“এবারের বাজেটটা একটু বাস্তবমুখী করব। মূল্যস্ফীতি কমবে, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।"
Published : 19 Mar 2025, 08:16 PM
আসন্ন ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেট ‘খুবই বাস্তবমুখী’ হবে দাবি করে অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, তার লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি কমানো, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো।
বাজেট নিয়ে বুধবার বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মত বিনিময় করেন অর্থউপদেষ্টা ও বাজেট সংশ্লিষ্টরা। বাজেট প্রণয়নের আগে সবার পরামর্শ নেওয়ার জন্যই এই বৈঠক।
সমাপনী বক্তব্যের উপদেষ্টা বলেন, “বাজেটে আমাদের উদ্দেশ্য থাকবে একটি সমতাভিত্তিক এবং কল্যাণমুখী বাজেট যেন আমরা দিতে পারি। বাজেট হবে মধ্যমেয়াদী, কারণ দীর্ঘমেয়াদী বাজেট আমাদের ম্যান্ডেট না।
"আমি কথাবার্তা কমই বলি, লম্বা বক্তৃতা আমি পছন্দ করি না। বাজেট স্পিচটা এবার ৫০-৬০ পাতার মধ্যেই হবে। এবারের বাজেটটা একটু বাস্তবমুখী করব। মূল্যস্ফীতি কমবে, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।"
বৈঠকে কর পরিশোধে নাগরিকদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন কয়েকজন সাংবাদিক। পাশাপাশি করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, সারা দেশে করজালের বিস্তৃতি ঘটানোর পরামর্শ আসে।
উপদেষ্টা বলেন, "ক্যাশলেস সোসাইটি এবং ফেইসলেস ট্যাক্স সিস্টেম প্রয়োজন। আমি মনে করি ট্যাক্স অফিসারদের মুখোমুখি হওয়া আপনাদের জন্য মোটেও বাঞ্ছনীয় নয়। সামনাসামনি হলে টেবিলের নিচ দিয়ে লেনদেন হয়। অটোমেশন নিশ্চিত করার জন্য তথ্য প্রযুক্তির উপরে আরো গুরুত্ব দিতে হবে।"
অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার আলোচনার সংক্ষিপ্ত সার তুলে ধরে বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকারের একটি পদক্ষেপ। সবার পক্ষ থেকে কর্মসংস্থানের বিষয়েও পরামর্শ এসেছে।
"শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে কমছে, এটা বাড়ানোর বিষয়ে পরামর্শ এসেছে। অটোমেশন ও ক্যাশলেস সোসাইটির পরামর্শ এসেছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে যে পরামর্শটা এসেছে, সেটা হচ্ছে বাজেটের আকার ছোট হতে হবে, বাজেট হতে হবে বাস্তবধর্মী।"
সাংবাদিকরা কী চাইছেন
পরামর্শ পর্বে যুগান্তর সম্পাদক আব্দুল হাই শিকদার বলেন, “গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বর্তমান সরকার ভালো করছে। আগামী বাজেটও একটা চ্যালেঞ্জ। ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে জাগাতে হবে।”
ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আকার বাড়ানো এবং টিসিবির কাজের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
কবি আব্দুল হাই শিকদার বলেন, “বাজেটের আকার বাস্তবমুখী হোক। মফস্বলে কর দেওয়ার মত অনেক ব্যবসায়ী আছেন। তাদেরকে করের আওতায় আনা যায় কিনা।”
ডিবিসি নিউজের সম্পাদক লোটন একরাম বলেন, “বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের স্বপ্ন আমরা দেখতে পাব বাজেটে। করমুক্ত আয়সীমা ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা করার দাবি করছি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ সহজলভ্য করা উচিত। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা করা উচিত।”
দৈনিক সমকালের সহযোগী সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, “সামজিক সুরক্ষার ভাতা বছর বছর সামান্য বাড়ে, এই ভাতাটা এমনভাবে বাড়াবেন, যাতে একটা মানুষ এক মাস চলতে পারে। সিপিডি থেকে তিন হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।”
দৈনিক প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন বলেন, “গত ১৫ বছরে প্রবৃদ্ধি কাগজে কলমে হয়েছে, কিন্তু কর্মসংস্থান হয়নি। প্রতিবছর কত কর্মসংস্থান হচ্ছে তার একটা হিসাব চাই। ঢাউস বাজেট বক্তৃতার অবসান চাই। বাজেট বক্তৃতায় মন্ত্রণালয়ের যে বর্ণনা দেওয়া হয়, তা অহেতুক। এবার এখানেও একটা সংস্কার চাই।
“গত ৫ বছরে ৫০টি দেশের বাজেট পড়েছি বা দেখেছি। বাংলাদেশের মত এত বাজে বাজেট বক্তৃতা আর কোথাও হয় না।”
এটিএন বাংলার প্রধান নির্বাহী সম্পাদক মনিউর রহমান বলেন, কর্মহীনতা সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল আইন শৃংখলা পরিস্থিতির কারণ। কর্মসংস্থান বাড়ানো উচিত। করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা করা উচিত।
এসএ টিভির নির্বাহী পরিচালক রাশেদ কাঞ্চন বলেন, “বিগত দুর্বৃত্ত সরকারের পর আপনাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাজেট কি ফ্যাসিবাদী সময়ের মত বড় হবে, নাকি বাস্তবধর্মী হবে সেটা জানতে চাই।”
ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির সহযোগী সম্পাদক শামীম আব্দুল্লাহ জাহেদী বলেন, বাজেটে একটা ‘ন্যায় বিচারের দর্শন’ নিশ্চিত করতে হবে। কালো টাকা থেকে সাদা টাকা আলাদা করতে হবে।
“সাড়ে তিন কোটি হাউজহোল্ডের প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়িতে টিভি আছে বলে জানি। সেখানে কেবল অপারেটররা সে সেবা দেয়, এর বাবদ মাসে আড়াইশ থেকে পাঁচশ টাকার মত নেয়। কিন্তু টেলিভিশনগুলো এর কোনো অংশ পায় না। কেবল অপারেটর থেকে আমরা টাকা পাই না। সরকার পায় কিনা জানি না।”
যমুনা টিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “বাজেটে দুর্নীতি বা সিস্টেম লস কীভাবে কমানো যায় তার একটা রূপরেখা দিয়ে যাবেন। বাজেট বাস্তবায়নের একটা রূপরেখা থাকা উচিত।”
জনকণ্ঠের সিটি এডিটর ও প্রধান প্রতিবেদক কাওসার রহমান বলেন, কর্মসংস্থান প্রয়োজন, বিনিয়োগ প্রয়োজন। কর কাঠামো সহজ করা দরকার। মানুষকে করের আওতায় নিয়ে আসতে ডিজিটাল সিস্টেম চালু করতে হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতকে গতিশীল করতে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
চ্যানেল আইয়ের প্রধান বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। স্কুল পর্যায়ে মানসিক বিকাশে যেন বিনিয়োগ বাড়ানো হয়।”
চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি রিজভী নেওয়াজ বলেন, “সব ডাটা রিভাইজ করা দরকার। বেসরকারি বিনিয়োগ কেন বাড়ছে না, ব্যাংক ডিপোজিট কেন বাড়ছে না খবর নেওয়া উচিত।”
ডেইলি অভজার্ভারের সিনিয়র রিপোর্টার মিজানুর রহমান বলেন, হাসপাতালসহ বিভিন্ন সেবাখাতে সরকার যে বরাদ্দ তা সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কিনা সেটা পর্যবেক্ষণ করা উচিত।