১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

যেভাবে সত্যজিৎ রায়ের 'অনঙ্গ বউ' হয়ে উঠেছিলেন ববিতা

“আমি মনে করেছি হয়তো কোনো ভক্ত, আমার তো তখন অনেক ভক্ত, দুষ্টুমি করছে কেউ, সত্যজিৎ রায় আমায় ডাকবে তাই হতে পারে কি?”

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 May 2026, 03:05 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:32 PM

কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়ে প্রথমে বিশ্বাসই করেননি অভিনেত্রী ববিতা। 

অভিনেত্রী মনে করেছিলেন, তার কোনো ভক্ত হয়ত দুষ্টুমি করে চিঠি পাঠিয়েছে। 'অশনি সংকেত' সিনেমায় অভিনয়ের স্মৃতি তুলে ধরে এমন কথাই বলেছেন অভিনেত্রী ববিতা। 

বাংলাদেশ টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ‘অনঙ্গ বউ’ চরিত্রে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেছিলেন। 

তিনি বলেন, "তখন আমরা গেন্ডারিয়ার বাসায় থাকতাম। একদিন একটি চিঠি আসে, যেখানে জানানো হয়, সত্যজিৎ রায় তার সিনেমায় আমাকে নেওয়ার কথা ভাবছেন এবং কলকাতায় গিয়ে দেখা করতে বলা হয়।"

ববিতা বলেন, “আমি মনে করেছি হয়তো কোনো ভক্ত, আমার তো তখন অনেক ভক্ত, দুষ্টুমি করছে কেউ, সত্যজিৎ রায় আমায় ডাকবে তাই হতে পারে কি? আমি বাংলাদেশের কোথায় এক কোণায় একটা নতুন মেয়ে, আমি ঠিকমত অভিনয় করতে পারি কি পারি না, আর উনি তো ওই দেশে অনেক সুন্দর সুন্দর বড় বড় নায়িকাকে নিয়েছেন জয়া ভাদুড়ী, শর্মিলা ঠাকুর। এরকম অনেকে তো আছেন। আমাকে কেন নেবেন?”

অভিনেত্রীর ভাষায়, বিষয়টিকে শুরুতে গুরুত্ব না দিলেও পরে ইন্ডিয়ান হাই কমিশন থেকে যোগাযোগ করা হলে তারা বিষয়টি গুরুত্ব দেন এবং কলকাতায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

বড় বোন অভিনেত্রী সুচন্দাকে নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন ববিতা। কলকাতায় গিয়ে প্রথম সাক্ষাতের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন তিনি।

"রাতে সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে গিয়ে কলিং বেল চাপতেই দরজা খুলে দেন এক লম্বা ভদ্রলোক। তখন তিনি বেশ সাজগোজ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে দেখে সত্যজিৎ রায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘একি! তুমি এত মেকআপ নিয়ে এসেছ কেন? আমি তো তোমাকে এই মেকআপে দেখতে চাইনি’।”

এই ঘটনায় ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলেন ববিতা। সেসময় ববিতার অভিনয় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে সত্যজিৎ রায় বোন সুচন্দার কাছে জানতে চান, তিনি অভিনয় করতে পারবেন কি না।

পরে ববিতাকে কয়েকটি স্ক্রিপ্ট দিয়ে সেগুলো মুখস্থ করে পরদিন ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে স্ক্রিন টেস্ট দিতে বলেন।

পরদিনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে ববিতা বলেন, "সত্যজিৎ রায় ববিতাকে দেখে বলেছিলেন,‘ওমা! তোমাকে তো এখন খুব সুন্দর লাগছে। মেকআপ ছাড়াই তো তুমি সুন্দর’। 

এরপর তাকে আটপৌরে শাড়ি ও সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে ক্যামেরার সামনে নেওয়া হয়।

স্ক্রিন টেস্টের সময় নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ববিতা বলেন, “আমি খুব নিজে চেষ্টা করছি, কী করে এই ডায়লগটা বলব, কী করে এটা হবে, কী করে আমার এক্সপ্রেশন হবে। উনি লুক থ্রু করে দেখছেন কালকে দেখলাম যে মেয়ে, আজকে তো দেখি একদম অন্যরকম!

"স্ক্রিন টেস্ট দেখে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘ইউরেকা! পেয়ে গেছি আমি! আমি আমার অনঙ্গ বউকে পেয়ে গেছি!' যা আমার জন্য ছিল এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।"

‘অনঙ্গ বউ’ চরিত্রের সাজসজ্জা নিয়ে ববিতা বলেন, "সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় সাধারণত ভারি মেকআপ ব্যবহার করা হত না।" 

ববিতার নিজের স্বাভাবিক চেহারা, কথা বলার ভঙ্গি এবং ব্যক্তিত্বের মধ্যেই পরিচালক চরিত্রটির প্রতিফলন খুঁজে পেয়েছিলেন বলে মনে করেন তিনি।

“আমার ব্যক্তিগত কথা বলার যে স্টাইল, আমার চেহারা, আমার সবকিছু দেখে কোথাও যেন মনে হয় উনি অনঙ্গ বউকে আমার মাঝে খুঁজে পেয়েছেন। সেজন্যই বোধহয় ভালো লেগেছে ছবিতে।"

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অশনি সংকেত' উপন্যাসটি অবলম্বনে ১৯৭৩ সালে একই নামে মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায়ের এই চলচ্চিত্র। তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল তার ভয়াবহ চিত্র পরিচালক ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তার ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে।

শনিবার কালজয়ী এই নির্মাতার জন্মদিন। ১৯২১ সালের এই দিনে কলকাতার গড়পার রোডের বিখ্যাত রায় বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন সত্যজিৎ রায়। 

কালজয়ী সব সিনেমা বানিয়েছেন। লিখেছেন চমৎকার সব গল্প। এঁকেছেন দারুণ সব ছবি। করেছেন বিভিন্ন বইয়ের অসাধারণ সব প্রচ্ছদ। তিনি ছবি আঁকতেন কাগজে-কলমে; ছবি আঁকতেন ক্যামেরায়।

১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তির পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর ‘অপরাজিত’, ‘পরশ পাথর’, ‘জলসাঘর’, ‘অপুর সংসার’, ‘তিন কন্যা’র মত একের পর এক কালজয়ী চলচ্চিত্রে ভারতীয় সিনেমাকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেন এই কিংবদন্তি। 

১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল মৃত্যুর আগে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি গ্রহণ করেন সম্মানসূচক অস্কার পুরস্কার।