Published : 05 May 2026, 11:28 AM
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার শিবপুর, সোনারপুর দক্ষিণ এবং নদিয়ার করিমপুর-এসব জায়গায় ঘাসফুলের বদলে ফুটেছে পদ্ম। অর্থাৎ বিধানসভা নির্বাচনে ধরাশায়ী হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমৃল কংগ্রেস, জয়ের হাসি হেসেছেন বিজেপির তারকা প্রার্থী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষসহ আরও কয়েকজন।
এসব আসনে বুথফেরত ফলের আভাস এবার আর মিথ্যা হয়নি। বিদায়ী শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের মন্ত্রিসভার অনেক তারকা প্রার্থী হেরে গেছেন নির্বাচনে। তৃণমূল প্রধান ও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও হেরেছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। কলকাতার বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে বিস্তারিত।
ঘরের মাঠে রুদ্রনীলের জয়

আনন্দবাজার লিখেছে, হাওড়ার শিবপুর আসন থেকে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে হেরে মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। কেউ কেউ ভেবেছিলেন রাজনীতি থেকে সরে অভিনয়ে মন দিচ্ছেন। কিন্তু ভুল ভাঙে অচিরেই। তিনি যে ক্ষান্ত হননি তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বারে বারে। দুর্নীতি, বেকারত্ব, স্বাস্থ্য, শিক্ষার অব্যবস্থা, সব দিক থেকে তৃণমূলকে আক্রমণ করেছেন একাধিক বার।
হাওড়ার শিবপুরে তৃণমূল প্রার্থী রানা চট্টোপাধ্যায়কে প্রায় ১৬ হাজার ভোটে হারিয়ে ভোটে জিতেছেন রুদ্রনীল।
অভিনেতা থেকে রাজনীতির ময়দান, রুদ্রনীলের সফর বরাবরই বর্ণময়। ছাত্রজীবনে ছিলেন সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের নেতা। তৃণমূল সরকারে আসার পরে দীর্ঘ সময় তৃণমূল ঘনিষ্ঠ থাকার পরে একুশের নির্বাচনের আগে দিল্লিতে অমিত শাহের বাড়ি গিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন রুদ্রনীল।
সেবার হাওড়া জেলার কোনও আসন থেকে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু একেবারে শেষ দফার প্রার্থী তালিকা ঘোষণায় বিজেপি ভবানীপুর আসন দেয় রুদ্রনীলকে। তবে হেরে যান রুদ্রনীল।
ছাব্বিশের নির্বাচনে প্রেক্ষাপট বদলে যায়; ঘরের মাঠ শিবপুরে প্রার্থী করা হয় রুদ্রনীলকে। গত নির্বাচনের নিরিখে এখানে তৃণমূলের আধিপত্য থাকলেও, শুরু থেকেই বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন রুদ্রনীল। ২০ রাউন্ড শেষে দেখা যায় বিপুল ভোটে জিতে গেছেন রুদ্রনীল।
লাভলী নয়, ভরসা এবার রূপার ওপরে
সোনারপুর দক্ষিণের ভোটযুদ্ধকে জমজমাট বলছেন না বিশ্লেষকরা। গণনার প্রথম পর্ব থেকেই অনেকটা পিছিয়ে ছিলেন তৃণমূলপ্রার্থী অভিনেত্রী লাভলি মৈত্র। দিন গড়াতে শেষ হাসি হেসেছেন বিজেপির প্রার্থী অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়।
সোমবার সকাল থেকেই গণনাকেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন রূপা। একাদশ রাউন্ড গণনা পরে বিজেপি-তৃণমূলের মধ্যে সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায়েছিল ২৫১০১। এক পর্যায়ে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে গণনাকেন্দ্র ছাড়েন তৃণমূলপ্রার্থী।
অষ্টম রাউন্ডের গণনার পরেই দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১৯৪৯২। সময় যত গড়িয়েছে, ব্যবধান বেড়েছে। ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৭০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন রূপা; তার প্রতিদ্বন্দ্বী লাভলী পেয়েছেন ৯৩ হাজার ১৮৮ ভোট। অর্থাৎ, লাভলি নন, সোনারপুর দক্ষিণের মানুষ ভরসা রাখলেন রূপার উপরেই।

২০১৫ সালে বিজেপিতে যোগ দেন অভিনেত্রী রূপা। সক্রিয়ভাবে এই দলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় নয় বছর ধরে। ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন তিনি।
২০১৬ সালের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোটায় রাজ্যসভার সদস্য হন রূপা। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির মহিলা মোর্চার সভানেত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে সোনারপুর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছিলেন লাভলি। বিরোধিদলের প্রার্থী হিসাবে ছিলেন অভিনেত্রী অঞ্জনা বসু। সেই সময়ে বিপুল সংখ্যক ভোটে বিজেপির অঞ্জনাকে হারিয়ে জয়ী হন লাভলি। এ বছরের বিধানসভা নির্বাচনের লড়াইয়েও প্রথম থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন লাভলি।
২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরে সোনারপুর থানায় এবং নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেন লাভলি। তার অভিযোগ ছিল, সোনারপুর দক্ষিণে বিজেপিপ্রার্থী রূপা কালিকাপুর ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের সাহেবপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৬৭ নম্বর বুথে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরে প্রবেশ করেন।

তৃণমূলের তরফে আরও অভিযোগ ছিল, বুথে প্রবেশে বাধা দিতে গেলে রূপার উপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী লাঠিচার্জ করে। যার ফলে তৃণমূলের কর্মীরা আহত হন। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেন রূপা।
বরং তৃণমূলের বিরুদ্ধেই নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তোলেন তিনি। এই ঘটনার জেরে এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
জিতলেন সিনেমার অভিনেত্রী পাপিয়া
টালিগঞ্জ কেন্দ্র ছিল আলোচনায়। তৃণমূল কংগ্রেসের হেভিওয়েট প্রার্থী অরূপ বিশ্বাসের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিজেপি থেকে পাপিয়া অধিকারীকে প্রার্থী করা হলে, এই আসনের জয় নিয়ে সন্দিহান ছিলেন অনেকেই।

কারণ বলা হয়, টালিগঞ্জ আর অরূপ বিশ্বাস সমার্থক প্রায়। দীর্ঘ ২০ বছর পরে সেই টালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে ঘটল পালাবদল।
তবে ভোটের টিকেট পেয়েই অভিনেত্রী বলেছিলেন, “সব কা সাথ, সব কা প্রয়াস, সব কা বিশ্বাস’- মোদিজির এই মূলমন্ত্র নিয়েই ভোটের মাঠে নামব।”
২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে উলুবেড়িয়া দক্ষিণ কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী ছিলেন পাপিয়া। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী পুলক রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সেবার হেরে যান।
২০০৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে জিতে বিধায়ক পদ পেয়েছিলেন অরূপ। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফল সে সব হিসাবনিকাশ বদলে দিল। শুরুতে পাপিয়ার থেকে কিছুটা এগিয়েছিলেন অরূপ। কিন্তু পঞ্চম রাউন্ডের গণনার পর থেকে উল্টে যায় হিসাব। টালিগঞ্জ ফিল্ম পাড়ার নক্ষত্রদের ‘সবচেয়ে কাছের’ নেতা ভোটের অংকে পিছাতে শুরু করেন।
পঞ্চম রাউন্ডের গণনায় অরূপকে ছাপিয়ে পাপিয়া এগিয়ে যান।
দীর্ঘদিন সিনেদুনিয়া থেকে দূরে থাকলেও ৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে শেষ হাসি হেসেছেন পাপিয়া।
হারলেন নায়ক সোহম

করিমপুর কেন্দ্র থেকে এ বার তৃণমূলের হয়ে ভোটে লড়েছিলেন তারকা প্রার্থী অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী। সর্বশেষ রাউন্ডের গণনার শেষে ১০,১৮৫ ভোটে তাকে পিছনে ফেলে জয়ী হন বিজেপির সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ। গণনা শুরু যখন হয়, তখন যদিও এগিয়ে ছিলেন সোহম। মাঝে ব্যবধান কমতে থাকে। শেষমেশ হেরে যান তিনি।
এই নিয়ে পর পর তিন বার বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের হয়ে ভোটে দাঁড়ান সোহম। ২০১৪ সালে তৃণমূলে যোগ দেন অভিনেতা। তখন রাজ্য তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সহ-সভাপতি পদে নিযুক্ত করা হয় তাকে।
তবে বার বার বিতর্কে জড়িয়েছেন এই অভিনেতা। ফেব্রুয়ারি মাসে তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ ওঠে। তাঁর বিরুদ্ধে হাই কোর্টে মামলা দায়ের করেন আর এক অভিনেতা-রাজনীতিবিদ শাহিদ ইমাম। এছাড়া ২০২৪ সালের জুন মাসে নিউ টাউনের এক রেস্তরাঁর মালিককে মারধর করার অভিযোগ ওঠে অভিনেতার বিরুদ্ধে।
ইন্দ্রনীল পারলেন না

পরপর দুবার চন্দননগর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন গায়ক ইন্দ্রনীল সেন।
তবে এবারের বিধানসভা ভোটে বিজেপি প্রার্থী দীপাঞ্জনকুমার গুহর কাছে ১২ হাজারেরও বেশি ব্যবধানের ভোটে হেরে হ্যাটট্রিকের সুযোগ হাতছাড়া হল গায়কের।
প্রথম থেকেই পিছিয়ে পড়েছিলেন অদিতি

সদ্য মা হয়েছেন সংগীতশিল্পী অদিতি মুন্সী; তবে পিছিয়ে ছিলেন না তৃণমূলের হয়ে ভোটের প্রচারে। বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছে রাজারহাট-গোপালপুর কেন্দ্রের তৃণমূলপ্রার্থী অদিতি।
অদিতির বিপক্ষে ভোটে দাঁড়ান বিজেপিপ্রার্থী তরুণজ্যোতি তিওয়ারি। গণনা শুরু হওয়ার পর প্রথম থেকেই পিছিয়ে পড়েছিলেন অদিতি।
১৪ নম্বর রাউন্ডের শেষে ২৭৭৫৭ ভোটে পরাজিত হন অদিতি। মোট ১৪টি রাউন্ডের মধ্যে একবারের জন্যেও গণনায় এগোতে দেখা যায়নি তাকে।
২০২১ সালে পূর্ণেন্দু বসুর বদলে অদিতিকে রাজারহাট-গোপালপুরের তারকা প্রার্থী করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বিপক্ষে ছিলেন বিজেপি প্রার্থী শমীক ভট্টাচার্য।
মমতা আস্থা রেখেছিলেন এ বারেও। বড় দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন অদিতির হাতে। তবে শেষমেশ দলের মতো অদিতিও নিরাশ করলেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
বড় ব্যাবধানে রাজের হার, অপ্রিয় অভিজ্ঞতা

ব্যারাকপুর থেকে হেরে গেছেন তৃণমূলের আরেক তারকা প্রার্থী রাজ চক্রবর্তী। এ চলচ্চিত্র পরিচালক দ্বিতীয়বারের মতো ব্যারাকপুরের ভোটের মাঠে নেমেছিলেন। কিন্তু ১৫ হাজারের বেশি ভোটে তিনি বিজেপির কৌস্তুভ বাগচীর কাছে হেরে যান।
তবে ফল ঘোষণার দিনটা হারের পাশাপাশি অপ্রিয় অভিজ্ঞতাও হয়েছে রাজের। সকালে সাদা শার্ট ও জিন্স পরে গণনা কেন্দ্রে যান রাজ। পঞ্চম রাউন্ডের পরে যখন কৌস্তুভ ১০ হাজার মতো ব্যবধান বাড়িয়ে নিয়েছেন, সেই সময় গণনা কেন্দ্র ছেড়ে বের হন রাজ।
অভিযোগ ওঠে সেই সময়েই তার শার্টে গোবর ছুড়ে মারে কিছু মানুষ। তার বিরুদ্ধে ‘চোর চোর’ স্লোগানও নাকি দেওয়া হয়েছে সেই সময়।
পরাজয় ব্রাত্য বসুর

দমদমেও তৃণমূলের নক্ষত্রপতন হয়েছে। এই আসনে তৃণমূলের তারকা প্রার্থী ব্রাত্য বসু বিজেপির অরিজিৎ বক্সীর কাছে ২৫ হাজার ২৭৩ ভোটে হেরে গেছেন।
ব্রাত্য বসু তুলনামূলক ভাবে সহজ জিতবেন বলে ধারণা করা হয়েছিল।