Published : 24 Nov 2025, 04:56 PM
কেউ বলছেন, ‘ধর্মেন্দ্রর মৃত্যু মেনে নেওয়া অসম্ভব’, কেউ বলছেন, ‘তিনি চলে যাবেন তা ভাবনার অতীত ছিল’। যার প্রস্থানে সবাই শোকাতুর, তিনি হলেন ধর্মেন্দ্র দেওল। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে রোগব্যধির সঙ্গে লড়াই করে হিন্দি সিনেমার ‘হি-ম্যান’ খ্যাত এই অভিনেতা চলে গেছেন সোমবার।
কেবল বহু প্রজন্মের দর্শকই তার সংলাপ ও পর্দার ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ ছিলেন। তার ভক্ত ছিলেন তার সহশিল্পী এবং অনুজরাও।
জীবনের ৯০ বছর পূর্ণ করার মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি থাকতে ধর্মেন্দ্র চিরবিদায় নিয়েছেন সোমবার। তার মৃত্যুর পর পরিবার থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ না হলেও সোশাল মিডিয়ায় এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বজন হারানোর ব্যথার কথা জানিয়েছেন অভিনেত্রী সায়রা বানু, শর্মিলা ঠাকুর, পরিচালক-প্রযোজক করণ জোহর, অভিনেতা অজয় দেবগনসহ আরো অনেকে।
এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রয়াত অভিনেতা দিলীপ কুমারের স্ত্রী অভিনেত্রী সায়রা বানু ধর্মেন্দ্রকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়েছেন।

এই মৃত্যু মেনে ‘নেওয়া অসম্ভব’ মন্তব্য করে সায়রা বানু বলেন, “দিলীপ সাহেব (দিলীপ কুমার) তাকে নিজের ছোট ভাই মনে করতেন। তিনি প্রায়শই আমার বাড়িতে দিলীপ সাহেবের সাথে আড্ডা দিতে। তারা দুজনে একসঙ্গে গল্প করতেন, খাওয়াদাওয়া করতে। আমি এতটাই কষ্ট পেয়েছি যে কথা বলার মত শক্তি পাচ্ছি না।”
আমৃত্যু ধর্মেন্দ্রকে মনে রাখবেন বলে জানিয়েছেন সায়রা বানু।
এনডিটিভি কথা বলেছে আরেক বর্ষীয়ান অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গেও। তিনি হৃষিকেশ মুখার্জি পরিচালিত ‘চুপকে চুপকে’ সিনেমায় ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে কাজ করেছিলেন।
ধর্মেন্দ্রর চলে যাওয়ার খবরে ওই সিনেমার শুটিংয়ের সময়ের কিছু স্মৃতি শর্মিলাকে নাড়া দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শর্মিলা বলেন, “একজন দুর্দান্ত মানুষ ছিলেন তিনি। একদিন আউটডোর শুটিংয়ে ধর্মেন্দ্রজি আসতে দেরি করায়, হৃষিদা তাকে ছাড়াই ইউনিট নিয়ে বের হয়ে যান। এরপর ধর্মেন্দ্রজি চিন্তায় পড়ে যান, তাকে বাদই দেওয়া হয় কী না। পরে আর তিনি কখনো শুটিংয়ে আসতে দেরি করেননি।”
‘চুপকে চুপকে’ নিয়ে শর্মিলা বলেন, “এটা প্রেমের চেয়েও বেশি কমেডি সিনেমা। যিনি আজও দেখেননি, তার দেখা উচিত।”
শর্মিলার বর্ণনায় ধর্মেন্দ্র একজন ‘পিতৃপুরুষ ছিলেন’।

“সবাই তাকে বাবাজি বলে ডাকত। তিনি সবার দেখাশোনা করতেন। তিনি এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যার কাছে সহজে পৌঁছে যাওয়া যেত।”
শর্মিলা বলেছেন, তিনি ভেবেছিলেন এবারের স্বাস্থ্য সংকট হয়ত ধর্মেন্দ্র কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
প্রযোজক পরিচালক করণ জোহর ধর্মেন্দ্রর মৃত্যুর খবর দিয়ে লিখেছেন, “একটি যুগের অবসান…। তিনি ভারতীয় সিনেমার কিংবদন্তি। মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন সেরা। আমাদের ইন্ডাস্ট্রির সবার প্রিয় মানুষ ছিলেন তিনি। সবার প্রতি তাঁর ছিল অপরিসীম ভালোবাসা।”
ধর্মেন্দ্রকে শ্রদ্ধা জানিয়ে অভিনেতা অজয় দেবগন ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, “ধরমজির খবর শুনে হৃদয় ভেঙে গেল। তার উঞ্চতা, উদারতা, উপস্থিতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছে।
“এই ইন্ডাস্ট্রি একজন কিংবদন্তিকে হারাল।”
অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহা সোশাল মিডিয়ায় ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের মেলামেশার কথা লিখেছেন।
"এর মধ্যে আমি আর আমার স্ত্রী যখন তার বাসায় তাকে দেখতে গিয়েছিলাম, তখন তিনি হাসছিলেন। অসুস্থতার সময়ও তাকে দেখতে সুন্দর আর উজ্জ্বল লাগছিল। আমরা ভেবেছিলাম তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমরা আসলে ভাবতে চাই না যে আমরা যাদের ভালোবাসি তারা আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন।"
ধর্মেন্দ্রকে নিয়ে রাণবীর কাপুরের পুরনো একটি সাক্ষাৎকার সামনে এনেছে এনডিটিভি। সেখানে রাণবীর বলেন, “ধরমজি তার মর্যাদার সাথে আপস করতে চান না এবং তার তারকাখ্যাতিকে কোনও কিছুতেই ছাড় দিতেও দেবেন না।”
ধর্মেন্দ্রর পুরো নাম ধর্মেন্দ্র কেওয়াল কৃষাণ দেওল। ১৯৩৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের নাসরালিতে তার জন্ম। দ্ররিদ্র কৃষক পরিবারের এই সন্তানটির শৈশব থেকে সিনেমার প্রতি প্রবল টান অনুভব করতেন। ১৯৬০ সালে ফিল্মফেয়ার 'ট্যালেন্ট প্রতিযোগিতায় জিতে' পা রাখেন বলিউডে। ১৯৬০ সালে ‘দিল ভি তেরা হাম ভি তেরে’ সিনেমা দিয়ে বলিউডে আত্মপ্রকাশ করেন ধর্মেন্দ্র। সেই থেকে শুরু।
ছয় দশকের বেশি সময় তিনশোর বেশি সিনেমায় অভিনয়ে অসামান্য প্রতিভার ছাপ রেখে গেছেন ধর্মেন্দ্র।
ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে ‘ফুল অউর পাথর’ এবং ‘অনুপমা’, ‘আয়ে দিন বাহার কে’ সিনেমায় রোমান্টিক নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে নামের সঙ্গে ‘নায়ক’ তকমা লাগান ধর্মেন্দ্র।
এছাড়া ‘ধর্ম বীর’ ও ‘হুকুমত’ এর মত সিনেমায় ধর্মেন্দ্র পর্দা কাঁপিয়েছেন অ্যাকশন হিরো হিসেবে। নাম করেছেন ‘বন্দিনী’, 'অন্যপধ', ‘সত্যকাম’, 'আয়া সাওয়ান ঝুমকে', 'ড্রিম গার্ল', 'মেরা গাঁও মেরা দেশ', 'দোস্ত' সহ আরও বহু সিনেমা করেও।
শুরুতে নায়ক হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লেও ধীরে ধীরে কমেডি চরিত্রে অভিনয়ের শক্তিশালী ছাপ রাখেন ধর্মেন্দ্রে। বিশেষ করে হৃষিকেশ মুখার্জি পরিচালতি ‘চুপকে চুপকে’ সিনেমাটি তার ক্যারিয়ারের মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়।
তবে ধর্মেন্দ্রর ক্যারিয়ার ঘুরে দাঁড়ায় রমেশ সিপ্পির কালজীয় সিনেমা ‘শোলে’ দিয়ে। ঠাকুরের ডাকে জয় আর বীরু নামের দুই তরুণ মাস্তানের ডাকাত ধরার সিনেমা হয়ে ওঠে বলিউডের ইতিহাস। সিনেমায় ধর্মেন্দ্র ও অমিতাভ অভিনীত জয় ও বীরুর বন্ধুত্ব আজও মনে রেখেছেন দর্শকরা।
২০১২ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘পদ্মভূষণে’ ভূষিত হন তিনি।