Published : 01 Jul 2026, 04:35 PM
ফল হল প্রকৃতির ভিটামিন ক্যাপসুল, যা শিশুদের বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে।
শিশুদের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের ফল রাখলে, তার সার্বিক বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে।
যে কারণে শিশুদের খাদ্যতালিকায় ফল রাখা প্রয়োজন
বেশিরভাগ ফল সাধাণত মিষ্টি হয়। তাই শিশু যখন কঠিন খাবার খাওয়া শুরু করে, তখন এটি তার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত চিনির পরিবর্তে ফল দেওয়ার মাধ্যমে বাবা-মা অল্প বয়স থেকেই শিশুর মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারেন, যা পরবর্তী জীবনে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি ঝোঁক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে।
বিভিন্ন রংয়ের ফল শিশুদের জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতা প্রদান করে। যেমন- লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কমলা, বেগুনি, সাদা রংয়ের ফলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা শিশুর বিকাশমান মস্তিষ্ককে, হৃদযন্ত্র, ত্বক, চুল, দৃষ্টিশক্তিসহ নানান উপকার দেয়।
ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ধরনের ফলের সঙ্গে পরিচয় করে দিলে শিশুর স্বাদবোধ বিকাশে সাহায্য করতে পারে। আর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন খাবার চেখে দেখার আগ্রহ বাড়াতে পারে।
আর সারাজীবনের জন্য সচেতন ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য পছন্দের ভিত্তি স্থাপন করে।
দেশি ফলের পুষ্টিগুণ
কলা: শিশুদের জন্য ফলের তালিকায় কলা রাখা উপকারী। এটি শর্করা বা কার্বোহাইড্রেইটের চমৎকার উৎস, যা শিশুদের প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়। এছাড়াও রয়েছে ভিটামিন বি৬, ‘সি’, ‘এ’ পটাসিয়াম এবং খাদ্য আঁশ। আর এটি চর্বি মুক্ত।
এই পুষ্টি উপাদানগুলো শিশুর দৃষ্টিশক্তি, ত্বক উজ্জ্বল করতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
পেয়ারা: এই ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে যা শিশুর সর্দি, কাশির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। আর ভাইরাসজনিত সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর। পেয়ারার মিষ্টি স্বাদ শিশুদের জন্য সুস্বাদু ডেজার্ট হিসেবে দেওয়া যায়।
এছাড়াও পেয়ারায় থাকা ভিটামিন বি৩ এবং বি৬ মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালণ বাড়িয়ে জ্ঞানীয় বিকাশে সহায়তা করে।
আনারস: পুষ্টিগুণে ভরপুর, যা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। রয়েছে আঁশ যা শিশুদের হজমে সহায়তা করে।
এছাড়াও আনারসে রয়েছে ম্যাঙ্গানিজ যা হাড়, অস্থিসন্ধি এবং মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অপরিহার্য।

আম: ৬ মাস বয়স থেকেই দেওয়া যেতে পারে এই ফল। শুধু সুস্বাদুই নয়, এটি ভিটামিন ‘এ’ এবং ‘সি’তে ভরপুর। যে কারণে চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। গরমের মৌসুমে ফলটি শরীরকে রাখে সতেজ। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ত্বকের স্বাস্থ্য ও ক্ষত নিরাময়ে উপকারী ভূমিকা রাখে।
এতে থাকা আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে। প্রাকৃতিক চিনি শরীরে দ্রুত শক্তি সরবরাহ করে।
তবে অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়ানো যাবে না। ছোট শিশুদের কাঁচা আম হজম করা কঠিন, তাই পাকা আম দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। আম খাওয়ার পর কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে কি-না, বিশেষ করে অ্যালার্জি জনিত সেটা খেয়াল রাখতে হবে।
পেঁপে: শিশুরা প্রায়শই সর্দি, কাশিতে আক্রান্ত হয়। এ থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করতে পারে পেঁপে। কারণ রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’। এছাড়া ভিটামিন ‘এ’ রয়েছে, যা দৃষ্টিশক্তি, ত্বক ও চুলের উপকারী।
পেঁপেতে প্যাপাইন নামক ‘এনজাইম’, শিশুর নিয়মিত কোষ্ঠকাঠিন্য ও হজমে সহায়তা করে।
৭ বা ৮ মাস হলে পেঁপে দেওয়া শুরু করা যায়। খোসা ছাড়িয়ে বীজগুলো অবশ্যই বের করে দিতে হবে।
পেঁপেতে প্রচুর আঁশ থাকে। তাই অতিরিক্ত দিলে, পেট খারাপ হতে পারে।
তরমুজ: গরমে শিশুদের শরীর আর্দ্র রাখতে ও পানির ঘাটতি পূরণে তরমুজ কার্যকর। কারণ এর ৯২ শতাংশই পানি। আরও থাকে ভিটামিন ‘এ’ এবং ‘সি’।
৬ মাস বয়স থেকেই শিশুকে তরমুজ ছোট টুকরা করে বা জুস হিসেবে দেওয়া দেওয়া যেতে পারে। অবশ্যই বীজ ফেলে দিতে হবে। কারণ আস্ত বীজ গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
খুব বেশি পরিমাণ না দিয়ে, শুরুতে অল্প পরিমাণে দেওয়া উচিত।
লিচু: শিশুদের জন্য লিচু পুষ্টিকর। কারণ রয়েছে ভিটামিন ‘সি’, পর্যাপ্ত পানি, খাদ্যআঁশ, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও কপার। এগুলো শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ শরীরের পানির চাহিদা, হজম শক্তি বৃদ্ধি, হাড় ও ত্বক ভালো রাখতে কার্যকর ভুমিকা রাখে।
তবে লিচু খালি পেটে দেওয়া যাবে না। খাওয়ার আগে লিচু সবসময় পাকা ও সতেজ দেখে নির্বাচন করতে হবে। আর খাওয়াতে হবে পরিমিত পরিমাণে।
লেবু: লেবু শিশুদের জন্য একটি চমৎকার ফল, কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং সার্বিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে। এছাড়াও ‘পেকটিন’ নামক এক প্রকার দ্রবণীয় খাদ্য আঁশ রয়েছে যা হজমে সাহায্য করে, আর মলত্যাগ নিয়মিত রাখতে পারে।
গরম ও কর্মব্যস্ত দিনের পর শিশুকে এক গ্লাস তাজা লেবুর রস দিলে শিশু সতেজ বোধ করতে সাহায্য করবে।

কাঁঠাল: ভিটামিন সি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, আঁশ ও প্রাকৃতিক শর্করা সমৃদ্ধ, এদেশের জাতীয় ফলটি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হজমশক্তি ও দেহের শক্তি বাড়ানোতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
১০০ গ্রাম পাঁকা কাঠালে সাধারণত ১৩.৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ থাকে, যা শিশুর সর্দি কাশি এবং যে কোনো অসুস্থতা থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।।
শিশু চিবানোর মতো খাবার গ্রহণে কতটা প্রস্তুত তার ওপর নির্ভর করে, ৮ থেকে ১০ মাস বয়স থেকে কাঁঠাল দেওয়া যেতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে কাঁঠালের টুকরা যেন বড় না হয়। আর অতিরিক্ত খাওয়ানো যাবে না। এছাড়া শিশুর কোন রকম অ্যালার্জির সমস্যা হচ্ছে কি-না, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে।
জাম: রয়েছে প্রচুর আয়রণ বা লোহা, যা শিশুর রক্তস্বল্পতা দূর করতে সাহায্য করে। এতে থাকা আঁশ, ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
খেয়াল রাখতে হবে, খালি পেটে জাম খাওয়ানো যাবে না। আর পরিমাণ অল্প রাখতে হবে।
![]() |
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেল্থ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর। |
আরও পড়ুন
নারীদের যেসব স্বাস্থ্য ঝুঁকি দূর করতে পারে সঠিক পুষ্টি
গর্ভাবস্থায় অপুষ্টির কারণে যে ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে
যকৃতে চর্বি জমছে? ‘ফ্যাটি লিভার’ তাড়াতে পাতে রাখতে পারেন আঁশ সমৃদ্ধ খাবার