Published : 29 Mar 2026, 09:56 PM
ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া বাড়তি চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্কতার সঙ্গে করণীয় নির্ধারণ করছে। একই সঙ্গে তেলের দাম চড়তে থাকায় প্রয়োজনে বাড়তি দুই বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তেল আমদানি ও রেমিটেন্স প্রবাহের সম্ভাব্য অনিশ্চয়তার মুখে এবং অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবেলায় জরুরি নীতিগত পদক্ষেপ ও পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রোববার মধ্যপ্রাচ্যের সংকটময় পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বাণিজ্য বিষয়ক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এসব কথা বলেন।
নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যবসায়ী থেকে গভর্নরের দায়িত্বে আসা মোস্তাকুর রহমান আর্থিক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার কথাও তুলে ধরেন।
সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তরফে বর্তমান বিদেশি মুদ্রার মজুদ (রিজার্ভ) এখনও স্বস্তিদায়ক অবস্থায় থাকার কথা তুলে ধরা হয়। বলা হয়, যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ডলারের বাজারে যাতে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি না হয় সেদিকেও সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে প্রায় দুই ঘণ্টার এ আলোচনা সভায় তিনি সাংবাদিকদের পরামর্শ শোনেন এবং যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কী পরিকল্পনা করছে তা তুলে ধরেন।
সভায় ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, মো. হাবিবুর রহমান, জাকির হোসেন চৌধুরী ও মো. কবীর আহাম্মদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান উপস্থিত ছিলেন।
গভর্নর বলেন, যুদ্ধের ভিন্ন এ পরিস্থিতিতে লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় আরও দুই বিলিয়ন ডলারের ঋণ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এরই মধ্যে আন্তর্জারিতক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে কথা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য উৎস থেকে এ সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) চেষ্টা করছে।
“মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে এই মুহূর্তে আমরা সতর্কতার সঙ্গে চলার কৌশল বা নীতি অবলম্বন করছি।“
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, রেমিটেন্স প্রবাহের পাশাপাশি আইএমএফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে অর্থায়ন পাওয়া যাবে তাতে লেনদেনে ভারসাম্যের ক্ষেত্রে আপাতত ঝুঁকি নেই।
প্রয়োজন এ দুই বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়া হবে, যা এখনও একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকার কথা বলেন তিনি।
সভায় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক এবং যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এর দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকিগুলো নিয়ে আলোচনা হয়।
যুদ্ধের অশনি সংকেতের মধ্যেও ইতিবাচক খবর হিসেবে ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ বলেছেন, যুদ্ধ আরও তিন থেকে চার মাস স্থায়ী হলেও আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে। বর্তমানে কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই বিনিময় হার স্থিতিশীল রয়েছে এবং এতে বড় ধরনের কোনো অস্থিরতার আশঙ্কা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, লেনদেনের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট-বিওপি) ওপর চাপ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক আরও দুই বিলিয়ন ডলার ঋণের খোঁজে রয়েছে। এছাড়া কোরবানির ঈদকে ঘিরে চলতি অর্থবছরের রেমিটেন্স প্রবাহ আগের বছরের চেয়ে দুই থেকে আড়াই বিলিয়ন ডলার বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর সঙ্গে আগামী জুন বা জুলাইয়ে আইএমএফের কিস্তি হিসেবে দেড় বিলিয়ন ডলারের কিস্তি পাওয়া গেলে বিওপি নিয়ে সংকট থাকবে না।
ডেপুটি গভর্নররা বলেন, সামনে বর্ষা মৌসুমের কারণে সার ও ডিজেলের বাড়তি চাপ থাকবে না এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংকট বাড়লে রেমিটেন্সও আগামী দুই তিন মাস বাড়বে। যে কারণে যতটা শঙ্কা করা হচ্ছে খুব শিগগির সংকট ততটা হবে না।
অপরদিকে সরকার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে জি-টু-জি চুক্তির মাধ্যমে কম দামে জ্বালানি আমদানি অথবা অনুদান হিসেবে পাওয়ার পথ খুঁজছে। পাশাপাশি বিকল্পও খোঁজা হচ্ছে।
তবে তেল ও ডলারের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে তা নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে আঞ্চলিক উদ্যোগসহ বিভিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
নগদ টাকার বদলে ‘ক্যাশলেস’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়াতে আগামী ১ জুলাই থেকে ‘বাংলা কিউআর’ কোডের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কথাও সভায় জানানো হয়।
কর্মসংস্থান বাড়াতে আগামী জুন থেকে ৬০০ কোটি টাকার একটি স্টার্টআপ তহবলি গঠন করে ঋণ বিতরণ করার উদ্যোগের কথা জানানো হয়।
বৈঠকে পাচার অর্থ বিদেশ থেকে উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলমান থাকার কথাও বলেন গভর্নর। বলেন, টাকা ফেরত আনতে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি (নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট) সই করে ফেলেছে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ৪১টি ব্যাংক জড়িত।
সমাপনি ব্ক্তব্যে মোস্তাকুর রহমান বলেন, এক-দুই বছর পরপর কোনো না কোনো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কোভিডের পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এখন ইরান যুদ্ধ।
“মনে হচ্ছে এ ধরনের সমস্যা সঙ্গে নিয়েই চলতে হবে আমাদের।”
গভর্নরের দায়িত্বে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “সবসময় মনে হয়েছে যে আর্থিক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব থাকা উচিত নয়। আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি, যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব আর্থিক খাতে না আসে। সহকর্মীদের বলেছি, যেকোনো প্রয়োজনে দায় নিতে রাজি আছি, কিন্তু আপনারা আইনের বাইরে কারো কথা শুনবেন না।”
যেকোনো সমস্যায় অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করার নীতিতে চলার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার ১৭ কর্মদিবসের মধ্যে তিনি অনেকগুলো বৈঠক করেছেন।
“আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রতিদিনই অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকারসহ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে পরামর্শ করছি। দেশীয় চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমেই অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি তিনটি অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন। কৃষিকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত বা এসএমইকে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বন্ধ কারখানা সচল করার কথা বলেন।
পাশাপাশি চব্বিশের আন্দোলনের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া সব কারখানা আবার ধাপে ধাপে চালু করার পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেনে গভর্নর। বলেন, “আমি মনে করি বন্ধ কারখানাগুলো জাতীয় সম্পদ। তাই ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করেছি বন্ধ কারখানাগুলোকে চালু করার বিষয়ে এগিয়ে আসতে। কারণ এসব সম্পদ ব্যবহার করা না হলে দিন দিন সেগুলো নষ্ট হবে।”
এসব কারখানা ব্যাংক ও গ্রাহকের আলোচনার ভিত্তিতে চালুর জন্য ব্যবস্থার কথা বলেন তিনি।
সভায় সাংবাদিকরা ব্যাংক ও আর্থিক খাতের আমানতকারীদের নিজেদের টাকা তুলতে না পারার দুর্দশার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পরামর্শ দেন। এ অবস্থায় দুর্বল ও একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সচেষ্ট রয়েছে।
গভর্নর বলেন, সম্মিলিত ব্যাংকের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। শিগগির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পর্ষদ নিয়োগ দেওয়া হবে। অন্তবর্তী সরকার ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান-এনবিএফআই অবসায়নের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওই সিদ্ধান্তও কার্যকর করা হবে।
আগামী জুলাইয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার কাজ শুরুর আশাও প্রকাশ করেন তিনি।
এছাড়া ঋণ খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, ব্যবসায়ীদের অনাস্থা দূর করা, ঋণের সুদহার কমানো, বিদেশ যাত্রার ক্ষেত্রে ডলারের কোটা সীমা বাড়ানো, খাতভিত্তিক ক্ষতিগ্রস্তদের প্রণোদনাসহ নানা বিষয়ে সুপারিশ তুলে ধরেন সাংবাদিকরা।
জ্বালানি ভর্তুকি কমাতে আইএমএফের চাপ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি ও সরকারের আর্থিক নীতির মধ্যে সমন্বয়, দুর্বল রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ নিয়েও আলোচনা হয়। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির কারণে সরকারের পরিচালন বাজেটে ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এটি সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়াতে পারে, যেদিক কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।