Published : 31 May 2026, 01:11 PM
গণসংগীতশিল্পী, গীতিকার ও সংগীত শিক্ষক কামরুদ্দীন আবসার মারা গেছেন।
রাজধানীর একটি হাসপাতালে শনিবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান, তার তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।
কামরুদ্দীন আবসারের মৃত্যুর খবর গ্লিটজকে নিশ্চিত করেছেন তার ছেলে আদনান মুকিত দীপ্র। তিনি বলেন, "শনিবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে বাবা মারা যান। গত ১৭ দিন ধরে তিনি আইসিইউতে ছিলেন।"
সোমবার সকাল থেকে কামরুদ্দীন আবসারের শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
দীপ্র বলেছেন, “সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আগামীকাল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কামরুদ্দিন আফসারের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। এরপর বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে দাফন সংক্রান্ত পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।”
কামরুদ্দিন আবসার দীর্ঘ দিন ধরে শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০১১ সালে স্ট্রোক করার পর তার শরীরের বাম পাশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় তিনি স্থিতিশীল ছিলেন, স্বাভাবিক কথাবার্তা ও খাওয়া দাওয়া করতে পারতেন।
দীপ্র বলেন, "হঠাৎ করে বাবার জ্বর হল, আমরা ভাবলাম ডেঙ্গু হয়েছে তাই ডেঙ্গু টেস্ট করালাম, কিন্তু উনার শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। এরপর গত ১৪ মে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায় তিনি গুরুতর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং তার ফুসফুসের একটি বড় অংশ অকেজো হয়ে পড়েছে।"
ভর্তির পর থেকেই তাকে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। সেখান থেকে আর ফেরা হল না এই শিল্পীর।
১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে জন্মগ্রহণ করেন কামরুদ্দীন আবসার।

শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তিনি অনুরাগী ছিলেন। ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ মুন্সি, রইসউদ্দীন এবং শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের কাছে তিনি সংগীতের তালিম নেন। ১৯৭২ সালে আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যানিকেতনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে সেগুনবাগিচা মিউজিক কলেজে পড়াশোনা করেন। শিল্পীজীবনের শুরুতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি)-এ সংগীত ও পরিচালনা বিভাগের সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন কামরুদ্দীন আবসার।
তবে কামরুদ্দীন আবসারের প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে গণসংগীতের ভুবনে। তিনি বিশ্বাস করতেন গান মানুষের সংগ্রামের ভাষা, প্রতিবাদের ভাষা, আবার একই সঙ্গে ভালোবাসা ও মানবতার ভাষাও। তার গেয়েছেন ‘চল রে ভাই, উজান বেয়ে যাই’, ‘আমি কোনো ভালোবাসার গল্প জানি না, যেটুকু জেনেছি সবটুকুই যুদ্ধের’ কিংবা ‘তোমরা যদি বলো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়, আমি মানবো না’সহ বহু গান।
১৯৭৮ সালে ‘বাংলাদেশ লেখক শিবিরের’ সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে গেছেন কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কাছে। ‘লেখক শিবিরের’ সংগীত ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।
সত্তরের দশকের দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য তিনি গান গেয়ে তহবিল সংগ্রহ করেছেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি রাজপথে ছিলেন প্রতিবাদী শিল্পীদের অগ্রভাগে। তার কণ্ঠে গণসংগীত আন্দোলনরত মানুষকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে। পরবর্তী সময়েও গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলন, জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন।
তার প্রকাশ পাওয়া অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে ‘মে দিবসের গান’ এবং ‘বাংলার কমরেড বন্ধু’।
পাশাপাশি তিনি নিজে বহু গণসংগীত রচনা ও সুরারোপ করেছেন। গণসংগীতের বাইরে শামসুর রাহমান, ফয়েজ আহমেদ, লুৎফর রহমান রিটন, সুকুমার বড়ুয়াসহ বহু কবি ও ছড়াকারের শতাধিক ছড়ায় সুর দিয়েছেন। শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়াগানের একটি অ্যালবাম নির্মাণের স্বপ্নও তিনি লালন করেছিলেন, যদিও আর্থিক সীমাবদ্ধতায় তা বাস্তব রূপ পায়নি
সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ক্রান্তি’র সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গানের দল ‘সৃজন’। গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের সক্রিয় সংগঠক এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের সাংস্কৃতিক জোট ‘সংস্কৃতি মঞ্চ’-এর আহ্বায়ক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
পরিবারে তিনি স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম, ছেলে আদনান মুকিত দীপ্রকে রেখে গেছেন।