা যখন প্রকাশ হয়েছিল তখন আমাদের ভাবনা ছিল অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা। এই গানটা শুনে এক ছেলে আত্মহত্যা থেকে সরে এসেছিল। তাই আমরা মনে করি আমাদের হাজার হাজার গানের দরকার নেই। একটা গানই যথেষ্ট।"

ব্যান্ডটি শুরুর দিনগুলির স্মৃতিচারণ করে রোজেন বলেন, “’ইন ঢাকার’ গঠনটা মূলত লালমাটিয়া কেন্দ্রীক। আমরা সবাই তখন লালমাটিয়াতেই থাকতাম, গান করতাম। ম্যাট্রিকের পরের সময়, আনুমানিক ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে জয় ও মাশুকের সঙ্গে যখন পরিচয়টা একটু ঘনিষ্ঠ হয়। তখন সিরিয়াসভাবে কোনো ব্যান্ড তৈরি করতে পারি কী না সেই ভাবনায় ছিলাম।"
সেই ভাবনা থেকেই চৌধুরী সাইদুজ্জামান, মাশুক রহমান ও জয় ইসলাম এই তিনজন মিলে ব্যান্ড গঠনের উদ্যোগ নেন। তখন তাদের বয়স ১৭-১৮ বছর। সময়টা ১৯৮৫ সালের দিকে।
রোজেন বলেন, "তখন আমরা টুকটাক বাজাতে পারতাম। কিন্তু কীভাবে কী করতে হবে বুঝতে পারছিলাম না। তখন একজন গিটারিস্ট ছিলেন পান্না ভাই। ওনার কাছ থেকে সাহায্য নিলাম। আমাদের সব থেকে বেশি সহযোগিতা করলেন শাহিন ভাই। উনি আমাদের ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দেন কীভাবে একটি ব্যান্ড গড়ে ওঠে। ওটা আমাদের জন্য খুব ভালো শেখার অভিজ্ঞতা ছিল।"
রোজেনের গল্পে জানা গেছে, সেই সময় তারা ধীরে ধীরে যন্ত্রপাতি জোগাড় করতে শুরু করেন। জয় ইসলাম কোনোভাবে একটি ভাঙাচোরা অ্যাম্প্লিফায়ার জোগাড় করেছিলেন। কারও ড্রইংরুমে, কখনও রোজেনের বাসায় বিভিন্ন জায়গায় বসেই চলত অনুশীলন।
এরপর ব্যান্ডে যুক্ত হন আরও দুই সদস্য। তুষার আহমেদ লালমাটিয়ার কাছাকাছি এলাকায় থাকতেন, আর শাহেদ আহমেদ ‘গোর্কী’ ছিলেন লালমাটিয়ারই বাসিন্দা। এভাবে চূড়ান্তভাবে ব্যান্ডের গঠন দাঁড়ায় রোজেন ড্রামসে, তুষার বেস গিটারে, জয় ইসলাম ও মাশুক রহমান গিটারে এবং গোর্কী ভোকালে।
সে সময় লালমাটিয়ারই শান্ত নামের এক তরুণ মাঝেমধ্যে তাদের সঙ্গে বাজাতেন। তিনি কিবোর্ড বাজাতে পারতেন। ব্যান্ডের নিজস্ব কিবোর্ড না থাকায় প্রয়োজন হলে তাকে ডেকে নেওয়া হত।
প্রথমদিকে তাদের অনুশীলনের কেন্দ্র ছিল মাশুক রহমানদের বাসা। লালমাটিয়ার সেই বাড়ির ড্রইংরুমেই ছিল একটি ড্রামস সেট, যা দিয়েই শুরু হয় অনুশীলন।
১৯৮৫ সালের সেই সময়টায় ‘ইন ঢাকা’ মূলত ইংরেজি গান পরিবেশন করতেন। গান শোনার মাধ্যম ছিল ক্যাসেট। বিভিন্ন গান সংগ্রহ করতে তারা ক্যাসেটে রেকর্ড করে আনতেন।
কখনও ‘রেইনবো’ থেকে রেকর্ড করে এনে সেই গান শুনে শুনে অনুশীলন করতেন এবং সেখান থেকেই গান নির্বাচন করতেন বলে জানিয়েছেন রোজেন।
ধীরে ধীরে তাদের সংগীতধারা বদলাতে থাকে। প্রথমে রক, এরপর হার্ড রক এবং পরে মেটাল ঘরানার দিকে ঝুঁকে পড়েন তারা।
রোজেন বলেন, "তখন আমাদের সাথে পরিচয় হল রকস্ট্রাটার ইমরানের সঙ্গে, আর ওয়ারফেজের কমল ও টিপুর সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল আমার। তিন ব্যান্ডের ভালো যোগাযোগ তৈরি হল, আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হল, আমরা খুব ভালো প্রতিযোগী হয়ে উঠেছিলাম। প্রতিযোগিতা ছিল, তবে সেটা ছিল স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা।
এরপর দলটি কনসার্ট করা শুরু করে।
"আমরা কনসার্ট করা শুরু করলাম, ততদিনে নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা তৈরি হয়ে গেছে। তখন গিটারিস্ট নিলয়দা (নিলয় দাশ) ছিলেন, উনার সঙ্গে রাতের পর রাত ওই সংসদের টানেলে বসে এটা ওটা বাজাতাম, উনি আমাদের শিখাতেন।"
পরবর্তীতে ইন ঢাকা যুক্ত হয় মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনে (বামবার)।
এর কিছুদিন পর সংগীত প্রতিষ্ঠান সারগাম তাদের প্রস্তাব দেয় ব্যান্ডটির একটি স্বতন্ত্র অ্যালবাম প্রকাশ করবে। সেই প্রস্তাব পাওয়ার পর নতুন উদ্যমে গান তৈরি করতে শুরু করেন তারা।
সেসময় একটা হিড়িক ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য সবাই বিদেশে পড়াশোনা করতে চলে যেত।
রোজেন বলেন, “অ্যালবামের কাজ মাঝামাঝি রেখে চলে যান জয়, মাশুক ও তুষার। আমাদের সময়েই ওয়ারফেজ, রকস্ট্রাটা অ্যালবাম বের করেছিল। আমরা করতে পারিনি। তারপর মাশুক দেশে ফিরে, সবার সহযোগিতায় আমরা তখন ১০ টা গান করি।”
গান তৈরি হওয়ার পর আবারও একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে।
রোজেন তখন কলকাতায় ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানে থাকতেই তিনি জানতে পারেন তাদের অ্যালবাম 'নিঃশব্দ কোলাহল' প্রকাশ হয়ে গেছে।
অ্যালবাম প্রকাশের পর তারা শুনতে পান, অ্যালবামের অধিকাংশ গানই নষ্ট হয়ে গেছে।
"এই অ্যালবামের আগে একটা মিক্সড অ্যালবাম বের হয়েছিল, সেখানে 'এই রাতে' গানটা জনপ্রিয় ছিল। ওই একটা গানই পরিষ্কারভাবে গিয়েছিল। বাকি সব গানই নষ্ট হয়ে গেছে, কারণ ফাইনাল ড্রাফট দিয়ে অ্যালবাম বের হয়নি। তাদের অ্যালবাম বের করতে হবে তাই করে দিয়েছে। ১৯৯১ সালে অ্যালবাম 'নিঃশব্দ কোলাহল' বের হয়। দশ গান ছিল সেই অ্যালবামে।"
তবে এই ঘটনার পর ব্যান্ডের সদস্যরা বড় একটি ধাক্কা খান। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার মত অনুভূতি হয় তাদের।
রোজেন বলেন, “আমরা সবাই খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এরপর অনেকেই বিদেশে চলে গেলাম। ইন ঢাকার কার্যক্রম মোটামুটি বন্ধ হয়ে যায়। এক ধরনের অভিমান নিয়েই বিদায় নেওয়া।”