Published : 18 Jul 2026, 01:16 PM
মাঠের ভেতরে-বাইরে নানা বিতর্কে জেরবার ছিল এবারের বিশ্বকাপ। তবে শেষের দুয়ারে এসে ফিফা সভাপতি দাবি করছেন, এই বিশ্বকাপ দারুণ সফল। তার মতে, বিশ্বের সকল প্রান্তের মানুষকে এক সুতোয় গাঁথতে পেরেছে এই আসর। আয়োজনে সহযোগিতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে স্তুতিতে ভাসিয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান।
সর্বকালের বৃহত্তম বিশ্বকাপ যে ফিফার প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে, প্রমাণ হিসেবে ইনফান্তিনো বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরেন ইনফান্তিনো, যেমন দর্শকপূর্ণ স্টেডিয়াম এবং বিপুল টেলিভিশন রেটিং। এ সময় সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন ট্রাম্প।
নিউইয়র্কে শুক্রবার ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে ইনফান্তিনো বলেন, “আমেরিকান স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছে, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। আমরা বিশ্বকে একত্র করতে পেরেছি।”
ম্যানহাটনের ট্রাম্প টাওয়ারে ইনফান্তিনো এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল তারকাদের জন্য একটি সংবর্ধনার আয়োজন করেন ট্রাম্প। বিশ্বকাপের আকর্ষণীয় সোনালি ট্রফি মঞ্চে রেখে পাশে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন ট্রাম্প ও ইনফান্তিনো।

ট্রাম্পের উপস্থিতিতে যেমনটা প্রায়শই করে থাকেন ইনফান্তিনো, এবারও তেমনি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন তিনি।
“আপনার প্রশংসা করার লোকের প্রয়োজন নেই, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। তবু বলতে হয়, আপনি না থাকলে এই বিশ্বকাপ এতটা অবিশ্বাস্যরকম সফল হতো না।”
এই বিশ্বকাপকে “ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ক্রীড়া আয়োজনগুলির একটি’ বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প এবং যোগ করেন যে, এই টুর্নামেন্টটি শুধু ক্রীড়া জগতকেই নয়, তার চেয়েও বেশি কিছুকে উজ্জীবিত করেছে। ফাইনালের দুই দলকে শুভেচ্ছাও জানান তিনি।
“রোববারের জন্য স্পেন এবং আর্জেন্টিনাকে শুভকামনা এবং সেরা দলই জিতুক।”
এই আয়োজনের আগে শুক্রবার জাতিসংঘে দিনব্যাপী এক অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন ইনফান্তিনো, যেখানে আলোচনা করা হয়, খেলাধুলা কীভাবে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি অনুঘটক হতে পারে। ফাইনালে যে বলগুলি দিয়ে খেলা হবে, এমন একটি বল বল মঞ্চে নিয়ে আসেন তিনি এবং ফুটবল দিয়ে ঐক্যের বার্তা ছাড়ান।
“জাদুকরী এক বস্তু এটি, যা গোটা বিশ্বকে এককাট্টা করে ফেলে।
আমরা অনেকবারই শুনি যে, আমরা একটি বিভক্ত বিশ্বে বাস করি, আমরা একটি আক্রমণাত্মক বিশ্বে বাস করি, এমন অনেক কিছুই আছে যা আমাদের বিভক্ত করে, যা আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি করে। কিন্তু আমরা এটাও জানি এবং যদি এই একটি জিনিস থাকে (ফুটবল), এই বিশ্বকাপ আমাদের যদি একটি জিনিস দেখিয়ে থাকে, সেটা হলো, যা আমাদের বিভক্ত করে, ওসবের চেয়ে অনেক বেশি জিনিস আছে, যা আমাদের একত্রিত করে।”
এই প্রথম ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে বিশ্বকাপে এবং প্রথমবারের মতো তিনটি দেশে একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব আসর। ফিফা জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ১০২টি ম্যাচের প্রতিটিতেই স্টেডিয়া ছিল প্রায় পূর্ণ। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ ও ফাইনালই কেল বাকি আছে।
টুর্নামেন্টের মোট দর্শকসংখ্যা প্রায় ৬৭ লাখ হবে, যা বিশ্বকাপের রেকর্ড। যদিও কয়েক মাস আগে আশঙ্কা করা হয়েছিল যে, টিকিটের উচ্চমূল্য এবং অভিবাসন সংক্রান্ত সমস্যায় ফুটবল ভক্তরা উত্তর আমেরিকায় আসতে নিরুৎসাহিত হবে।
এই বিশ্বকাপ দিয়েই ভবিষ্যৎ বিশ্বের ঐক্যের আশা দেখছেন ফিফা সভাপতি।

“গত দেড় মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে, এমনকি বিশ্বের প্রতিটি কোণায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময়ভাবে একত্রিত হতে দেখেছি আমরা। তারা একসঙ্গে সময় কাটাতে এবং একাত্মতার মুহূর্ত উদযাপন করতে চেয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা এবং এই বার্তার ওপরেই আমাদের ভবিষ্যৎ গড়তে হবে—একাত্মতার ভবিষ্যৎ এবং ঐক্যের ভবিষ্যৎ।”
টুর্নামেন্টে বড় ধরনের কোনো নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেনি, যা নিয়ে কেউ কেউ আশঙ্কা করেছিলেন আগে। তবে ভূ-রাজনৈতিক অস্বস্তি এবং বিতর্ক দেখা গেছে। ইরান দলের অভিজ্ঞতা ছিল বেশ তিক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধরত থাকায় দলটিকে কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে হয় এবং পারফরম্যান্সে সেসবের প্রভাব পড়ে। গ্রুপ পর্বে অল্পের জন্য বাদ পড়তে হয় তাদের।
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে মার্কিন তারকা ফোলারিন বালোগনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর ইনফান্তিনো বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হন। ট্রাম্প এই ঘটনায় তার ভূমিকাকে স্রেফ ‘সুপারিশ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “জিয়ান্নি তার আরও একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমি-ফাইনাল জয়ের পর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে একটি ব্যানার হাতে আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা ছবি তোলায়, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য ফিফাকে অনুরোধ করে ব্রিটিশ সরকার।
ইনফান্তিনো জাতিসংঘের কাছে প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি এবং ফিফা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে "পূর্ণ সমর্থন" দেবেন এবং বলেন যে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত।
তবে তিনি এই ম্যাচগুলোকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন যে কীভাবে খেলাধুলা ভাষা, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অন্যান্য বাধা অতিক্রম করার একটি সেতু হতে পারে।
"দুই দিনের মধ্যেই আমরা জানতে পারব স্পেন নাকি আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবে," ইনফান্তিনো বলেছেন। "কিন্তু প্রিয় বন্ধুরা, আমরা ইতোমধ্যে যা জানি তা হলো, ফুটবল শুধু বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাই নয়, বরং এটি নিশ্চিতভাবেই সেই সাধারণ, সেই সার্বজনীন ভাষায় পরিণত হয়েছে যা সবাই বলে, কারণ সবাই একত্রিত হতে চায়।"