১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

উদ্বেগ জাগাচ্ছে অর্থনীতির তিন সূচক

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বিনিয়োগে এই স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন, নতুন কর্মসংস্থান ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর পথে বাধা তৈরি হবে।

উদ্বেগ জাগাচ্ছে অর্থনীতির তিন সূচক

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি।

আবদুর রহিম হারমাছি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 14 Oct 2026, 01:43 AM

Updated : 14 Oct 2026, 01:43 AM

ডলারপ্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

উল্টো শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি আমদানি কমছে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে আটকে আছে। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের গতিও নেমেছে তলানিতে।

অর্থনীতির এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকই বলছে, নতুন বিনিয়োগের গতি দুর্বল। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মতে, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ কম।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বিনিয়োগে এই স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন, নতুন কর্মসংস্থান ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর পথে বাধা তৈরি হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অস্থিরতার পর গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সরকারের মেয়াদের প্রায় আট মাসেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানিবিষয়ক তথ্য বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-অগাস্টে দেশে ৫০ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে।

আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭৫ কোটি ৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ।

অন্যদিকে, একই সময়ে সব ধরনের পণ্য আমদানির ব্যয় বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, জুলাই-আগস্টে আমদানি ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।

এর অর্থ হচ্ছে, সামগ্রিক আমদানি বাড়লেও ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা কলকারখানা স্থাপন বা সম্প্রসারণে আগের চেয়ে যন্ত্রপাতি আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন, যা দেশে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মূলধনি পণ্য আমদানিও কমেছে

শিল্পকারখানা স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা পুরোনো যন্ত্রপাতি বদলানোর জন্য উদ্যোক্তাদের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হয়। ফলে এই আমদানির ওঠানামা বেসরকারি বিনিয়োগ পরিস্থিতি বোঝার অন্যতম নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়।

শুধু মূলধনি যন্ত্রপাতি নয়, শিল্পকারখানার অন্যান্য মূলধনি পণ্য আমদানিও কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এসব পণ্যের আমদানি হয়েছে ১০৯ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ১২৫ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের তুলনায় ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ কম।

সব মিলিয়ে শিল্প খাতের মূলধনি পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৬০ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল প্রায় ২০০ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ মোট আমদানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।

পুরো অর্থবছরের হিসাবেও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে ওঠানামা দেখা যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে আমদানি হয়েছিল ৩২০ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের ৩০৫ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের তুলনায় ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ৫১৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৪৯৫ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের। এরপরের বছরগুলোতে আমদানির পরিমাণ ওঠানামা করেছে।

Image

ফাইল ছবি

উদ্যোক্তারা হতাশ

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসবে কি না এবং উৎপাদন চালানোর মত অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যাবে কি না, তা ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তাদের বড় ভাবনার বিষয়।

বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি ও তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নতুন বিনিয়োগ হবে কী করে? কে করবে বিনিয়োগ? বিনিয়োগ করলে রিটার্ন আসবে—সে নিশ্চয়তা দেবে কে? যেগুলো আছে, সেগুলোই টিকিয়ে রাখাই অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।”

তিনি বলেন, “একটার পর একটা সমস্যা লেগেই আছে। নতুন সরকার এসেছে, ভেবেছিলাম এখন সব ঠিকঠাক মতো চলবে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে—পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। অনেকেই হতাশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ এখনও ফিরে আসেনি দেশে; সুদের হার বেশি। জানি না কবে দেশে সুন্দর-স্বাভাবিক পরিবেশ আসবে।”

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও ব্যবসা ও বিনিয়োগের প্রতিকূল পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্যবসা ও বিনিয়োগ বর্তমানে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাজারে টিকে থাকার জন্য উদ্যোক্তারা লড়াই করছেন। এর মধ্যে জ্বালানি সংকট এল। এগুলো ব্যবসার জন্য বড় আঘাত।

“এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা ভাবার সাহস কে করবে? এই যে প্রায় ৫ শতাংশ ঋণ বাড়ার কথা বলা হচ্ছে—আমি জানি না কীভাবে এই প্রবৃদ্ধি এলো, ঋণগ্রহীতা কারা। তারা কি ঋণ শোধ করতে পারবেন? এ নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।”

Image

ফাইল ছবি

বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে

বেসরকারি বিনিয়োগের গতি বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হল বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি। এই প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার অর্থ, নতুন বিনিয়োগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণ নেওয়ার চাহিদা দুর্বল থাকতে পারে।

তবে ঋণপ্রবাহের পাশাপাশি ঋণের মান, ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও অর্থনীতির সামগ্রিক চাহিদাও বিবেচনায় নিতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। জুলাই শেষে তা ছিল ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।

এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে এই প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছিল, যা তখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন ছিল। মে মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

অর্থাৎ গত কয়েক মাসে সামান্য ওঠানামা হলেও বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচেই রয়েছে।

বন্ধ ও রুগ্‌ণ শিল্পকারখানা চালু করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করতে গত ২৩ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেন। বিভিন্ন খাতে এ প্যাকেজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঋণপ্রবাহে প্রত্যাশিত গতি আসেনি।

গত বছরের ডিসেম্বরে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকার প্রত্যাশা করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু বাস্তবে তা ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসে।

পরবর্তী ছয় মাসের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল আরেফিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তো এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এখনও। তার প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতেও পড়ছে। এই সময়ে তো খুব বেশি ঋণ বাড়বে না।”

অন্যদিকে, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, রাজনৈতিক সরকারের মেয়াদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগ পরিবেশ ধীরে ধীরে উন্নত হতে পারে।

তিনি বলেন, “ঋণ কমে যাওয়ার অনেকগুলো কারণ থাকে। সবচেয়ে বড় কারণ হল অর্থনীতিতে চাহিদা আছে কি না।”

মাহবুবুর রহমান বলেন, “উদ্যোক্তারা ঋণের অর্থ ব্যবহার করার নিশ্চিত পরিবেশ পেলেই নেবে। ঋণ নিলেই তো সুদ গুনতে হবে। এখন রাজনৈতিক সরকার এসেছে, বেশ সময়ও পার হয়েছে। এখন চাহিদা হয়তো বাড়বে।”

সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ও কম

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের দুর্বলতার পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন ব্যয়েও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ২ শতাংশেরও নিচে নেমেছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এডিপির আওতায় ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এটি পুরো কর্মসূচির ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

আগের অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সে সময় ব্যয় হয়েছিল ৫ হাজার ৭১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাস্তবায়নের হার ছিল ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং ব্যয় হয়েছিল ৭ হাজার ১৪৩ কোটি ৮ লাখ টাকা।

Image

ফাইল ছবি

প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের উদ্বেগ

বিনিয়োগে দুর্বলতার প্রভাব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্ব ব্যাংক।

৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

একই অর্থবছরের জন্য এপ্রিলে সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ পূর্বাভাস কমানো হয়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট।

বিশ্ব ব্যাংক বলেছে, জ্বালানি খাতের সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে চাপে রেখেছে। বিনিয়োগ কার্যক্রম দুর্বল হয়েছে, রপ্তানির গতি কমেছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়েছে।

সংস্থাটি ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে এর জন্য জ্বালানি সরবরাহের উন্নতি এবং সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে বিশ্ব ব্যাংক।

বিশ্ব ব্যাংকের পূর্বাভাস সত্যি হলে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি করোনাভাইরাস মহামারীর প্রথম বছরের ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়েও কমে যাবে।

বিনিয়োগের দুর্বলতার পাশাপাশি ব্যাংক খাতের ঝুঁকি, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ও সরকারের রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতাকেও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে।

Image

ফাইল ছবি

ডলার সংকট কমলেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে

করোনাভাইরাস মহামারীর ধাক্কা সামলে ওঠার সময় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। ডলারের সংকট মোকাবিলায় আমদানি নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

পরে রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয় বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে উন্নতি হয়। তবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অগাস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জ্বালানি ব্যয়, উচ্চ সুদহার এবং উৎপাদন খরচের চাপ নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তুলছে বলে ব্যবসায়ীদের ভাষ্য।

Image

ফাইল ছবি

আশা নেই?

মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমা, বেসরকারি ঋণের দুর্বল প্রবৃদ্ধি এবং সরকারি উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাব অর্থনীতির গতিপথ নিয়ে সংশয় তৈরি করছে।

নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও বিদ্যমান কারখানা সম্প্রসারণে বিনিয়োগ হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ে। এর সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ তৈরি হয়। বিপরীতে, বিনিয়োগ দীর্ঘ সময় দুর্বল থাকলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ঢাকায় বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাত ও রাজস্ব আদায় নিয়ে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা দেশের পরিচিত বাস্তবতারই প্রতিফলন। এখন সরকার এসব সমস্যা মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

চলতি অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে তিনি বলেন, “অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। পরের অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস থাকলেও সেটি অর্জিত হবেই, এমন নিশ্চয়তা নেই।”

ওই প্রতিবেদনে দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সংকোচন, রপ্তানি, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ও শিল্প উৎপাদন হ্রাসের যে চিত্র উঠে এসেছে, তাও বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন জাহিদ হোসেন।

তিনি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পরে মূল্যস্ফীতিতে যে নতুন ধাক্কা আসতে পারে, তা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে—সেটা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

“অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটি হিসাব বের করেছি। তাতে দেখেছি, সাম্প্রতিক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ১ থেকে ২ শতাংশ খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ।”

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি প্রধান হাতিয়ার হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছুদিন আগে রেপো হার কিছুটা কমিয়েছে, যা না করলেই ‘ভালো হত’।

“আমি মনে করি নীতি সুদহার আর কমানো উচিত হবে না। এ ছাড়া শিল্প–কারখানা সচল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি নিয়েছে, সেটি যেন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক হয়। প্রকৃত শিল্পপ্রতিষ্ঠান না পেয়ে বড় বড় খেলাপিরা এ টাকা পেলে তা উৎপাদনশীলতায় যোগ হবে না; উল্টো মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে।

“আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক সংকট কেটে যায়নি। এখনো অনেক ঝুঁকি আছে। এ অবস্থায় বিনিময় হার নমনীয় রেখে রিজার্ভ সুরক্ষিত রাখতে হবে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা, নির্ভরশীল জ্বালানির ব্যবস্থা করা ও নীতির ধারাবাহিকতা রাখা প্রয়োজন।”