Published : 20 Jun 2026, 04:20 PM
কোভিড মহামারীর সময়ে এক দুপুরে খাবার টেবিলে বসে মা সেলিনা বানু মনির কাছে সাদু এবং তার পাগলি স্ত্রীর গল্প শুনেছিলেন পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন।
গল্পটা রাজবাড়ীর রাজাপুর গ্রামে সাদু নামের এক লোকের, যার স্ত্রী মানসিক সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন। স্ত্রীর পাগলামি যখন সাদুর কাছে অসহ্য ঠেকত, তখন তাকে দূরে কোনো এক জেলায় ফেলে আসতেন তিনি। যে কাজটি একাধিকবার করেছেন সাদু; কিন্তু ঠিকানা চিনে মেয়েটি বারবার স্বামীর ঘরে ঠিক ফিরে আসত।

কখনো তার ফিরতে কখনো ছয় মাস লেগে যেত, কখনো এক বছর পার হত, কিন্তু ফিরে আসতেন ঠিকই।
সংসারে ফিরে মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েটি নিখোঁজ থাকা নিয়ে কিছু মনে থাকত না, তাই তারা আবার সংসার করতেন।
মায়ের মুখে শোনা সেই গল্পটাই পর্দায় 'রইদ' সিনেমায় তুলে ধরেছেন 'হাওয়া' খ্যাত নির্মাতা সুমন। ঈদে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার পর তার সিনেমাটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে সিনেমার দৃশ্যপট দর্শক ও সমালোচকদের মুগ্ধ করেছে। তবে এই মুগ্ধতার পেছনে লুকিয়ে আছে নির্মাতা ও তার টিমের এক বছরের এক দীর্ঘ নির্মাণযজ্ঞ।
'রইদ' সিনেমার সেট তৈরি করতে লোকেশনে বনাঞ্চল তৈরি, বাড়ি নির্মাণ, কৃত্রিমতার আশ্রয় না নিয়ে আসল বৃষ্টির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা সব মিলিয়ে এক বাস্তব জগত পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক সুমন।
সম্প্রতি এই সিনেমার ভিজুয়াল ও নেপথ্য নির্মাণকাহিনী নিয়ে সুমনের সঙ্গে কথা হয় গ্লিটজের।
সত্য ঘটনা থেকেই 'রইদ' সিনেমার গল্প নেওয়া হয়েছে তা জানিয়ে সুমন বলেন, “গল্পের ফিলোসফিক্যাল জায়গাটা আমার কাছে খুব ইম্পর্টেন্ট ছিল। তাই এর ভিজুয়াল তৈরি করতে যতটুকু করার সবই করেছি প্রাকৃতিকভাবে। ‘রইদ’ সিনেমায় আমি যে সাদু এবং পাগলিকে দেখিয়েছি, তাদের এই প্রেমের গল্প কিংবা সম্পর্কের গল্পটা মূলত আমার মায়ের কাছ থেকে শোনা। আমার আম্মু সেলিনা বানুর মুখ থেকে পাওয়া এই চরিত্র দুজনকে আমি আমার শৈশবেও দেখেছি।

“আমার নানাবাড়ি রাজবাড়ীর রাজাপুর গ্রামে। সেখানে একসময় অনেক গরু ছিল, সাদু মূলত সেই গরুগুলো রাখতেন। আমার আম্মু আর সাদু প্রায় সমবয়সী ছিলেন, আমি যখন স্কুল বা কলেজে পড়ি, তখন সাদু ও তার বউয়ের দুজনেরই বেশ বয়স হয়ে গেছে।"
সুমন বলেন, "সাদুকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। তিনি ছিলেন ভীষণ সরল এক মানুষ, সারাক্ষণ হাসিমুখে থাকতেন। জীবনে এত দুঃখ-কষ্টের পরও তার মনে কোনো ক্ষোভ ছিল না, পুরো জীবনটাই যেন আনন্দে কাটাতেন। আমার ছোটবেলা থেকেই তাকে খুব অন্যরকম লাগত। আম্মুর মুখে শুনেছি, ছোটবেলায় আমি নাকি সাদুর প্লেটেও ভাত খেয়েছি। তবে সাদু ও তার স্ত্রীর জীবনের ভেতরের এই গল্পটা আমার জানা ছিল না। কোভিড মহামারী যখন শুরু হয়, তখন একদিন দুপুরবেলা খাওয়ার টেবিলে আম্মু আমাকে প্রথম এই গল্পটা বলেন।
"গল্পটা সত্য ঘটনার সাদু তার জীবনে প্রায় আট-দশবার বা তারও বেশি তার স্ত্রীকে দূরে কোথাও ফেলে আসার কাজটা করেছেন। কিন্তু তার স্ত্রী ফিরে আসলে তিনি আবার তাকে নিয়েই সংসার করতেন, সাদু নিজে আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি।"

২০২১ সালে 'রইদ' সিনেমার চিত্রনাট্য করেন জানিয়ে সুমন বলেন, আম্মুর কাছে গল্পটা শুনে আমার কাছে তখন প্রথম মানব-মানবী অ্যাডাম-ইভ বা আদম-হাওয়া মত হয়েছিল। যাদের ধর্মতাত্ত্বিক বা মিথোলজিক্যাল ব্যাখ্যার মত একে অপরকে ছাড়া আর কোনো অপশন ছিল না।
বহু দূরে ফেলে আসলেও সাদুর স্ত্রীর যেমন সাদুর কাছে ফিরে আসা ছাড়া কোনো গতি ছিল না, তেমনি সাদুরও এই পাগলী বউ ছাড়া কোনো আশ্রয় ছিল না। এই বাস্তব জীবনের ভেতরের যে ‘পরাবাস্তব’ রূপ, সেটিই আমাকে এই সিনেমাটা বানানোর জন্য সবচেয়ে বেশি আগ্রহী করে তুলেছিল।”
২০২১ সালে স্ক্রিপ্ট চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় লোকেশন খোঁজার কাজ।
সুমন বলেন, "আমি চেয়েছিলাম সাদু আর পাগলিকে 'আইসোলেটেড' করতে। তারা এক আলাদা দুনিয়ায় থাকে, যেন তাদের স্বর্গ থেকে পাঠানো হয়েছে এই পৃথিবীতে, যারা জনমানবের মাঝে থাকবে না। আমি আসলে প্রাণ এবং প্রকৃতিকে মেলাতে চেয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে সাদু এবং তার স্ত্রী হচ্ছে প্রকৃতির সন্তান। তারা যেন এই প্রকৃতির ভেতর দিয়েই তাদের প্রেমটাকে ফিল করতে পারে। যেখানে আমি এমন একটি ভিজ্যুয়াল রচনা করতে চাই যেখানে সাদু আর পাগলীর নিজস্ব এক দুনিয়া তৈরি হবে।"
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল চষে বেড়ানোর পর ২০২৩ সালের শেষের দিকে সিলেটের কোম্পানিগঞ্জের এই জায়গাটি মিলেছে 'রইদ' সিনেমার টিমের। যেখানে নদী আছে, লেক আছে, পাহাড় আছে, আশপাশে কোনো বাড়ি নেই।

এরপর এক বছরের চেষ্টায় তৈরি করা হয় সিনেমার সেট।
ভিজুয়াল তৈরির পেছনের যত্নের কথা তুলে ধরে সুমন বলেন, "সাদু ও তার বউয়ের আলাদা পৃথিবী তৈরির ওই ভাবনা থেকেই আমরা লোকেশনটি খুঁজে বের করি। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে চেয়েছি এই সিনেমাটা অনেক অর্গানিক জায়গা থেকে শুট করতে। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর সিলেটের মেঘালয় সীমান্তের কাছে আমরা সেই পারফেক্ট লোকেশনটা পাই। লোকেশন পাওয়ার পর আমাদের বড় বিপত্তি ঘটে যে, ওখানে কোনো গাছপালা ছিল না।
"ওটা ছিল একটা পাথুরে জায়গা, যেখান থেকে একসময় পাথর তোলা হত। পুরো বনাঞ্চলটা তৈরি করতে আমাদের দীর্ঘ আট-নয় মাস বা তারও বেশি সময় লেগেছিল। প্রথমে প্রায় এক-দেড় মাস ধরে ট্রাকে করে পুরো এলাকা জুড়ে বাইরে থেকে মাটি ফেলা হয়। সেটার জন্য আমাদের আলাদা একটা রাস্তাও বানাতে হয়েছিল। মাটিতে আমরা নেপিয়ার ঘাসসহ নানা ধরনের বুনো বীজ ছড়িয়ে দিতাম এবং নিয়মিত জৈব সার ব্যবহার করতাম। সারাক্ষণ আমাদের ৪-৫ জনের একটা লোকাল টিম ছিল, যারা শুধু গাছে পানি দিত ও পরিচর্যা করত।"
সুমন বলেন, "আমি তথাকথিত গৃহস্থ বাড়ির ফিল দিতে চাইনি; আম, কাঁঠাল, জামের বদলে ওই অঞ্চলের পাহাড়ি ভুটান গাছ, ছন গাছ লাগাতাম। ছোট লরি করে আমরা এক-দেড় মাইল দূরের বিভিন্ন গ্রাম থেকে বুনো গাছ কিনে এনে লাগাতাম। নার্সারি থেকে ট্রাকে করে বড় বড় বাঁশঝাড়, সুপারি গাছ, কলাগাছ কিনে এনে লাগিয়েছি।
"সিনেমায় যে কাশফুল দর্শকরা দেখেছেন, তা-ও শুটিংয়ের সাত-আট মাস আগে আমাদেরই লাগানো ছিল। আর যে ঘরটিতে সাধুর সংসার, সেটি বানাতে আমাদের ছয় মাস লেগেছিল। পাহাড়ী ফাঁকা জায়গায় প্রচণ্ড বাতাস হওয়ায় প্রথমে আমরা ওটাকে পুরো সিমেন্ট দিয়ে প্রপারলি দেয়াল করে বাড়ি বানিয়েছি, তারপর তার ওপর মাটি লেপে মাটির ঘরের নিখুঁত আদল তৈরি করেছিলাম।"
জমি লিজ নিয়ে সেখানে গাছ লাগিয়েছেন জানিয়ে সুমন বলেন, সিনেমার শেষ সিনের জন্য যে তালগাছের সিকোয়েন্স, সেই তালগাছের নিচে আসলে আগে বেগুন চাষ হত।

“আমরা জায়গাটা এক বছরের জন্য লিজ নিয়ে বেগুন চাষ উঠিয়ে দিয়ে সেখানে চারদিকে ভুটান গাছ লাগিয়ে দৃশ্যপটের জন্য প্রস্তুত করেছি।"
সিনেমায় প্রকৃতির এই রূপ ও আবহ ফুটিয়ে তুলতে প্রযুক্তির সাহায্য নেননি নির্মাতা। প্রকৃতির স্বাভাবিক রূপটি ক্যামেরাবন্দি করতে পুরো টিমকে করতে হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা।
সুমন বলেন, "এই সিনেমা আমরা দুপুর বেলা বা কড়া রোদে কখনোই শুট করিনি। আমরা পুরো সিনেমায় একটা ‘গ্লুমি’ বা স্যাঁতসেঁতে মেঘাচ্ছন্ন আবহ ধরতে চেয়েছিলাম। খুবই লো-লাইটে শুট করেছি। আমরা কোনো বৃষ্টির সিন বানিয়ে বা কৃত্রিম উপায়ে শুট করিনি। মেঘালয়ের কাছে দুই-তিন দিন পর পরই বৃষ্টি হত, কিন্তু আমাদের তো দিনের বেলার সিন লাগবে। তাই দিনের বেলা কালো করে মেঘ না আসা পর্যন্ত আমরা সিনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি। “এমনও দৃশ্য আছে, যার জন্য আমরা টানা ১০-১২ দিন শুধু পারফেক্ট রিয়েল বৃষ্টির জন্য ওয়েট করেছি। আমরা আমাদের অভিনয়শিল্পীদের প্রস্তুত করে বসিয়ে রাখতাম। বৃষ্টি হলেই সিনটা ধরা হবে এমন।"
সুমন বলেন, "এই ভিজুয়াল তৈরির পেছনে আমাদের আর্ট ডিরেক্টর নসিব, সেট ডিজাইনার নিজাম ভাই, লোকেশন ম্যানেজার বাবলু ঘোষ ও জুহানের বিশাল অবদান আছে। ঢাকা থেকে আমাদের প্রায় ৬০-৭০ জনের একটা টিম গিয়েছিল, যারা টানা ছয় মাস ঢাকাতেই ফেরেনি। সার্বক্ষণিকভাবে গ্রামের ২৫-৩০ জন মানুষ আমাদের এই পাগলামিতে সাহায্য করেছে।"
পিঁপড়া থেকে ভেড়া সবই যেন চরিত্র, 'রইদ' সিনেমায় প্রকৃতি শুধু পটভূমি নয়, ছিল সহঅভিনেতার ভূমিকায়।
সুমন বলেন, "পিঁপড়া হেঁটে যাচ্ছে গায়ের উপর দিয়ে, সেই ফ্রেমও আলাদা করে ধরা হয়েছে। ছাগলের সাথে বিছানা ভাগ করে ঘুমায় পাগলি। মাছকে খাবার দেয় সে। ব্যাঙ, গরু, ভেড়া প্রতিটি প্রাণীই ফ্রেমে এসেছে গল্পের অংশ হয়ে। আমি সিনেমায় প্রকৃতির ভেতর দিয়ে তাদের প্রেমকে অনুভব করাতে চেয়েছিলাম।"
পরিচালকের স্বপ্নের ভিজুয়াল পর্দায় শতভাগ উঠে এসেছে কি না এমন প্রশ্নে সুমন বলেন, “সেটা তো আসলে আমি বলতে পারব না, দর্শক ভালো বলতে পারবেন। তবে নির্মাণের দিক থেকে আমার যে চাওয়াটা ছিল, পুরো টিম মিলে আমরা সেটা শতভাগ ফুটিয়ে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আমার এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার, এডিটর সজল, শিমুলসহ পুরো টিম দীর্ঘদিন ধরে একসাথে যেভাবে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে কাজটা করেছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য।”
‘রইদ’ সিনেমার গল্প লিখেছেন মেজবাউর রহমান সুমন ও সেলিনা বানু মনি। চিত্রনাট্য লিখেছেন নির্মাতা, জাহিন ফারুক আমিন, সিদ্দিক আহমেদ এবং সুকর্ণ শাহেদ ধীমান।
সিনেমায় সাদু চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান আর তার স্ত্রীর চরিত্রে নাজিফা তুষি। আরও অভিনয় করেছেন গাজী রাকায়েত, আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদ সহ আরও অনেকে।