Published : 21 Apr 2026, 01:34 PM
তিনি অ্যালবাম বের করেছেন সাকুল্যে সাতটি, কিন্তু যা করেছেন সেটাই ইতিহাস হয়ে গেছে। তিনি শিল্পী-সুরকার লাকী আখান্দ। তারুণ্যের আবেগ সুরে বেঁধে ‘এই নীল মণিহার’, ‘আমায় ডেকো না’, ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে’, ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’, ‘মামনিয়া’র মত আরও কিছু গানের মাধ্যমে কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার মনে লাকী আখান্দ একটি স্থায়ী নাম।
সত্তর ও আশির দশকে বাংলা গান যাদের হাত ধরে আধুনিকতার পথে হাঁটতে শুরু করে, তাদের মধ্যে লাকী আখান্দ অন্যতম। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সেই পথ চলা সহজ ছিল না। কিন্তু লাকী আখান্দ বহুমাত্রিক সুরে নিজেকে প্রমাণ করেছেন বারবার।
ফোক ফিউশনের সঙ্গে পাশ্চাত্য সুরের সংমিশ্রণে লাকীর সৃষ্টি ছিল অনবদ্য। বিশেষ করে স্প্যানিশ সুরের প্রভাব এবং দেশীয় ধ্রুপদী ও ঠুমরির সুরও খেলেছে তার গানে।
কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’ গানটি নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর কণ্ঠে তিনি তুলে দিয়েছিলেন ধ্রুপদী ও গজল ঘরানার সুরে। অভিন্ন সুর অথচ ভিন্ন ভিন্ন সংগীত আয়োজনে গান তৈরি করে স্বতন্ত্র সংগীতভুবন গড়েছিলেন। এতে করে শ্রোতারাও পায় নতুনত্বের স্বাদ।
মঙ্গলবার এই শিল্পীর প্রয়াণ দিবস। নয় বছর আগে ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ে পরাস্ত হয়ে চিরবিদায় নেন তিনি।
অভিমানী এই শিল্পী সেই আশির দশকেই গেয়ে গেছেন, “আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না/ফেরারী পাখিরা কুলায় ফেরে না।”
দিনটি ঘিরে গীতিকার ও শিল্পীদের বয়ানে উঠে এসেছে বহুমাত্রিক এই শিল্পীর সুরসন্ধানের কথা।

সুরে ছিল বৈচিত্র্যের জাদু: সামিনা চৌধুরী
গানের কথা হাতে পেলেই মুহূর্তে সুর তৈরি করে ফেলতেন লাকী আখান্দ। ক্ল্যাসিক্যাল, পপ ও পাশ্চাত্য ঘরানার মিশ্রণে ভিন্নধর্মী সংগীত নির্মাণ করাই ছিল তার বিশেষত্ব। লাকী আখান্দকে নিয়ে গ্লিটজের সঙ্গে এভাবেই কথা শুরু করেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা সংগীতশিল্পী সামিনা চৌধুরী।
সামিনা চৌধুরীর কণ্ঠে লাকী আখান্দের সুরে শোনা গেছে বেশ কিছু গান। এর মধ্যে ‘কবিতা পড়ার প্রহর' অ্যালবামের ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে’, ‘আমায় ডেকো না ফেরানো যাবে না’ গান দুটি যুগ যুগ ধরে মনে রেখেছে শ্রোতারা।
সামিনার কথায় লাকী আখান্দ সুরের ক্ষেত্রে ভিন্ন ও পরীক্ষাধর্মী একজন সংগীত পরিচালক ছিলেন। তিনি 'ঘুড্ডি' সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেছিলেন। ৪৬ বছর আগে মুক্তি পাওয়া ওই সিনেমার 'আবার এল যে সন্ধ্যা' গানটি কালজয়ী।
সামিনা বলেন, “প্রত্যেকটা গানেই হরেক রকমের স্টাইলিং রেখে সুর করতেন। হরেক রকমের বাংলা গান মানে ক্ল্যাসিকাল ঘরানার, পপ, ওয়েস্টার্ন সবরকম মিক্স করে এক অন্যরকম সুর দিতে পারতেন। উনার সুরে বৈচিত্র্যের জাদু ছিল।"

লাকী আখান্দের কাজের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সংগীত পরিচালক রাহুল দেববর্মণের কাজের সাদৃশ্য পান সামিনা।
"সুরের দিক থেকে উনার অন্যরকম একটা বিশেষত্ব ছিল। উনার উপরে ক্লাসিক্যালের ঘরানাটাই বেশি কাজ করত। সেটাকে তিনি ওয়েস্টার্ন বিট নিয়ে একটা মিশ্র সুর তৈরি করতেন। এটা সবার হয় না, এটা পশ্চিমবঙ্গের রাহুল দেববর্মণের ছিল। আর আমাদের লাকী আখান্দের ভিতরে ছিল। আমি যতটুকু শুনেছিলাম রাহুল দেববর্মণ উনাকে খুব পছন্দ করতেন। লাকী চাচা কলকাতায় গিয়েছিলেন, উনি খুব সুন্দর অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতে পারতেন। সেটা শুনে রাহুল দেববর্মণ উনাকে কলকাতায় থেকে যেতে বলেছিলেন।"
ছেলেবেলা থেকে লাকী আখান্দকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে সামিনার। লাকী আখান্দের কাছ থেকে হারমোনিয়াম ও কিবোর্ড বাজানো শিখেছেন এই গায়িকা।
লাকী আখান্দের সুরে নিজের গাওয়া গান নিয়ে সামিনা বলেন, "লাকী চাচার সঙ্গে আমার অনেক গান আছে, একসঙ্গে দুইটা অ্যালবাম করেছি, 'আনন্দ চোখ' অ্যালবামের ১২ টি গানে উনার সঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছি। এই অ্যালবামের 'যেখানেই থাক দূরে', 'ভালোবেসে ভুল ছিল যত', 'কাল কি যে দিন ছিলে' সহ বেশ কিছু গান আলোচনায় ছিল। 'বিতৃষ্ণা জীবনে আমার' অ্যালবামের 'এ রাত কত জানা',... সহ অনেক গান ছিল।
তবে এসব গানের মধ্যে ‘কবিতা পড়ার প্রহর' ও ‘আমায় ডেকো না' দুটি দিয়ে সামিনা নিজেও অনন্য।
এই দুই গান নিয়ে স্মৃতিকাতর সামিন বলেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটা অনুষ্ঠান ছিল ‘কথা ও সুর’ এবং 'সুর ও বাণী' নামের। সেই অনুষ্ঠানে কাওসার আহমেদ চৌধুরীর কথায় লাকী চাচার সুরে ‘কবিতা পড়ার প্রহর' ও ‘আমায় ডেকো না' গান দুটি গাই এবং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে।"
‘লাকী ভাইয়ের ভেতরে সুরের সমুদ্র ছিল’
লাকী আখান্দের সৃষ্টিশীলতার অনন্য অধ্যায়ের কিছু দিক গ্লিটজের কাছে তুলে ধরেছেন গীতিকার গোলাম মোর্শেদ।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে লাকী আখান্দের সঙ্গে সখ্যতা ছিল গোলাম মোর্শেদের। লাকীর কণ্ঠে ‘আজ আছি কাল নেই, অভিযোগ রেখো না’ এবং ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে’ গানগুলো শুনে কৌতূহল মেটাতে শিল্পীকে খুঁজে বের করেন তিনি। আজিমপুর কলোনির একটি বাড়িতে প্রথম দেখা হয় তাদের। এরপর গানের প্রতি ভালোবাসা থেকেই দুজনের হৃদ্যতা গড়ে উঠে।

লাকী আখান্দের কথা রাখতেই প্রথম গান লিখেছিলেন গোলাম মোর্শেদ। গানটি ছিল ‘ভালোবেসে ভুল ছিল', লাকীর সুরে গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন সামিনা চৌধুরী। এই গানের কথা লেখার পেছনে ছিল লাকী আখান্দের অনুরোধ।
অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শুধু কথা রাখতেই কয়েকটি স্তবক লিখে দিয়েছিলেন তিনি। এরপর এই লেখা থেকে লাকী আখান্দের সুরে এটি গান হয়ে ওঠে।
অল্প সময়েই সুরকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করতে পারতেন লাকী। সুরকার হিসেবে লাকী আখান্দ বিশেষ গুণের অধিকারী ছিলেন বলে মনে করেন মোর্শেদ।
"লাকী ভাইয়ের ভেতরে সুরের সমুদ্র ছিল, উনি গানের কথা পেলেন একভাবে বসে তাকিয়ে থাকতেন। একটা গানের কথা পড়ে উনি বলতেন আমার ভিতরে চারটা সুর ধাক্কা দিচ্ছে। ক্ল্যাসিক্যাল করতেন, স্লো ঘরানার সুর করতেন, ব্যান্ডের গানের সুর করতেন, বা ফোক ঘরানার এমন নানা ধরনের সুর নিয়ে ফিউশন করতেন।"
বাংলা গানে লাকী আখান্দের যে অবদান ছিল, সেটার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি বলে মনে করেন এই গীতিকার।
"লাকী ভাই বাংলা গানের এক অনন্য উদাহরণ ও অনুপ্রেরণা। যারা ঢাকায় আধুনিক বাংলা গান করে তারা লাকী ভাইকে মূল্যায়ন করছে, কিন্তু এই মূল্যায়নগুলি তো আসলে সরকারিভাবে আসা উচিত ছিল। আমাদের দেশে অনেক গুণী মানুষই বিভিন্ন জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছেন, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু যার মূল্যায়ন সবার আগে হওয়া উচিত ছিল, সেই লাকী ভাইকে আমি জাতীয় পর্যায়ে সেভাবে কোনো বড় পুরস্কার পেতে দেখিনি।"
লাকী আখান্দের সুর করে রাখা বেশ কিছু গান এখনো আছে মোর্শেদের কাছে। গেল ১৫ এপ্রিল তিনি প্রকাশ করেছেন 'যার কাছে মন রেখে' শিরোনামের গান। আরও একটি গান শিগগিরই প্রকাশ পাবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ছন্দ-লয়ের টানে সুরদরিয়ায়
পুরান ঢাকার এক সংগীতানুরাগী পরিবারে লাকী আখান্দের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৮ জুন। তিন ভাই জলি, হ্যাপি ও লাকীর সংগীতের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টির কারণও পারিবারিক আবহ। পাঁচ বছর বয়সে বাবা আবদুল আলী আখান্দের হাত ধরে সংগীতশিক্ষায় হাতেখড়ি তার
পর্যন্ত টেলিভিশন ও রেডিওতে শিশুশিল্পী হিসেবে সংগীতবিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশ নেন ১৯৬৩ থেকে ৬৭ সাল পযৃন্ত। আধুনিক সংগীতে পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলের পুরস্কার তার হাতে আসে ১৩ বছর বয়সে। ১৪ বছর বয়সে এইচএমভি পাকিস্তান কোম্পানির সুরকার হিসেবে লাকী আখান্দের নাম ওঠে তালিকায়।
১৯৭১ সালে ১৬ বছর বয়সে এইচএমভি ইন্ডিয়ায় সুরকার হন তিনি। তারপর আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। ছন্দ-লয়ের টানে তিনি ভেসে চললেন সুরদরিয়ায়।
আশির দশকের শুরুতে লাকী আর হ্যাপী আখান্দ জুটির বেশ কিছু গান দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। সে সময় লাকী মূলত ছিলেন সুরকার ও গীতিকার। আর সেই গানের শিল্পী ছিলেন হ্যাপী। সে সময়ের একটি টিভি নাটকে ‘এই নীল মনিহার’ গানটি দারুণ সাড়া ফেলে।
১৯৮৪ সালে সারগামের ব্যানারে বাজারে আসে লাকীর প্রথম একক অ্যালবাম। ‘এই নীল মণিহার’ ছাড়াও ওই অ্যালবামের ‘আমায় ডেকো না’, ‘রীতিনীতি জানি না’, ‘মামনিয়া’, ‘আগে যদি জানতাম’ গানগুলো শ্রোতাদের মাঝে সাড়া ফেলে।
১৯৮৭ সালে হ্যাপীর মৃত্যুর পরপর সঙ্গীতাঙ্গন থেকে অনেকটাই স্বেচ্ছা নির্বাসনে যান এই গুণী শিল্পী। দীর্ঘ নীরবতার পর ১৯৯৮-এ ‘পরিচয় কবে হবে’ ও ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ নামে তার দুটি অ্যালবাম আসে।
তবে নব্বইয়ে দশকে একেবারে শেষভাগে নতুন গান নিয়ে শ্রোতাদের মাঝে ফিরে এসেছিলেন এই শিল্পী।
গান নিয়ে নানা ধরনের নিরীক্ষা লাকী আখান্দ করতেন। সংগীতায়োজনে ড্রাম, ব্যাঞ্জো, ইত্যাদি যন্ত্র ব্যবহার করে পাশ্চাত্যের পপ মিউজিকের আমেজ আনতে ছিলেন পারদর্শী।
সুরে বৈচিত্র্যতা আনতে হামিংয়ের ব্যবহার করতেন। ছিলেন শেকারও (পানির গ্লাস, চিরুনি, চামচের মত জিনিসপত্রে গায়ে টোকা দিয়ে তৈরি ছন্দ)।
আবার একই গান দুইজন শিল্পীকে দিয়েও পরিবেশন করিয়েছেন তিনি। যেমন ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ গানটি সুরকার লাকী আখান্দ যেভাবে গেয়েছেন, সেই একই গান কণ্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিতের কণ্ঠে ধরা দিয়েছে ভিন্নভাবে, ভিন্ন সংগীত পরিচালনায়। দুভাবেই পরিবেশিত গানটি শ্রোতাদের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য গেঁথে আছে।
একই ঘটনা ‘মামুনিয়া’ ও ‘বিড়ালের ছানা’ গান দুইটিতে। সুরকার নিজের কণ্ঠে গেয়েছেন যেই সংগীত আয়োজনে, সুর অবিকৃত রেখে গায়ক ফেরদৌস ওয়াহিদকে দিয়ে গানটি গাইয়েছেন ভিন্ন আঙ্গিকে।

সামিনা চৌধুরীর কণ্ঠে ‘আমায় ডেকো না ফেরানো যাবে না’ গানটি পরবর্তীতে লাকী আখান্দও গেয়েছিলেন।
লাকীর সুরে ব্যান্ড শিল্পীদের বেশ কিছু গান আছে। জেমসের কণ্ঠে ‘লিখতে পারি না কোনো গান', আইয়ুব বাচ্চুর ‘কী করে বললে তুমি’, ছোট ভাই হ্যাপি আখান্দ্কে নিয়ে দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া ‘স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে গান লিখেছি’, আর্কের হাসানের ‘হৃদয়ের দুর্দিনে যাচ্ছে খরা’ এর মত অনেক জনপ্রিয় গানের সুরারোপ করেন তিনি।
ভিন্ন ধারার সুরে নিরীক্ষাধর্মী সংগীতায়োজনে লাকী আখান্দের সঙ্গে গীতিকার হিসেবে ছিলেন এস এম হেদায়েত, গোলাম মোর্শেদ, কিংবা কাওসার আহমেদ চৌধুরী।
লাকী চারশোর বেশি অপ্রকাশিত গান রেখে গেছেন এমন তথ্য গ্লিটজকে বলেছেন তার ঘনিষ্ঠজন গীতিকার আসিফ ইকবাল। গানগুলো প্রকাশের দায়িত্বও তিনি দিয়ে গেছেন পরিবারের হাতেই।
‘আবার এল যে সন্ধ্যা’, ‘কাল কী যে দিন ছিল’, ‘লিখতে পারি না কোনো গান,’ ‘কে বাঁশি বাজায়রে’, ‘স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে’, ‘নীল নীল শাড়ি পরে’, ‘পাহাড়ি ঝর্ণা’, ‘হঠাৎ করে বাংলাদেশ’সহ আরও বহু গানে সুরারোপ ও সংগীতায়োজন করেছেন তিনি। তার নিজের সুর করা গানের সংখ্যা দেড় হাজারেরও বেশি।