Published : 26 Feb 2026, 04:30 AM
তার জায়গায় নতুন আরেকজন আসছেন এমন গুঞ্জনের মধ্যে দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়লেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর; যাবার আগে দেখে গেলেন বিক্ষোভ, হলো প্রতিবাদ। পরে কর্মকর্তাদের তোপের মুখে অফিস ছাড়তে বাধ্য হলেন তার এক উপদেষ্টাও।
বাংলাদেশ ব্যাংকে দিনভর নজিরবিহীন এমন উত্তাপ ছড়ানো ঘটনাবলীর মধ্যে বিকালের দিকে প্রজ্ঞাপন এল নতুন গভর্নরের। প্রথমবারের মত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব বর্তাল একজন ব্যবসায়ীর কাঁধে। পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নরের দায়িত্ব দিল তারেক রহমানের বিএনপি সরকার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও আমলার বাইরে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়া হল, যাতে বিস্মিত এ খাত সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
পুরনো জনের বিদায় আর নতুন মুখের ঘোষণার চমকের মধ্যে দিনভর বাংলাদেশ ব্যাংকেও উত্তেজনাকর সময় কাটল।
আগের দিন তিন কর্মকর্তাকে শৃঙ্খলাজনিত কারণে রাজধানীর বাইরে বদলির সূত্র ধরে সদ্য বিদায়ী গভর্নরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আর প্রতিবাদে যার শুরু। শেষটা ঘটল দলবেঁধে কর্মকর্তাদের জোরপূর্বক চাপের মুখে গভর্নরের এক উপদেষ্টার বাংলাদেশ ভবন ছাড়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে।
এর শুরুটা হয়েছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের একদিন আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি জরুরিভাবে ডাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ বৈঠককে ঘিরে। নতুন সরকারের শপথের আগ মুহূর্তে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার তোড়জোরের খবরে প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়ে প্রতিবাদ করে সংবাদ সম্মেলনে করেছিলেন কর্মকর্তাদের একটি সংগঠন।
সেই থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলছিল গুমোট এক পরিবেশ; যা বুধবার গড়ায় বিক্ষোভে। দিনের শেষভাবে এর সাময়িক একটি পরিসমাপ্তি ঘটলো পুরনো গভর্নরের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল এবং নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে।
প্রথমবারের মত একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর হিসেবে বেছে নেওয়ার পর এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও হিসাব কষতে শুরু করেছেন সরকারের এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে। তারা ভাবছেন, এমন সিদ্ধান্ত কি আগেই নিয়ে রেখেছিল সরকার নাকি আন্দোলনের কারণে গভর্নরকে বিদায় করা হলো।
জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো বিষয় সুস্পষ্ট হতে হয়ত সময় লাগবে। গভর্নর হিসেবে আহসান এইচ মনসুরের শেষ কয়েক দিনের কর্মদিবস যে সুখকর ছিল না সেই রেশ কাটার বিষয়টিও বোঝা যাবে দিন কয়েক পর নতুন গভর্নরের পদক্ষেপে।
এ নিয়ে সবশেষ চার গভর্নরের একজনও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঠিকঠাক বিদায় নিতে পারেননি। এর মধ্যে তিনজনই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া।

যেভাবে সকাল শুরু
আগের দিন তিন কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক ঢাকার বাইরে নতুন কর্মস্থলে বদলি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মানব সম্পদ বিভাগ।
সেই তালিকায় বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল, ঢাকা এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ আরো একজনের নাম থাকায় প্রতিবাদ কর্মর্সূচির ডাক দেয় সংগঠনটি।
বেলা ১১টার দিকে সংগঠনটির বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ব্যানার টানানো হয় ৩০ তলা ভবনের সিঁড়ির সামনে। সেসময় ব্যানার ধরে রাখার মতও জনবল ছিল না।
বেলা বাড়লে ১২টার দিকে হঠাৎ করে ব্যানারে পেছনে ও আশপাশে কর্মকর্তাদের ভিড় বাড়তে থাকে। সেখান থেকেই গভর্নরকে পুনরায় ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিস ও বদলি প্রত্যাহারের দাবি করেন তারা।
দাবি করা গভর্নরের পদত্যাগেরও। তা মানা না হলে বৃহস্পতিবার থেকে কলম বিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা আসে সেখান থেকে।
সেই বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন আগের দিনে তাৎক্ষণিক বদলি হওয়া তিন কর্মকর্তাও। বুধবারের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নিদের্শনা থাকলেও পরিপালন করেননি তারা।
হঠাৎ সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর
এমন উত্তেজনাকর পরিবেশের মধ্যে দুপুর ১টার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকে হঠাৎ সংবাদ সম্মলেনে আসেন গভর্নর আহসান মনসুর।
গভর্নর ভবনের চতুর্থ তলায় জাহাঙ্গীর আলম মিলনায়তনে তিনি বলেন, বলেন, ‘‘ব্যাংক একীভূতকরণ (মার্জার) ও দুর্বল ব্যাংক পুণরুদ্ধার করার চেষ্টার বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কিছু কর্মকর্তা ষড়যন্ত্র করছেন।
‘‘মার্জার হওয়া ব্যাংক আবার আগের মালিকদের হাতে ফিরিয়ে নিতে একটি মহল উঠেপড়ে লেগেছে।
‘‘বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার অধিকার নেই সরকারি নীতিগত বিষয়ে প্রশ্ন তোলার। এটি তাদের আওতাভুক্ত বিষয় নয়। যারা অপপ্রচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে শোকজ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’’

আগের দিন বদলি আদেশ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক কর্মকর্তা দীর্ঘ পোস্ট লেখেন। সেখানে পুনরায় ‘স্বৈরাচার’ হিসেবে বর্ণনা করেন গভর্নর আহসান মনসুরকে।
এ বিষয়ে গভর্নর বলেন, ‘‘শোকজের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে।
‘‘একটি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে হলে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। চাকরি করবো কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানব না–এটি গ্রহণযোগ্য নয়।’
আন্দোলনের দাবির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘পদত্যাগ কোনো বিষয় নয়। আমি এখানে চাকরি করতে আসিনি, সেবা দিতে এসেছি। প্রয়োজন হলে দুই সেকেন্ড সময় লাগবে না পদত্যাগ করতে। তবে আমরা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।’’
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির বিষয়ে সরকারকে জানানোর কথা তুলে ধরে আহসান মনসুর বলেন, ‘‘এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে অবশ্যই সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেই আমরা এগোচ্ছি।
‘‘সাতটি ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটির মার্জার কোনো স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের বিষয় নয়। এটি সরকারি নীতিগত ও পলিটিক্যাল ইকোনমির বিষয়। ৭৬ লাখ ডিপোজিটরের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’’
এরপরই ছাড়েন বাংলাদেশ ব্যাংক
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যখন আহসান মনসুর সংবাদ সম্মেলন করছিলেন, ঠিক তখন এক কিলোমিটারের কিছুটা বেশি দূরে থাকা সচিবালয়ে নতুন গভর্নর নিয়োগ নিয়ে যে গুঞ্জন শুরু হয়েছিল সেটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বেলা ৪টার দিকে অর্থনীতিবিদ আহসান মনসুরকে সরিয়ে পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন করে সরকার।
সে বিষয়টি আগাম জানতে পেরে বেলা ২টার দিকে স্বাভাবিক পরিবেশের মত বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়েন আহসান মনসুর।
তখনও কর্মকর্তা ও সংবাদ কর্মীরা বিষয়টি পুরোপুরি জানতে পারেনি। নতুন নিয়োগের বিষয়টি গুঞ্জনের মধ্যেই ছিল। যেকারণে তার বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে কোনো প্রশ্নও ছিল না সাংবাদিকদের তরফ থেকে।
তবে আহসান মনসুর ছিলেন শান্ত। তাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা।
সতর্ক থাকা নিরাপত্তা রক্ষী ও গভর্নরের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত আর্মড পুলিশ সদস্যর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মত।

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১৪ অগাস্ট আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক কর্মকর্তা আহসান মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দেয়।
তাকে গভর্নরের দায়িত্ব দিতে নীতিমালা সংশোধন করে বয়স বাড়ানো হয়। তার নেতৃত্বে শুরু হয় ব্যাংক খাতের সংস্কারের কাজ। আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত ৫ ব্যাংক একীভূত করে রাষ্ট্রায়ত্ব সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়।
আহসান মনসুর যখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যান তখন বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ১৮ মাস ১২ দিন আগে তার দায়িত্ব নেওয়ার সময় যা ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৩তম গভর্নর হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া আহসান মনসুরের দায়িত্ব পালনের সময়ে রিজার্ভে যোগ হয় ১০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক বাণিজ্য হিসাবের অনেক সূচক ঋণাত্বক থেকে ইতিবাচক হয়।
পোশাক ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান
পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমান এক সময় পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউজ এবং আবাসন ব্যবসাতেও যুক্ত ছিলেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।
চার বছর মেয়াদে তাকে গভর্নরের দায়িত্ব দিয়ে বুধবার প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
তাকে দায়িত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম কোনো ব্যবসায়ী গভর্নর হচ্ছেন।
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান হেরা সোয়েটার্স গার্মেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও। ১৯৬৬ সালে ঢাকায় তার জন্ম; বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার জামপুর ইউনিয়নে। তার বড় ভাই মো. মোস্তাফিজুর রহমান মামুন ছিলেন থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ করেন মোস্তাকুর। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছেন।
ব্যবসায়ী কোনো সংগঠনের নেতৃত্বে তাকে দেখা না গেলেও পেশাজীবী হিসেবে বিভিন্ন সংগঠনে সদস্য হিসেবে ছিলেন মোস্তাকুর রহমান। পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে কাজ করে আসছিলেন তিনি।
বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী যখন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সভাপতি ছিলেন, সেসময় ১৯৯৮-২০০০ মেয়াদে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদ সদস্য ছিলেন মোস্তাকুর রহমান।
এমআরএম সিকিউরিটিজ নামের একটি ব্রোকারেজ হাউজের প্রতিনিধি হিসেবে মোস্তাকুর সিএসইর বোর্ডে বসেছিলেন। দুই দফা মালিকানা বদলে সেই প্রতিষ্ঠানের নাম এখন ইউসিবি ব্রোকারেজ হাউজ।
মোস্তাকুর রহমান আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাব ও ঢাকার ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-ডিসিসিআই এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) এর সদস্য। এসব সংগঠনের বিভিন্ন কমিটিতে তিনি কাজ করেছেন।

ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল হেরা সোয়েটার্সের
নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের নাম আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ঋণ খেলাপি হিসেবে তার নাম আলোচনায় আসে।
পরে এ বিষয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম খোঁজ নিয়ে জানতে পারে বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) থেকে নেওয়া ঋণ যথাসময়ে পরিশোধ না করায় খেলাপি হয় তার কোম্পানি হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড, যেটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও এমটিবির কর্মকর্তারা বলেছেন, গত ডিসেম্বরে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিলের সময় ৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণটি এককালীন ২ শতাংশ অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে পুনঃতফশিল করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করতে নীতি সহায়তা দিয়ে নতুন সার্কুলার দেয়। সেই আলোকে এমটিবির ঋণটি মোস্তাকুর রহমান নবায়ন করে নেন।
বেসরকারি ব্যাংকটির শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তাও এমন তথ্য দিয়ে বলেন, “নিয়মিত ক্রয়াদেশ না পাওয়ায় রপ্তানি খাতের হেরা সোয়েটার্স ব্যাংকের টাকা দিতে পারছে না। তাদের সক্ষমতা আছে রপ্তানি বাড়ানোর। বাংলাদেশ ব্যাংক যে পলিসি সাপোর্ট দিয়েছে, সেই সার্কুলারের আলোকে তিনি পুনঃতফশিল করার আবেদন করেন। ২ শতাংশ এককালীন পরিশোধ করতে চান, তাতে পর্ষদ সম্মতি দেয়।”
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এবং নভেম্বরের ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে ছাড় দিয়ে সার্কুলার করে। নভেম্বরে দ্বিতীয় দফার সার্কুলারে আগের চেয়ে শর্ত আরও শিথিল করা হয়।
এরপর গত ২২ ফেব্রুয়ারি এককালীন পরিশোধ ২ শতাংশের বদলে ১ শতাংশ পরিশোধ করে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আর নবায়ন করার পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে আরও ১ শতাংশ অর্থ পরিশোধের জুড়ে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

‘আস্থা বাড়ানো’, সুদের হার কমানো প্রধান অগ্রাধিকার
ব্যাংকিং খাতে ‘আস্থা বাড়ানোকে’ মূল কাজ ধরে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরু দায়িত্ব শুরু করতে চান নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
একই সঙ্গে সুদের হার কমিয়ে আনার চেষ্টাও তার অগ্রাধিকারে থাকবে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ড্টকমকে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নতুন দায়িত্ব পাওয়া এই ব্যবসায়ী।
গভর্নর হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে কী ভাবছেন- এমন প্রশ্নে মোস্তাকুর রহমান বলেন, “আসলে জানেনইতো অর্থনীতির অবস্থা, ব্যাংকিং খাতের অবস্থা। তাই এই সময়টায় এই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করায়তো ‘একটা চ্যালেঞ্জ আছে’।
“ইনশাল্লাহ, আগে ব্যাংকে বসি। সবার সাথে আলোচনা করি। আশা করি সবার সহযোগিতা নিয়ে প্রধান কাজটা হবে- আগে ‘ট্রাস্ট বিল্ডিং’ ব্যাংকিং খাতে। শৃঙ্খলা আরও ফিরায়ে নিয়ে আসা। নিশ্চয়ই আগের গভর্নর (আহসান এইচ মনসুর) অনেকখানি নিয়ে আসছে, আরও নিয়ে আসা।”
তার ভাষ্য, “আরেকটা হচ্ছে আমাদের যেটা প্রধান থাকবে যে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য করে আমাদের অর্থনীতিকে যতটুকু রান করা যায়। আপনি জানেন যে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে আসছে, তাই না? তো, এরজন্য চেষ্টা করা- সুদের হারকে কমায়ে নিয়ে আসা। এই কাজগুলো করা।”
আগের দিন বিজিএমইএ নেতারাও আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে দেখা করে কম সুদে বড় ঋণ ও সার্বিকভাবে সুদহার কমানোর দাবি করে যান।
পরিবর্তন নিয়ে যা বললেন অর্থমন্ত্রী
সরকার গঠনের পর গভর্নর পদে নতুন মুখ যে আসবে তা আগেই সরকারের তরফে ভেবে রাখার আভাস পাওয়া যায় সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যে।
তার ভাষ্য, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ও চিন্তা-ভাবনা বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন করা হয়।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, “একটা সরকার নতুন সরকার এসেছে। নতুন সরকারের প্রায়োরিটিজ আছে স্বাভাবিকভাবে। পরিবর্তনতো শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকে হয়নি, পরিবর্তনতো অনেক জায়গায় হচ্ছে। এবং এটা তো হতেই থাকবে।
“নতুন সরকারের যে প্রোগ্রাম আছে, প্রেফারেন্স আছে, চিন্তা আছে, ভাবনা আছে, সবকিছুর সাথে মিলিয়ে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য যেখানে যেখানে প্রয়োজন সেখানে তো পরিবর্তন হবেই।”
যে কারণে উত্তপ্ত হয় বাংলাদেশ ব্যাংক
বিএনপি সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় থাকার একদিন আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদন করা হচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল, ঢাকা।
সেদিন জরুরি পর্ষদ সভা ডেকেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পর্ষদ সভা শুরু হওয়ার আগেই বেলা ১২টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনটির সভাপতি একে এম মাসুম বিল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যখন নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, ঠিক সেই সময় মাত্র এক দিনের নোটিশে ১৬ ফেব্রুয়ারি একটি জরুরি পর্ষদ সভা ডাকা হয়।
‘‘এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ সভার মূল উদ্দেশ্য একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া, যা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে।’’
সংগঠনটির তরফে অভিযোগ করা হয়, গভর্নর ‘স্বৈরাচার’ এর মত কাজ করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘‘আমরা প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন চাই, কোনো ব্যক্তির নয়। স্বায়ত্তশাসন মানে এই নয় যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান একনায়ক বা স্বৈরাচার হয়ে উঠবেন।”
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আগে কথা না বললেও এখন চুপ থাকলে ভবিষ্যতে আবার প্রশ্ন উঠবে। নওশাদ মোস্তফা বলেন, “৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান না ঘটলে হয়তো আমরা এতটা খোলামেলা হতাম না।”
গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ বলেন, ব্যাংক খাতে ‘খেয়ালি বক্তব্য’ বন্ধ করে বস্তুনিষ্ঠ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক রেজল্যুশন নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মকর্তাদের এমন আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের পরই এক অভ্যন্তরীণ আদেশ জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
দাপ্তরিক সেই আদেশে বলা হয়, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে বা ঘরোয়া বৈঠকে, জনসভায়, সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকসংক্রান্ত বা নীতিমালার বিষয়ে বক্তব্য রাখতে পারবেন না।’’
সেই সংবাদ সম্মেলনের জের ধরে তিন কর্মকর্তাকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরই উত্তপ্ত হতে শুরু করে পরিবেশ।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর চিন্তায় কর্মকর্তারা
নতুন গভর্নরকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে নতুন হিসাব কষতে শুরু করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
পুরনো গভর্নরের বিদায়ের পরপরই চার বিভাগের চার পরিচালককে সরিয়ে দিয়েছে মানবসম্পদ বিভাগ। বদলি করা কর্মকর্তাদের আগের বদলির আদেশও বাতিল করা হয়েছে।
এমন ঘটনাবলীর মধ্যে সন্ধ্যার পর কয়েকজনের ভাষ্য, আন্দোলনের কারণে গভর্নর বদল হলো না কি সরকারের আগে থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অফিসার্স কাউন্সিলের বিক্ষোভ সমাবেশ দ্রুত পদক্ষেপ নিতে উসকে দিল তা বোঝা জটিল হয়ে গেল।
তারা বলছেন, এতদিনের রীতি ভেঙে একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর করায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের উপর ছড়ি ঘোরানো ব্যাংক লুটপাটকারীরা নতুন ছদ্মবেশে ফের হাজির হবে কিনা সেই সংশয়ও কারও কারও মধ্যে জেগেছে। এমন ষড়যন্ত্রের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো গোষ্ঠী জড়িয়ে পড়লো কি না- সে আলোচনাও করছেন কোনো কোনো কর্মকর্তা।
আরও পড়ুন
নতুন সরকারের 'প্রেফারেন্সের' সঙ্গে মিলিয়ে গভর্নর বদল: অর্থমন্ত্রী
'৮৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ' পুনঃতফসিল নতুন গভর্নরের পোশাক কারখানার
'আস্থা বাড়ানো', সুদের হার কমানোই প্রধান লক্ষ্য নতুন গভর্নরের
পোশাক ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান
গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দিলেন কর্মকর্তারা